সংবাদটি প্রকাশ হয়েছেn: Fri, May 18th, 2018
bashundhara

পিরোজপুরের শাঁখাশিল্পের দুর্দিন

davমহসিন খান হিমেল, পিরোজপুর প্রতিনিধি: সামুদ্রিক শঙ্খ দিয়ে তৈরি হাতের অলঙ্কার শাঁখা হিন্দু বিয়ের রীতিতে অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ। হিন্দু নারীদের সধবা হওয়ার প্রতীক এই শাঁখা। পিরোজপুর শহরে রয়েছে চারশ বছরের ঐতিহ্যবাহী শাঁখাশিল্প। বর্তমানে শাখার তৈরি অলঙ্কারের ব্যবহার কমে যাওয়ায় এ শিল্প প্রায় ধ্বংসের পথে। শুধু হিন্দুসম্প্রদায়ের চাহিদা মিটাতে কয়েক জন শাঁখারি এখনো এ পেশা ধরে রেখেছেন।

পিরোজপুর শহরের রাজারহাট এলাকার শিব নারায়ন দত্তের (৭২) পরিবারের সদস্যরা বংশ পরম্পরায় শাঁখা তৈরি করে আসছেন। বাপ-দাদার পেশাকে এখনো ধরে রেখেছেন তিনি। তাঁর পরিবারের আরও দুই সদস্য এ পেশায় রয়েছেন।

শিব নারায়ন দত্ত জানালের, এক সময়ে পিরোজপুরের শাঁখার কদর ছিল এ অঞ্চলে। আশপাশের এলাকা থেকে লোকজন এখানে শাঁখা কিনতে আসতেন। শহরে অনেকগুলো শাঁখার কারখানা ছিল। বিবাহিত হিন্দু নারীরা শাঁখাসহ শঙ্খের তৈরি অলঙ্কার ব্যবহার করতেন। এখন শাঁখা তৈরির কাঁচামালের দুস্প্রাপ্যতা ও মূল্য বৃদ্ধিসহ নানা প্রতিকূলতার কারণে হাজার বছরের পুরানো এ শিল্পকে ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন শাঁখা শিল্পীরা। ফলে ঐতিহ্যবাহী শাঁখা শিল্পে বর্তমানে বিরাজ করছে চরম দুর্দিন।

শিব নারায়ন দত্ত ক্ষোভ ঝেড়ে বললেন, স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু এ শিল্পের জৌলুস ধরে রাখতে  দেশের প্রত্যেক শাঁখা শিল্পী পরিবারকে ১০০টি করে শঙ্খ দিয়েছিলেন। এরপর আর কোন সরকার এ শিল্পের দিকে নজর দেয়নি। রাষ্ট্রীয় পৃষ্টপোষকতা না থাকায় এ শিল্প আজ হারিয়ে যাচ্ছে। জীবন-জীবিকার তাগিদে নয়, পূর্ব পুরুষের ঐতিহ্য ধরে রাখতে তিনি ও তাঁর পরিবার এ শিল্পকে ধরে রেখেছেন।

শাঁখা শিল্পীরা জানান, শঙ্খশিল্পের প্রধান উপকরণ সমুদ্রের বিশেষ কয়েক প্রজাতির শঙ্খ। যা শ্রীলংকায় পাওয়া যায়। সেখান থেকে শঙ্খ রপ্তানি হয় ভারত ও বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনায় কয়েক জন আমদানিকারক এই শঙ্খ আমদানি করে থাকেন। ঢাকার শাঁখারিবাজার, খুলনার ধর্মসভা সড়ক ও দোলখোলার শঙ্খের মোকাম থেকে শঙ্খ কিনে এনে নিজস্ব কারখানায় অলঙ্কার তৈরি করেন শিল্পীরা। ঢাকার শাঁখারী বাজারে শঙ্খের অলঙ্কার কেনাবেচার প্রধান কেন্দ্র হলেও চট্টগ্রাম, খুলনা, ঝালকাঠি ও পিরোজপুরে শঙ্খব্যবসা প্রচলিত আছে। হিন্দু সম্প্রদায়ের বিয়ে, পূজা-পার্বণ উৎসবে শাঁখার অলঙ্কার ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এক সময়ে মুসলিম নারীরাও শখের বসে শঙ্খের অলঙ্কার পরিধান করতেন। বর্তমানে এসবের ব্যবহার কমে গেছে। আধুনিক প্রযুক্তির অবদানে এখন নানা ধরণের মনোহর চুরি ও বালা বাজারে আসায় শাঁখার চাহিদা কমে গেছে।

পিরোজপুর শহরের মা শঙ্খ ভান্ডারের মালিক সুমন কুমার দত্ত বলেন, তিন দশক আগেও পিরোজপুর শহরে আটটি শাঁখা তৈরির কারখানা ছিল। বর্তমানে রয়েছে মাত্র দুটি। শঙ্খের অপ্রতুলতা ও দাম বৃদ্ধির কারণে অনেক শাঁখা শিল্পী পেশা পরিবর্তন করেছেন। এভাবে চলতে থাকলে দেশে শঙ্খ শিল্প একদিন অস্তিত্ব হারাবে।

শাঁখার দাম:
ভালো আকৃতির একটি শঙ্খ দিয়ে দুই থেকে তিন জোড়া শাঁখা তৈরি হয়। শঙ্খ বিশেষ ধরণের করাত দিয়ে গোলাকার করে কেটে বিভিন্ন আকারের বলয় তৈরি করা হয়। এরপর সেটিকে শিলে ঘষে মসৃণ করা হয় ও বিভিন্ন নকশা আঁকা হয়। প্রতিটি শাঁখার জোড়া অংশ নিখুঁতভাবে লাগিয়ে তাতে ফুল, লতা, মাছ, পাখির নকশা তোলা হয়। এসব শাঁখা প্রতি জোড়া ৫০০ থেকে ১ হাজার ৫০০টাকায় বিক্রি হয়। পাশাপাশি গলার হার ৪ হাজার ও আংটি ৩০ থেকে ৫০ টাকায় বিক্রি হয়। এছাড়া স্বর্ণ দিয়ে বাঁধাই করা শাঁখা পাওয়া যায়। এগুলোর দাম স্বর্ণের পরিমাণের ওপর নির্ভর করে।
সম্পাদনা : আ ই (জি-নিউজবিডি২৪ )

সর্বশেষ আপডেট

আরকাইভ