সংবাদটি প্রকাশ হয়েছেn: Mon, Jun 11th, 2018
bashundhara

জাতীয় বাজেট ২০১৮-১৯ এর উপর আইবিএফবি’র প্রতিক্রিয়া

DSC_6255জি-নিউজবিডি২৪ডেস্ক :  বাজেটের সূফল সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছানোর জন্য আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা আনয়ন, টেশসই উন্নয়ন লক্ষমাত্রা অর্জনের জন্য খাতভিত্তিক পর্যাপ্ত বরাদ্দ, কৃষি ও উৎপাদন খাতের ভীত মজবুত করা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের উন্নয়নে নজর বৃদ্ধি, অনুন্নত এলাকার উন্নয়নকল্পে প্রণোদনা প্রদান, আধুনিক ও প্রযুক্তি নির্ভর বাংলাদেশ বিনির্মাণে উপযুক্ত ব্যাবসায়ের পরিবেশ সৃষ্টি ও বেসরকারী খাতকে এগিয়ে নেয়ার জন্য বরাদ্দ, বাজেট বিকেন্দ্রীকরন এবং সকল ক্ষেত্রে সুশাসন নিশ্চিত করাই ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটের বিশেষ প্রতিপাদ্য হওয়া প্রয়োজন বলে আইবিএফবি বিশ্বাস করে ।

সংবাদ সম্মেলনে আইবিএফবি প্রেসিডেন্ট হাফিজুর রহমান খান জানান, দেশের অর্থনৈতিক বুনিয়াদ মজবুত করার জন্য উন্নয়নশীল  বাজেটের কোন বিকল্প নেই। ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ফোরাম অব বাংলাদেশ (আইবিএফবি) মনে করে বাংলাদেশকে টেকসই উন্নয়নশীল দেশে উন্নীতকরণ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে একটি উন্নত ও প্রগতিশীল রাষ্ট্রে পরিণত করতে একটি বহুমুখী, বাস্তবায়নযোগ্য এবং সম্প্রসারণশীল বাজেটের প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য। এ প্রেক্ষাপটে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত ৪ লক্ষ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা দেয়ার জন্য আইবিএফবি মাননীয় অর্থমন্ত্রীকে আন্তরিক অভিবাদন জানায়। বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কাঠামো ও এর গতি প্রকৃতির সাথে তুলনা করলে এ বাজেট বরাদ্দ খুব বেশী নয়। এদেশের অর্থনীতির ভিত মজবুত করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দেশী বিদেশী বিনিয়োগ তরান্বিত করা, অবকাঠামোগত উন্নয়নে মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা, সামাজিক নিরাপত্তা বলয় বৃদ্ধি, সামগ্রিক ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করা এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নের জন্য বাজেটের পরিমান আরো বৃদ্ধি করার অবকাশ ছিল।

বাজেটের আকার
এটি অত্যন্ত উৎসাহব্যঞ্জক ব্যাপার যে, আমাদের জাতীয় বাজেটের আকার ক্রমাগতভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাজেটের এ ক্রমাগত বৃদ্ধি আমাদের অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও সক্ষমতা অর্জনের পরিচায়ক। সার্বিক দিক বিবেচনায় ৪ লক্ষ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা আকারের একটি বাজেট প্রস্তাব করার সক্ষমতা অর্জন করাও নিঃসন্দেহে একটি উৎসাহব্যঞ্জক ব্যাপার যার জন্য আইবিএফবি মাননীয় অর্থমন্ত্রীকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানায়। বিগত  ২০১৬-১৭ এবং ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেট পূর্ববর্তী বছরের বাজেটের তুলনায় যথাক্রমে ১৫.৪২% ও ১৭.৫২% বৃদ্ধি পেয়েছে। ভবিষ্যতে বাজেটের আকার বৃদ্ধির ক্রমবর্ধমান ধারা অব্যাহত রাখার জন্য সচেষ্ট হওয়া প্রয়োজন বলে আইবিএফবি বিশ্বাস করে। কারণ ক্রমবর্ধমান আকারের বাজেট ও এর যথার্থ বাস্তবায়ন সরকারের রূপকল্প-২০২১ অর্জন অর্থাৎ আগামী ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তরিত করার স্বপ্ন পূরণ করতে সহায়ক হবে।

বাজেট বরাদ্দঃ
আগামী ২০১৮-১৯ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটে অনুন্নয়ন ব্যয় ২ লক্ষ ৮৪ হাজার ৯০৪ কোটি টাকা এবং উন্নয়ন ব্যয় ১ লক্ষ ৭৯ হাজার ৬৬৯ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। বাজেটে অনুন্নয়ন খাতে ব্যয় সামগ্রিক ব্যয়ের ৬১.৩২ শতাংশ যার অর্ধেকের বেশী প্রধান তিনটি খাতে যেমনঃ প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, ঋণের সুদ পরিশোধ ও ভর্তুকিতে ব্যয় হবে। অন্যদিকে প্রস্তাবিত বাজেটে মোট ব্যয়ের মাত্র ৩৮.৬৭ শতাংশ উন্নয়ন খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে। সেক্ষেত্রে জিডিপি বৃদ্ধিতে প্রত্যক্ষ অবদান রাখা উৎপাদনশীল খাতে ব্যয় বাড়ানোর পরিবর্তে অনুৎপাদনশীল খাতে সরকারের সিংহভাগ অর্থ ব্যয় করতে হবে। আইবিএফবি বিশ্বাস করে, একটি দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি তরান্বিত করার জন্য সেদেশের বাজেটের কমপক্ষে ৪৫ শতাংশ উন্নয়ন খাতে ব্যয় করা উচিত। তা না হলে আমাদের রূপকল্প-২০২১ বাস্তবায়নের  মাধ্যমে  আগামী তিন বছরের মধ্যে বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে, ২০৩০ সালের মধ্যে এস ডি জি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং তৎপরবর্তীতে ২০৪১ সাল নাগাদ উন্নত রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করার স্বপ্ন বাস্তবায়ন বিলম্বিত হতে পারে।

সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দের মাত্রা ও ক্ষেত্র বাড়ানো সহ ব্যক্তিখাতের জন্য আলাদা পেনশন স্কিম চালু করার চিন্তা প্রস্তাবিত বাজেটের অন্যতম প্রশংসনীয় দিক যার জন্য মাননীয় অর্থমন্ত্রীকে আইবিএফবি আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানায়।

বাজেট বাস্তবায়নের হারের প্রবনতা পর্যালোচনায় দেখা যায় বাজেট বাস্তবায়নে আমাদের সক্ষমতা আশাব্যঞ্জক নয়। বিগত ২০১৬-১৭ অর্থবছরে প্রস্তাবিত বাজেটের বিপরীতে প্রকৃত বাজেট বাস্তবায়নের হার মাত্র ৭৯.১২ শতাংশ এবং চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরের মার্চ পর্যন্ত এ হার মাত্র ৪১.৭৭ শতাংশ। এখানে উল্লেযোগ্য যে, প্রতি বছর বাজেটের বড় অংশ কাটছাট করা হলেও কাটছাটকৃত বাজেটও সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়ন হয় না, যা বাজেট বাস্তবায়ন সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষেরই বিশেষ দৃষ্টি দেয়ার জোর দাবি রাখে।

তাই বাজেট বাস্তবায়নের হারকে যথাযথভাবে বৃদ্ধি এবং কাজের গুনগতমান সবক্ষেত্রে নিশ্চিত করতে বাজেট বাস্তবায়নের কারিগরি এবং প্রায়োগিক সক্ষমতা বৃদ্ধির উপর বেশি জোর দেয়া অতীব প্রয়োজন এবং তার জন্য বাজেটে পর্যাপ্ত বরাদ্দ থাকা উচিত বলে আইবিএফবি মনে করে।

বাজেট বাস্তবায়ন সক্ষমতা পর্যালোচনা ও পরীবীক্ষণের জন্য বেসরকারী খাতকে সম্পৃক্ত করে একটি স্বাধীন সংস্থা সৃষ্টি করা বা একটি কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে। একই সাথে জাতীয় সংসদে সম্পূরক বাজেট পাশ করার সময় জবাবদিহিমূলক পর্যালোচনা জোরদার করা গেলে বাজেট বাস্তবায়নের গতি বৃদ্ধি পাবে।

উন্নয়ন-অনুন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়নে অদক্ষতা ও বিলম্ব দূরীকরনের ক্ষেত্রে  অর্থছাড় ও ব্যয় প্রবাহে বিদ্যমান সমস্যা সমাধানকল্পে অর্থবছর শুরুতেই অর্থছাড়ের একটি নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। অথচ ২০০৬ সাল থেকে প্রবর্তিত মধ্যমেয়াদী বাজেট কাঠামো অনুশাসনের দ্বারা ইতিমধ্যে অর্থছাড় বিকেন্দ্রীকরণ ছাড়াও (তিন বছর) মধ্যমেয়াদী বাজেট কাঠামো হিসেবে যে পদ্ধতি প্রচলিত আছে তা অনুসরনই যথেষ্ট। উন্নয়ন প্রকল্পের ঠিকাদারকে অর্থ পরিশোধ বা রিইমবার্জমেন্ট প্রক্রিয়ার মধ্যে (সিআইবিতে শ্রেণীকরণ এড়াতে) প্রকল্প পরিচালক ও ব্যাংকার সমন্বয়ে সৃষ্ট জটিলতা সংস্কারের আওতায় আনা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে অর্থবছরের সময়সীমা পরিবর্তনে (জানুয়ারী-ডিসেম্বর বা এপ্রিল-মার্চ) গুনগতমান বজায় রেখে স্বচ্ছতার সাথে উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনের চিরন্তন সমস্যার সুষম সমাধান হতে পারে।

অনুন্নত এলাকার উন্নয়নকল্পে প্রণোদনা প্রদানঃ
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ খানার আয় ও ব্যয় নির্ধারণ জরিপ ২০১৬-তে প্রাপ্ত তথ্যমতে দেশের পূর্বাঞ্চল অর্থাৎ ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলের তুলনায় দেশের উত্তরাঞ্চল বিশেষতঃ রংপুর অঞ্চলে দারিদ্যের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশে প্রবৃদ্ধি ও মাথাপিছু আয় বাড়ছে এবং একইসাথে আয়বৈষম্যও সমান তালে বাড়ছে। ফলে ঢাকা ও সিলেট বিভাগের তুলনায় রংপুর বিভাগের দারিদ্র্যের হার তিন গুণ বেশী বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রাপ্ত তথ্যমতে, ঢাকা বিভাগের নারায়নগঞ্জে মাত্র ২.৬% দরিদ্র মানুষ রয়েছে, অথচ রংপুর বিভাগের কুড়িগ্রামে ৭১% এবং এরপরেই দিনাজপুরে ৬৪% মানুষ দারিদ্র্যসীমার নীচে বসবাস করছে। এছাড়া রংপুর, দিনাজপুর, গাইবান্ধা ও লালমনিরহাটে দারিদ্যেও পরিমান বৃদ্ধি পেয়েছে।

এ বাস্তবতার আলোকে পিছিয়ে পড়া বিভাগ বিশেষ করে রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের জেলা ও উপজেলাগুলোকে মূলধারার উন্নয়নের সাথে সম্পৃক্ত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ ও বাজেটে বরাদ্দ থাকা প্রয়োজন বলে আইবিএফবি মনে করে। কোন একটি বিভাগ বা জেলা যদি পিছিয়ে পড়ে তাহলে ঐ অঞ্চলের মানুষগুলোও পিছিয়ে পড়বে এবং এর প্রভাব সামষ্টিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের সূচকের উপরও সমানভাবে পড়বে। দঅন্যদিকে শিল্পায়নের দিক থেকে যে সকল বিভাগ এবং জেলাসমূহ তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে আছে ভারসাম্যমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করার জন্য সে সকল অঞ্চলের উপরেও বিশেষ গুরুত্বারোপ করতে হবে। এ কারণে শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া অঞ্চলসমূহের উন্নয়নের জন্য বিশেষ প্রণোদনা দেয়া উচিত। বিনিয়োগকারীরা যাতে সেসব অঞ্চলে বিনিয়োগের জন্য উৎসাহিত হয় তার জন্য উদ্দীপনামূলক ব্যবস্থা নেয়াসহ ব্যাপক অবকাঠামোগত উন্নয়ন, বাজার ব্যবস্থার উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন, সুষম ব্যবসায়ের পরিবেশ সৃষ্টি এবং সহজে গ্যাস বিদ্যুৎ প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে।

এছাড়া পিছিয়ে পড়া অঞ্চলসমূহে বিনিয়োগকারীদের কর অব্যাহতি সুবিধা, কম সুদে ঋণের ব্যবস্থা ও বিনিয়োগের খাতসমূহ চিহ্নিত করে দিতে হবে যাতে তারা সহজে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে এবং যাদের জন্য উন্নয়ন তারা যাতে দ্রুত ও সহজে উন্নয়নের সুবিধা পেতে পারে। পিছিয়ে পড়া সংখ্যালঘু সম্প্রদায় যেমন সাঁওতাল, গারো, চাক্মা, হাজং, মুরং ইত্যাদির জন্য পৃথক উন্নয়নমূলক বাজেট অতীব প্রয়োজনীয়। পিছিয়ে পড়া অঞ্চলসমূহ ও সংখ্যালঘু সমপ্্রদায়ের জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন তরান্বিত করতে তাদেরকে প্রশিক্ষণ দিয়ে স্বল্প খরচে বিদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হলে তা দীর্ঘ মেয়াদে সুফল বয়ে নিয়ে আসবে।

শুল্কহারঃ
আইবিএফবি মনে করে দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও স্বল্পমূল্যে পণ্যসামগ্রী জনগণের কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য দেশে শিল্পস্থাপনকে উৎসাহিত করা ছাড়া অন্য কোন বিকল্প নেই। কিছু কিছু শিল্পের প্রয়োজনীয় কাঁচামালের উপর শুল্ক কর কমানোর প্রস্তাবকে আমরা সাধুবাদ জানাই।

স্থানীয় শিল্পকে সুরক্ষা দেয়ার জন্য বাজেটে কিছু কর প্রস্তাব করা হয়েছে। কৃষি উপকরণ, কীটনাশক, সার, বীজ ইত্যাদির আমাদানী শুল্কমুক্ত রাখা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। চাল আমদানিতে বিদ্যমান রেয়াতি সুবিধা প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং সর্বেচ্চ ২৫% সম্পূরক শুল্ক ও ৩% রেগুলেটরী ডিউটি পুনরায় আরোপ করা হয়েছে। এর ফলে স্থানীয় কৃষকগণ ধান ও চালের ন্যায্যমূল্য পেতে পারেন। স্থানীয় পোল্ট্রি ফিড শিল্পকে উৎসাহ প্রদানের লক্ষ্যে সয়াবিন অয়েল কেক/ফ্লাওয়ার আমদানীতে শুল্ক প্রত্যাহার এবং নিয়ন্ত্রনমূলক শুল্ক কমেিয় ৫ শতাংশ করা হয়েছে। অবশ্য তামাক, পলিথিন ব্যাগ ও এনার্জি ড্রিংক সহ কিছু আইটেমের উপর কঠোর কর প্রস্তাব করা হয়েছে।

রপ্তানীমুখী টেক্সটাইল খাতের সম্প্রসারণে ফ্লেক্স ফাইবার ও ফ্লেক্স টু এন্ড ওয়াস্টের ওপর আরোপিত শুল্ক প্রত্যাহারের প্রস্তাবকে আইবিএফবি সাধুবাদ জানায়। কিন্তু প্রস্তাবিত বাজেটে পোশাক রপ্তানীতে উৎসে কর সম্পর্কে সুস্পষ্ট দিক-নির্দেশনা না থাকায় বিদ্যমান আয়কর অধ্যাদেশের ৫৩ (বিবি) ধারা অনুযায়ী রপ্তানীতে উৎসে কর ০.৭০ শতাংশ থেকে বেড়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ১ শতাংশ হারে নির্ধারিত হয়েছে। এর ফলে দেশের প্রধান রপ্তানী খাতটির ঘুরে দাঁড়ানো বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

অন্যদিকে রপ্তানীমুখী ও সম্ভাবনাময় চামড়া শিল্পের জন্য স্পিরিট লেদারের ক্ষেত্রে আলাদা এইচএস কোড সৃষ্টির প্রস্তাব অত্যন্ত প্রশংসনীয় একটি ব্যাপার।

ঔষধ শিল্পের কাঁচামালের করের ক্ষেত্রে রেয়াতি সুবিধা দেয়ায় ঔষধের মূল্য হ্রাস পাবে। স্থাানীয় রেফ্রিজারেটর উৎপাদন শিল্পকে রক্ষা করতে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ভেদে আমদানী শুল্ক ৫% এবং ১৫% হ্রাস করার প্রস্তাবকে আইবিএফবি স্বাগত জানায়।

অন্যদিকে লৌহ ও ইস্পাত শিল্পের কাঁচামাল ফেরো অয়েলের স্পেসিফিক ডিউটি ১৫% থেকে কমিয়ে ১০% এবং স্পঞ্জ আয়রন আমদানীতে স্পেসিফিক কাস্টমস ডিউটি টনপ্রতি ১০০০ টাকা থেকে কমিয়ে ৮০০ টাকায় নির্ধারণ করায় মাননীয় অর্থমন্ত্রীকে আইবিএফবি ধন্যবাদ জানাচ্ছে।

দেশীয় শিল্পে ভ্যাট অব্যাহতিঃ
দেশে এখন স্থানীয়ভাবে মোটরসাইকেল উৎপাদন এবং কিছু দেশে রপ্তানীও হচ্ছে। স্থানীয় উৎপাদনমুখী শিল্প যেমনঃ মোবাইল ফোন উৎপাদন, মোটর সাইকেল উৎপাদন প্রভৃতি শিল্পে ভ্যাট অব্যাহতি অব্যাহত রাখার প্রস্তাবকে আইবিএফবি আন্তরিকভাবে স্বাগত জানাচ্ছে। এছাড়া অর্থমন্ত্রী মহোদয় দেশে মোটরগাড়ী সংযোজনের একটি নীতিমালা প্রনয়ণের আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন যার জন্য আইবিএফবি আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছে।

এছাড়া কৃষি, ভারী প্রকৌশল শিল্প, টেক্সটাইলসহ বেশ কিছু পণ্য ও সেবার বিভিন্ন পর্যায়ে নতুনভাবে ভ্যাট অব্যাহতির প্রস্তাব অত্যন্ত প্রশংসনীয় দিক যা রপ্তানীমুখী খাতের স্বার্থ সংরক্ষণ এবং স্থানীয় শিল্পের বিকাশ, সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণকে উৎসাহিত করতে কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। এসবের মধ্যে ঔষধশিল্পে ক্যানসার ও কিডনীজাতীয় রোগের প্রতিষেধক, গবাদীপশুর খাদ্য হিসেবে ফসলবীজ ইত্যাদির আমদানী পর্যায়ে ভ্যাট অব্যাহতি, দরিদ্র ও শ্রমজীবি মানুষের ব্যবহার্য প্রতি কেজি ১০০ টাকা মূল্যমানের পাউরটি, হাতে তৈরী বিস্কুট এবং ১৫০ টাকা মূল্যমানের হাতে তৈরী কেক ইত্যাদির ক্ষেত্রে উৎপাদন পর্যায়ে ভ্যাট অব্যাহতি, প্লাস্টিক ও রাবারের তৈরী ১৫০ টাকা পর্যন্ত মূল্যমানের হাওয়াই চপ্পল ও পাদুকার উৎপাদন পর্যায়ে বিদ্যমান ভ্যাট অব্যাহতি সুবিধা প্রভৃতি প্রস্তাবিত বাজেটের অত্যন্ত প্রশংসনীয় দিক।

প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ করঃ
বরাবরের মতো প্রস্তাবিত বাজেটে প্রত্যক্ষ করের অনুপাত পরোক্ষ করের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। প্রস্তাবিত ২০১৮-১৯ বাজেটে প্রত্যক্ষ কর বা আয়করের পরিমাণ ৩৪.০% যা চলতি অর্থবছরে ৩৪.৪১% এবং ২০১৬-১৭ অর্থবছর ও ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ছিল যথাক্রমে ৩৫.৪১% ও ৩০.৮২%।

অন্যদিকে ২০১৫-১৬, ২০১৬-১৭ ও ২০১৭-১৮ অর্থবছরে মোট রাজস্বের মধ্যে পরোক্ষ করের পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ৬৯.১৮, ৬৫.৫৯ ও ৬৫.৬৮ শতাংশ। প্রস্তাবিত বাজেটে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) নিয়ন্ত্রিত পরোক্ষ করের পরিমান নির্ধারণ করা হয়েছে ৬৬.০% যার মধ্যে (যা মোট অর্থায়নের ৬৩.৭%) মূল্য সংযোজন কর ৩৭.৩%, আমদানী শুল্ক ১১.০%, সম্পূরক শুল্ক ১৬.৫% এবং অন্যান্য ১.২%।

পাশর্^বর্তী দেশ ভারতে সর্বমোট কর রাজস্বেও ৫১.৬% আসে প্রত্যক্ষ কর থেকে এবং ৪৮.৪% আসে পরোক্ষ কর থেকে। অথচ বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ চিত্র পুরোপুরি উল্টো। আইবিএফবি মনে করে, অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুফল সকলের কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য পরোক্ষ করের তুলনায় প্রত্যক্ষ করের অনুপাত ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। কারণ পরোক্ষ কর বৃদ্ধিতে দেশের দরিদ্র ও শ্রমজীবি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অন্যদিকে প্রত্যক্ষ কর দেশের ধনীক শ্রেণীর উপর করের পরিমাণ বৃদ্ধি করে। এ কারনে আরো বেশী পরিমাণ করদাতাকে করের আওতায় আনলে রাজস্ব সংগ্রহের পরিমাণ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাবে যা পরোক্ষ করের উপর সরকারের নির্ভরশীলতাকে অনেকাংশে কমিয়ে দেবে।

আয়কর ও আয়করের পরিধি বৃদ্ধিঃ
ব্যক্তি খাতে করমুক্ত আয়ের সীমা না বাড়ানোতে কম আয়ের মানুষের উপর চাপ বাড়বে। ব্যাক্তিগত করমুক্ত আয়ের সীমা অন্ততপক্ষে তিন লক্ষ টাকা করা এবং করদাতার সংখ্যা বাড়ানোর জন্য আরো বাস্তবমূখী পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। ব্যক্তি পর্যায়ে সম্পদের উপর প্রযোজ্য করের প্রস্তাব প্রশংসার দাবী রাখে।

তৈরী পোশাক খাতের করপোরেট কর ১২% থেকে বৃদ্ধি করে ১৫% করা হয়েছে, যা পূর্বের হার অনুযায়ী পুনঃনির্ধারণ করা উচিত। ব্যবসায়ী সমাজের বারংবার অনুরোধ ও তৎপরবর্তীতে আশ^াস সত্ত্বেও করপোরেট কর হার কমানো হয়নি। যে সমস্ত শিল্পপণ্য এবং নিত্য ব্যবহার্য পণ্যসামগ্রী সাধারণ জনগণ ব্যবহার করে সে সমস্ত পণ্যসংশ্লিষ্ট খাতে করপোরেট কর না কমিয়ে প্রস্তাবিত বাজেটে কেবলমাত্র ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহের ক্ষেত্রে করপোরেট কর কমানোয় আইবিএফবি অত্যন্ত বিস্মিত হয়েছে। এখানে লক্ষ্যনীয় ব্যাপার হলো ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহের উদ্যোক্তা বা মালিকপক্ষ প্রকৃতপক্ষে দেশের ধনীক শ্রেণীরই প্রতিনিধিত্ব করে থাকে। তাই শুধুমাত্র আর্থিক খাত সংশ্লিষ্ট খাতকে সুবিধা না দিয়ে সংশ্লিষ্ট সকল খাতেই করপোরেট কর কমানো উচিত বলে আইবিএফবি মনে করে।

বাজেটের সূফল সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছানোর জন্য আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা আনয়ন, টেশসই উন্নয়ন লক্ষমাত্রা অর্জনের জন্য খাতভিত্তিক পর্যাপ্ত বরাদ্দ, কৃষি ও উৎপাদন খাতের ভীত মজবুত করা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের উন্নয়নে নজর বৃদ্ধি, আধুনিক ও প্রযুক্তি নির্ভর বাংলাদেশ বিনির্মাণে উপযুক্ত ব্যাবসায়ের পরিবেশ সৃষ্টি ও বেসরকারী খাতকে এগিয়ে নেয়ার জন্য বরাদ্দ, বাজেট বিকেন্দ্রীকরন এবং সকল ক্ষেত্রে সুশাসন নিশ্চিত করাই ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটের বিশেষ প্রতিপাদ্য হওয়া প্রয়োজন।

পরিশেষে আইবিএফবি মনে করে প্রস্তাবিত বাজেট যাতে যথাবাস্তবায়নযোগ্য হয়ে ওঠে সে ব্যাপারে ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে পরীক্ষা ও পর্যালোচনার নিয়মিত ব্যবস্থা নেয়া উচিত। সম্পূরক বাজেট পাশকালে জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরনে সংসদেও কর্তৃত্ব ও ভূমিকাকে অর্থবহ করা যেতে পারে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচী বাস্তবায়ন পর্যালোচনা ও পরিবিক্ষণের জন্য বেসরকারি খাতকে অন্তর্ভূক্ত কওে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিশন/কমিটি করা যেতে পারে।

ব্যাংকিং খাতের কাছে প্রত্যাশিত পুনঃবিনিয়োগ ও সুদহার সুষমকরণের উদ্দেশ্য নিয়ে করপোরেট করহার যা  হ্রাস করা হয়েছে তার ফলাফল  যথাযথ পরীবীক্ষণের আওতায় আনা সমীচীন হবে এবং ব্যাংক কমিশন গঠনের মাধ্যমে ব্যাংক খাতে আস্থা সৃষ্টি নিশ্চিত করতে পারলে বাংলাদেশ প্রকৃত প্রস্তাবে “সমৃদ্ধ আগামীর পথযাত্রায়” অগ্রসর হতে পারবে।

আইবিএফবির প্রেসিডেন্টের বক্তব্য শেষে প্রশ্নোতেÍার পর্বে আইবিএফবির ভাইস প্রেসিডেন্ট, মো: ওমর সাফায়াত কাউছার, হুমায়ুন রশিদ, এবং আইবিএফবির ডিরেক্টর ও এনবিআর এর সাবেক চেয়ারম্যান ড. আব্দুল মজিদ, ডিরেক্টর ,এম এস সিদ্দিকি, সৈয়দ মুস্তাফিজুর রহমান, মোহাম্মদ আলী দ্বীন উপস্থিত ছিলেন।
সম্পাদনা : আ ই (জি-নিউজবিডি২৪ )

সর্বশেষ আপডেট

আরকাইভ

June 2018
T F S S M T W
« May   Jul »
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
282930