1. gnewsbd24@gmail.com : admi2019 :
শুক্রবার, ০২ অক্টোবর ২০২০, ০১:২২ পূর্বাহ্ন

কৃষকের প্রভাব প্রতিপত্তি ও ঐতিহ্যের প্রতীক ধানের গোলা

নাজমুল হক নাহিদ, আত্রাই প্রতিনিধি (নওগাঁ) :
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৪ মে, ২০২০
  • ৩৫ বার পঠিত

নওগাঁর আত্রাইয়ের গ্রামবাংলার সমৃদ্ধির প্রতীক ধানের গোলাকে আধুনিক সভ্যতার ছোঁয়া ছুয়েছে। কৃষকের প্রভাব প্রতিপত্তি ও ঐতিহ্যের প্রতীক ধানের গোলাকেও বাদ পড়েনি। হারিয়ে যাচ্ছে কৃষকের আঙ্গীনায় শোভা বর্ধন করে থাকা ধান মজুদের গোলা। অথচ এই গোলাই এক সময় স্বাক্ষ্য দিতো বাড়ি মালিকের অর্থনৈতিক অবস্থা কি রকম। কত প্রভাব-প্রতিপত্তি ও ঐতিহ্যের এই পরিবার। ছেলে-মেয়ের বিয়ে দিতে গেলে আগেই দেখা হতো বাড়িতে ধানের গোলা আছে কিনা। সেই সাথে গোয়ালে দুধের গাভী আছে কতটা। ধানের গোলা গরুর গোয়াল আর পুকুর থাকলেই বোঝা যেতো পরিবারটির সার্বিক অবস্থা। বলা হতো ধানী-মানি গারস্ত। কিন্তু সেই দিন আর সেই অবস্থা আজ আর নেই। মেয়ে পক্ষ আগেই জানতে চান ছেলে করে কি ? চাকুরি হলে খুশি হন। বেজায় খুশি হন ছেলে যদি করে সরকারি কোন চাকুরি।

সরকারি হলে পদ-পর্যাদা নিয়েও ভাবেন না মেয়ে পক্ষ। সবমিলিয়ে গোলা গোয়াল পুকুর এখন আর মুল্যায়নে আসে না। বলতে গেলে সবার অজান্তেই প্রায় বিলুপ্তির পথে কৃষকের ঐতিহ্যের প্রতীক ধানের গোলা। একটু জুতওয়ালা কৃষকও এখন আর গরু পালতে চান না। পুকুর থাকলে তা মাটি ভরাট করে নির্মাণ করা হচ্ছে বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। এখন শহর চলে গেছে গ্রামে। গ্রামরূপ নিয়েছে শহরের। অধিকাংশগ্রামে গড়ে উঠেছে বাজার ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। গোলাভর্তি ধান, গোয়ালভরা গরু, পুকুরভরা মাছ এই ছিল আবহমান বাংলার কাব্যিক অভিব্যক্তি। জনশ্রুতি রয়েছে এক সময় সমাজের নেতৃত্ব নির্ভর করত এই ধানের গোলার ওপর হিসাব কষে। এসব এখন শুধুই কল্পকাহিনী।

গ্রামাঞ্চলে বাড়িতে বাড়িতে বাঁশ দিয়ে তৈরি গোলাকৃতির ধানের গোলা বসানো হতো উঁচুতে। গোলার মাথায় থাকত টিনের তৈরি মিসরের পিরামিড আকৃতির টাওয়ার, যা দেখা যেত দূর থেকে। বর্ষার পানি আর ইঁদুর কোনোভাবেই ঢুকত না গোলায়। মই বেয়ে গোলায় উঠে ধান রাখতে হতো। এই সুদৃশ্য গোলা ছিল কৃষক পরিবারের গর্বের ধন। বর্তমানে পাল্টে গেছে গ্রামবাংলার সেই চিরাচরিত রূপ।

ধানের উৎপাদন অনেক বৃদ্ধি পেলেও বেশি চাহিদার কারণে ধান সংরক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে না। অধিক জনসংখ্যার কারণে উৎপাদিত বিপুল পরিমাণ ধানও নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। ফলে গোলায় আর ধান সংরক্ষণ করতে পারছে না কৃষক। তাই গোলার ইতিহাস বর্তমান প্রজন্মের কাছে এখন কল্পকাহিনী হয়ে গেছে। কৃষিনির্ভর অর্থনীতিভিত্তিক সামন্ততান্ত্রিক সমাজ বদলের সঙ্গে সঙ্গে গোলাও স্বাভাবিকভাবেই বিলুপ্তির পথে এগিয়ে যাচ্ছে। তবে এখনো গ্রামাঞ্চলে কিছু ধনী কৃষক পরিবারে ধানের গোলার অস্তিত্ব রয়েছে।

এ বিষয়ে উপজেলার শাহাগোলা ইউনিয়নের ভবানীপুর গ্রামের প্রবীন ব্যক্তি আজাদ প্রমিানিক বলেন, গোলায় অল্প জায়গায় অনেক ধান রাখা যায়। তাতে ধান শুকিয়ে রেখে দিলে অনেক দিন ভালো থাকে। তিনি আরো বলেন, একটা সময় ছিল যখন প্রতিটি কৃষক গেরস্থের বাড়িতে ধানের গোলা ছিল। কার্তিক মাস এলেই দেশে খাদ্যসংকট দেখা যেত। মাঠে-ঘাটে থাকত না কোনো কাজ। তখন শ্রমজীবী ও প্রান্তিক কৃষক গ্রামের গেরস্থের কাছ থেকে ধান দাদন নিত। ধান উঠালে তারা সেই ধানের মূল্য পরিশোধ করত। এখন দাদন ব্যবসা লুফে নিয়েছে এনজিও ওয়ালারা। ভেরি বানিয়ে মাছের চাষ করছেন শহর থেকে আসা কোটিপতিরা। ফার্মে চাষ হচ্ছে গরু। তবে সেই ঐতিহ্য হারিয়েও কারোর আফসোস করতে দেখা যায় না। বরং ছেলে-বউ কিংবা মেয়ে-জামাই চাকুরি করে বলতেই বেশি সম্মানবোধ করেন গ্রামের সেই কৃষক।

এ ব্যপারে তারাটিয়া গ্রামের কৃষক মোঃ জসিম উদ্দিন বলেন, আগে আমাদের বাব-দাদারে কাছে শুনেছি বর্ষার সময়ে কৃষকরা ধান মাড়াই করে গোলায় কিংবা বড় আকারের মাটির তৈরী পাত্রে রাখা হতো ধান। তা শুকনো মৌসুমে বের করে শুকিয়ে বাজারজাতসহ নিজেদের জন্য রাখা হতো। এখন আর এগুলো দেখা যায় না। কালের বিবর্তনে তা হারিয়ে গ্রামের কৃষকরা উৎপাদিত ধান-চাল লোহার তৈরী ড্রামের মধ্যে রাখে এবং শহরে পরিনত হয়েছে গুদাম ঘরে।

উপজেলা কর্মকর্তা কৃষিবিদ কেএম কাউছার হোসেন বলেন, আগে চেয়ে কৃষদের আবাদি ও বসবাসের জমি কমে যাওয়া, গোলা তৈরীতে জায়গা বেশি লাগা, গোলাকে বায়ুরোধী রাখতে না পারার জন্য পোকা ও রোগের আক্রমনের সম্ভনা দেখা দেয়া এবং অঙ্কুরোদবম ক্ষমতা কমে যাওয়াসহ নানা কারনে ধানের গোলা এখন গুদাম ঘরে পরিনত হয়েছে।

এদিকে উপজেলার সচেতনমহল মনেকরেন আধুনিকতার ছোঁয়া ছুয়েছে কৃষক ও কৃষকের পরিবারকেও। হয়তো চাকচিক্য ও বিলাসী জীবন তাদের ভুলিয়ে দিয়েছে ঐতিহ্যের কথা।

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

এ জাতীয় আরো খবর..

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি  © All rights reserved © 2011 Gnewsbd24
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com
themesbazargewsbd451