সোমবার, ১৫ অগাস্ট ২০২২, ০৪:৫০ অপরাহ্ন

Surfe.be - Banner advertising service

গাংনী; নেই ঘটক, নেই ঘটকালী

মজনুর রহমান আকাশ, মেহেরপুর প্রতিনিধি :
  • Update Time : রবিবার, ২৬ জুলাই, ২০২০

মেহেরপুরের গাংনীর মিনাপাড়া গ্রামের ইমান আলী। ছোটকালে হাসির ছলে এক বন্ধুর বিয়ে দেন পাশের গ্রামের এক অনাথ মেয়ের সাথে। সে সময় গ্রামের মৌলভীর মুখে শুনেছেন ১০১ টি বিয়ে দিলে জান্নাতী হওয়া যায়। এ থেকেই শুরু করেন এ ঘটকালী। গত ২২ বছরে দশ হাজারেরও বেশি ছেলে মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন তিনি। এখন সবাই তাকে ইমান ঘটক নামে চিনেন।

তবে এখন আর হাক ডাক নেই। মোবাইল ফোনের বদৌলতে ফেসবুক, হোয়াট্স আপের মাধ্যমে ছেলে মেয়েরা প্রেমজ সম্পর্ক করে একাই বিয়ে করছেন। কখনও পরিবারের লোকজন নিজেরাই বিয়ের ব্যবস্থা করছেন। ঘটকের আর তেমন প্রয়োজন পড়ছে না। বিলুপ্তির পথে এ ঘটকালী প্রথা।

বছর বিশেক আগেও গ্রাম গঞ্জে চোখে পড়তো ঘটকরা পান চিবুতে চিবুতে ছাতা বগলে হেঁটে চলেছেন গ্রামের পর গ্রাম। সজাগ দৃষ্টি কার বাড়িতে রয়েছে বিবাহযোগ্য ছেলে মেয়ে। ঘটকের কাছে টাকা-পয়সা তেমন মুখ্য নয়, বরং বিয়ের ঘটকালি করে তিনি অনেক আনন্দ পান। তাঁর আবার নিন্দুকেরও অভাব নেই। বিয়েটি সুখের হলে ঘটকের কথা কেউ তেমন মনে রাখে না। তবে বিয়ের পর যদি অশান্তি বা ঝামেলা দেখা দেয় তাহলে সব দোষ গিয়ে পড়ে ঘটকের ঘাড়ে।

রাইপুর গ্রামের নজরুল ইসলাম জানান, ঘটকদের কথা চালাচালির ধরনই আলাদা। সাতশ’ সাতবার কথা চালাচালি না হলে নাকি বিয়ে হয় না। অর্থাৎ সামাজিক বিয়েতে কথা খরচ করতে হয় প্রচুর। ঘটকের প্রধান কাজই হচ্ছে মেয়ের বাড়িতে ছেলে এবং ছেলের পরিবারের বংশগৌরব ও গুণ-গরিমা প্রকাশ করা, আর ছেলের বাড়িতে মেয়ের রূপসৌন্দর্য ও শিক্ষা-দীক্ষা তুলে ধরা। এভাবেই তিনি দুটি পরিবারকে বিয়ের ব্যাপারে আগ্রহী করে তোলেন। ঘটকের মাধ্যমে পছন্দের পর্বটি শেষ হলে বিয়ের কথাবার্তা ও চূড়ান্ত হয় বিয়ের দিনক্ষণ। বিয়ের আগের দিন হয় গায়েহলুদ অনুষ্ঠান।

বিয়ের অন্যতম অনুষঙ্গ হচ্ছে ভূরিভোজ। ভোজনপর্ব শেষ হলে শুরু হয় বিয়ের মূলপর্ব। কাজি এসে বিয়ে রেজিস্ট্রির কাজটি সমাধা করেন। বিয়ে হয়ে গেলে চলে কনে বিদায়ের পালা। বরের বাড়িতে বধু বরণসহ কিছু আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে অন্দরমহলে অর্থাৎ সাজানো বাসরঘরে নিয়ে যাওয়া হয়। শুরু হয় বর-কনের দাম্পত্য জীবন। বিয়ে হয়ে গেলে আসে ঘটক বিদায়ের পালা। ছেলে বা মেয়ের পক্ষ থেকে তিনি পান কিছু নগদ টাকা, কখনওবা সঙ্গে জামাকাপড় ও একটা ছাতা।

গাংনী উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট শফিকুল আলম জানান, সৃষ্টির আদিকাল থেকেই এ ঘটকালী প্রথাটি চালু। আগে গ্রাম গঞ্জে পেশাদারীত্ব ঘটক প্রথা ছিল না। তারা টাকা পয়সা নিয়েও কোন চিন্তা করতো না। ১৯৮০ সালের গোড়ার দিকে এ প্রথাটি ব্যাপকতা পায়। বিভিন্ন পত্র পত্রিকাতেও ঘটকের বিজ্ঞাপণ দেখা দেয়। এতে খরচ খরচাটাও বেশি। বর্তমানে কেউ আর বেশি খরচ করতেও চাচ্ছে না আবার নিজেরাই এ ঘটকালীর কাজটি করছেন।

রুয়েরকান্দি গ্রামের ঘটক রশিদ জানান, গত ১৫ বছরে সে ১৭০৩ টি বিয়ে দিয়েছেন। এর মধ্যে বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটেছে ১৫ টি। ঘটকের প্রচলন না থাকায় এখন ঘটকালী ছেড়ে দিয়ে ইজিবাইক চালাচ্ছেন। তিনি আরো জানান, আগে ঘটক ছাড়া বিয়ে কল্পনা করা যেতো না। আর এখন ছেলে মেয়েরা এমনকি বিধবারাও ঘর পালিয়ে বিয়ে করছে।

তাছাড়া এখন ছেলে মেয়েরা আর তাদের পরিবারের লোকজন নিজেরাই বিয়ের দেখা শোনা পর্বটি সেরে ফেলায় আর ঘটকের প্রয়োজন পড়ছে না। আগে ঘটকের আগমনে বিয়ে বাড়িতে নানা গীত গাইতো। যা বিভিন্ন নাটকেও দেখা যায়। এখন আর যেমন বিয়ে নেই পারিবারিকভাবে, তেমন এ ঘটকালি প্রথাটির প্রচলনও হারাতে বসেছে।

Surfe.be - Banner advertising service

https://www.facebook.com/gnewsbd24

Leave a Reply

More News Of This Category
© All rights reserved © 2011 Live Media
কারিগরি সহযোগিতায়: মোঃ শাহরিয়ার হোসাইন
freelancerzone