বৃহস্পতিবার, ০৬ অক্টোবর ২০২২, ১১:৩৮ অপরাহ্ন

আম্পানের পর সুচিত্রা-কবিতার ৩ মাস কেটে গেলেও ঘরে ফেরা হয়নি

গাজী যুবায়ের আলম, ব্যুরো প্রধান, খুলনা ঃ
  • Update Time : সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২০

আম্পানের পর দীর্ঘ তিন মাসে কেটে গেলেও ঘরে ফেরতে পারেনি সুচিত্রা-কবিতার। ভেড়ীবাঁধের উপর কুঁড়েঘর বেঁধে অত্যন্ত মানবেতর জীবন-যাপন করছেন তারাসহ ১৮০ পরিবার। আর প্রতিদিন যোগ হচ্ছে নতুন নতুন পরিবার। এক অনিশ্চিত জীবন-যাপনের মধ্যে থাকা এ মানুষগুলো জানেনা তারা কবে ফিরবেন তাদের বসত-বাড়িতে।

‘বসবাসের ঘরবাড়ি নেই, বড় কষ্টে ওয়াপদার উপর কুঁড়েঘর বেঁধে আছি। তিন বেলা দু’মুঠো খাবার জোটে না। এক সাঁঝ (বেলা) খেলে দুই সাঁঝ না খেয়ে থাকি। কুঁড়ে ঘরে পানি পড়ে, রান্না করা খুব কষ্ট, ঝড়-বাতাস, বর্ষায় চুলায় পানি পড়ে। ত্রাণ সামগ্রী সব ভাঙনের দুই পাশে দেয়, যাদের প্রয়োজন নেই তারাই ত্রাণ পাচ্ছে, আমাদের নিয়ে তাদের কোন চিন্তা-ভাবনা নেই। চেয়ারম্যান-মেম্বররা আমাদের কোন খোঁজ-খবর নেয় না’-কথাগুলো এক নিমিষেই বললেন কয়রা উপজেলাধীন উত্তর বেদকাশি ইউনিয়নের হাজতখালি-কাশির হাটখোলার ভেড়ীবাঁধের উপর কুঁড়েঘরে বসবাসরত মনোরঞ্জন সরকারের স্ত্রী সুচিত্রা সরকার (৪৫)।

গত ২০ মে প্রলয়ঙ্কারী ঘূর্ণিঝড় আম্পানের আঘাতে লন্ডভন্ড হয়ে ভিটে-মাটি-বসতঘর হারিয়ে ইউনিয়নের হাজত-খালি কাশির হাটখোলা ভেড়ীবাঁধে কুড়েঘরে মানবেতর জীবন-যাপন করছে যারা, সুচিত্রা সেই ভাগ্যাহতদের একজন। ট্রলার যোগে সরেজমিন পরিদর্শনে যাওয়ার সময় কথা হয় ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ডের হাজতখালী গ্রামের মজিদ মোল¬ার সাথে। দেখা যায় তার পানিতে ডুবে থাকা ঘরবাড়ি। সে ঘর-বাড়ির মধ্যেই মজিদ মোল¬া খাট দিয়ে মাচা করে পরিবার-পরিজন নিয়ে দিন যাপন করছে।

ভগ্ন ঘরবাড়ি, কোন আয়-রোজগার নেই, সংসার চালানো খুবই কঠিন। যাতায়াতের কোন রাস্তা নেই, একটু পর ট্রলার থেকে গলা সমান পানিতে নেমে বড় কষ্টে মজিদ মোল¬া তার বাড়ির দিকে রওয়ানা দিলেন। গত ২০ আগস্ট সরেজমিন পরিদর্শনে কথাগুলো প্রতিনিধির কাছে চোখের পানি ফেলতে ফেলতে বলেন সুচিত্রা সরকার ও মজিদ মোল¬া।

শুধু সুচিত্রা-মজিদ মোল¬া নয়, একই রকমভাবে তাদের কষ্টের কথা বলেন, ভেড়ীবাঁধের কুঁড়েঘরে ও আসে-পাশে ডুবে যাওয়া বাড়ি-ঘরে পানির মধ্যে ইট দিয়ে খাট উঁচু করে বসবাসরত হাজতখালি গ্রামের অমূল্য বরকন্দাজের স্ত্রী গোলাপী বরকন্দাজ (৬৫), আবু সাইদ সানার স্ত্রী তহমিনা বেগম (৪২), মৃত আছির উদ্দিনের পুত্র জামাত সানা (৬৫), চারু সরকারের স্ত্রী যশোমতি সরকার (৪৫), আজগর গাজীর স্ত্রী করিমন্নেছা (৭০), রাজেন মন্ডলের পুত্র ভরত মন্ডল (৬২), হরেন সরকারের স্ত্রী প্রকৃতি সরকার (৪৫), নিমাই সরকারের স্ত্রী কবিতা সরকার (৬৫) সহ আরও অনেকে।

তারা বলেন, গত ২০ মে প্রলয়ঙ্কারী ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানলে কয়রা উপজেলার ৪টি ইউনিয়নের ভেড়ীবাঁধ ভেঙে লোকালয়ে লোনা পানি প্রবেশ করে। জনপ্রতিনিধিদের চেষ্টায় ও এলাকাবাসীর স্বেচ্ছাশ্রমে তিনটি ইউনিয়নের ভেড়ীবাঁধে রিং বাঁধ দিয়ে আটকানো সম্ভব হলেও উপজেলার উত্তর বেদকাশী ইউনিয়নের হাজতখালি ভেড়ীবাঁধের ভাঙন আটকানো সম্ভব হয়নি। সেই থেকে ঘর-বাড়ি হারিয়ে অতিকষ্টে ভেড়ীবাঁধের উপর বসবাস করছি। এখন আমাদের আয়ের সুযোগ নেই, নেই নিরাপদ সুপেয় পানি, ঠিকমত বাথরুমে করতে পারিনা।

ছোট কুড়ে ঘরে অতিকষ্টে আমাদের দিন কাটে। এলাকার যে ঘরগুলো এখনও সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে তার মধ্যে কোমর পর্যন্ত পানি, কোথাও তারও বেশী। এ মুহূর্তে কেউ মারা গেলে সারা ইউনিয়নে কবর বা দাহ করারও কোন ব্যবস্থা নেই। তার উপর গত কয়েক দিনের বৈরী আবহাওয়ার নদীর পানির প্রবল চাপে বর্তমানে সমগ্র ইউনিয়নটি এখন পানির নীচে। অপর দিকে গত কয়েক দিনের বৈরী আবহাওয়ায় নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়াতে অতিরিক্ত পানির প্রবল চাপে গত ২০ আগস্ট সকালের জোয়ারে কয়রা সদর ইউনিয়নের ২নং কয়রা হরিনখোলা ও ঘাটাখালী ভেড়ীবাঁধের রিংবাঁধ ভেঙে লোকালয় লোনা পানিতে তলিয়ে যায়।

জানা গেছে, তখনই উপজেলা চেয়ারম্যান এস এম শফিকুল ইসলামের নেতৃত্বে এলাকাবাসী গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করে রিংবাঁধ সম্পন্ন করে। কিন্তু রাতের জোয়ারে পুনরায় রিং-বাঁধ ভেঙে যায়। এ খবর পাওয়ার পরপরই সকালে উপজেলা চেয়ারম্যান এস এম শফিকুল ইসলাম ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার অনিমেষ বিশ্বাস শুক্রবার সকালে স্থানীয়দের নিয়ে স্বেচ্ছাশ্রমে পুনরায় রিংবাঁধ সম্পন্ন করেন। কিন্তু ভাগ্য বিপর্যয়। দুপুরের জোয়ারে আবারও রিংবাঁধ ভেঙে যায়। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত রিং বাঁধের ভাঙা স্থানগুলো দিয়ে নদীর লোনা পানি লোকালয়ে প্রবেশ করছে।

এলাকাবাসীর ধারণা শিগগির রিং-বাঁধ সম্পন্ন করা না হলে কয়রা উপজেলা পরিষদসহ সমগ্র কয়রা উপজেলা নোনা পানিতে নিমজ্জিত হতে পারে। ইতোমধ্যে বিপুল সংখ্যক মৎস্য ঘের, বসতঘর, নোনা পানিতে ভেসে গেছে। বানভাসি মানুষের আজ প্রশ্ন কি অদৃশ্য কারনে কয়রার রিং-বাঁধ সম্পন্ন হওয়ার পরও তা টিকিয়ে রাখার জন্য পরবর্তীতে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলোনা।

এ ব্যাপারে কয়রা উপজেলা নির্বাহী অফিসার অনিমেষ বিশ্বাস বলেন, স্থানীয়দের সহায়তায় স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে রিংবাঁধ নির্মাণের কাজ চলছে। কয়রায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। সবশেষে দেশের কর্তা ব্যক্তিদের কাছে শিগগিরই টেকসই ভেড়ীবাঁধ নির্মাণ ও নির্মাণ না হওয়া পর্যন্ত বানভাসি মানুষগুলোকে যেন সুসম বন্টনের মাধ্যমে খাদ্য-সামগ্রী সরবরাহ করা হয়, এটাই হতভাগা বানভাসি মানুষের আকুল আবেদন।

 

 

Surfe.be - Banner advertising service

https://www.facebook.com/gnewsbd24

Leave a Reply

More News Of This Category
<script async src="https://pagead2.googlesyndication.com/pagead/js/adsbygoogle.js?client=ca-pub-3423136311593782"
     crossorigin="anonymous"></script>
© All rights reserved © 2011 Live Media
কারিগরি সহযোগিতায়: মোঃ শাহরিয়ার হোসাইন
freelancerzone