সোমবার, ২৮ নভেম্বর ২০২২, ০৬:৫৪ অপরাহ্ন

ভুয়া সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মীতে গিজগিজ করছে

গাজী যুবায়ের আলম, ব্যুরো প্রধান, খুলনা ঃ
  • Update Time : বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২০

ভুঁইফোড় পত্রিকা আর কথিত অনলাইন পত্রিকার কার্ডধারী এসকল সাংবাদিক নামধারীদের অধিকাংশই অস্ত্র-মাদক ব্যবসায়ী ও চিহ্নিত প্রতারক : খুনি-ধর্ষক-চাঁদাবাজও রয়েছে এ তালিকায় : বিড়ম্বনায় প্রশাসন : প্রকৃত সাংবাদিকরা উৎকন্ঠায়।

যশোর জেলার অভয়নগর উপজেলাসহ যশোর, খুলনা, সাতক্ষীরা, নড়াইল, ঝিনাইদহ, বাগেরহাট অঞ্চলে এক শ্রেণির ভুয়া সাংবাদিক ও কথিত মানবাধিকর কর্মীতে যেন গিজ গিজ করছে। আর এসকল নামধারী সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীদের কাছে প্রতারিত হচ্ছে হাজার হাজার মানুষ।

কিছু ভুঁইফোড় পত্রিকা ও অনলাইন নিউজ পোর্টালের মালিক ও সম্পাদক নামধারী সুবিধাভোগীদের ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা ধরিয়ে দিয়ে এসকল নামসর্বস্ব পত্রিকা ও অনলাইন পোর্টালের পরিচয় পত্র (সাংবাদিক কার্ড) বাগিয়ে নিয়ে চষে বেড়াচ্ছে যত্র তত্র।

দামি বেশভূষা, হাতে ক্যামেরা, বাহন হিসেবে মোটর সাইকেল বা প্রাইভেট কার, কোমরে/গলায় কিংবা পকেটে ঝোলানো যেন তেন পত্রিকা বা অনলাইন নিউজ পোর্টালের পরিচয় পত্র, দেখে বোঝার উপায় নেই এরা প্রতারক বা চাঁদাবাজ। এরা সরাসরি প্রবেশ করছে সরকারি দপ্তরে। প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সামনে চেয়ার নিয়ে বসে পড়ছে। থানায় যাচ্ছে, দালালি করছে। আর প্রশাসনও সাংবাদিক ভেবে বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছেন। ব্যবসায়ী মহলকে বিপাকে ফেলে হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা।

এদের হাতে প্রতিনিয়ত অপমান ও লাঞ্ছনার শিকার হচ্ছে নানা শ্রেণি পেশার মানুষ। শিক্ষক, ব্যবসায়ী, চাকুরীজীবী কেউ বাদ পড়ছে না এ প্রতারক চক্রের চাঁদাবাজির হাত থেকে। সম্প্রতি সময়ে এদের অপকর্ম মহামারী আকারে ধারণ করেছে। আর সবচেয়ে আতঙ্কের বিষয় দাগী সন্ত্রাসী, চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী, তালিকাভুক্ত অস্ত্র ব্যবসায়ীরাও এসকল পত্রিকা ও নিউজ পোর্টালের কার্ড ঝুলিয়ে নিজেদের সাংবাদিক দাবি করছে। ফলে আতংক ছড়িয়ে পড়ছে রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে। কেবল তাই নয়, এসকল ভুয়া সাংবাদিক ও সাইনবোর্ড সর্বস্ব মানবাধিকার কর্মীদের তালিকায় খুনি, ধর্ষক ও চাঁদাবাজরাও রয়েছে।

যাদের নামে বিভিন্ন থানায় হত্যা, ধর্ষণ, চাঁদাবাজী, বোমাবাজী, অস্ত্র কারবারি বা মাদক ব্যবসায়ীর একাধিক মামলা রয়েছে, তাদের হাতে সাংবাদিকতার পরিচয়পত্র দেখে রীতিমত থমকে যাচ্ছে সচেতন মহল। সচেতন মহল প্রশ্ন তুলেছেন, এসকল ভুঁইফোড় পত্রিকা কিভাবে বাজারে আসে? বা এই সকল নাম সর্বস্ব নিউজপোর্টাল ও সাইনবোর্ড সর্বস্ব মানবাধিকার সংগঠনগুলো কিভাবে বছরের পর বছর টিকে থাকে? তারা প্রশাসনের উর্দ্ধতন কর্মকর্তাসহ সংশি¬ষ্ট মন্ত্রণালয়ের আশু হস্তক্ষেপ দাবি করে এসকল প্রতিষ্ঠানের মালিক বা সম্পাদক নামধারীদের আইনের আওতায় আনার জোর দাবি তুলেছেন।

সম্প্রতি যশোর, খুলনা ও সাতক্ষীরাসহ আশপাশের জেলায় বেশ কয়েকজন প্রতারক গ্রেফতার ও মামলা হয়েছে। এছাড়াও ঢাকায় র‌্যাবের অভিযানে দু’টি ভুয়া অনলাইন টিভি অফিস সিলগালা ও কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতার হয়েছে সাংবাদিক পরিচয়দানকারী শিশু অপহরণকারীও। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দেশে এ ধরনের অনলাইন ও আইপি টিভি রাখা হবে না। এসকল কথিত সাংবাদিকদের নিয়ে পেশাজীবী সংবাদকর্মী ও প্রশাসন বিব্রত অবস্থায় রয়েছেন।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গত ৩১ আগস্ট খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার হাজিডাঙ্গা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ইংরেজি শিক্ষক শেখর চন্দ্র মন্ডলকে মিথ্যা কেলেংকারিতে জড়ানোর ভয় দেখিয়ে কথিত সাংবাদিক পরিচয়ে নগদ ৬০ হাজার টাকা চাঁদা নেয় একটি চক্র। এসময় তারা ওই শিক্ষকের বাসা থেকে দুই লাখ টাকার চেক স্বাক্ষর করিয়ে নেয়। এ বিষয়ে ভুক্তভোগি শিক্ষক বাদি হয়ে গত ২ সেপ্টেম্বর ডুমুরিয়া থানায় ৬ জনের নাম উলে¬খসহ অজ্ঞাত ৪ থেকে ৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। প্রতারক চক্রটি বেশ কয়েকদিন আগে থেকে মুঠোফোনের মাধ্যমে এক ছাত্রীকে জড়িয়ে কুরুচিপূর্ণ ও আপত্তিকর অভিযোগ তুলে মোটা অংকের চাঁদা দাবি করে আসছিলো।

ওই শিক্ষক জানান, ‘৩১ আগস্ট এনামুল, পলাশ, লিটন গাজী, আছাদ জোয়ার্দার, নাইম হোসেন ও সোহানসহ ৮ থেকে ৯ জন আমার বাড়িতে ঢুকে আমার স্ত্রীর সামনে অপমান করে। এরপর তাদের মারমুখি অবস্থা দেখে নিরুপায় হয়ে নগদ ৬০ হাজার টাকা ও দুই লাখ টাকার একটি চেক দিতে বাধ্য হই।’ গত ৩ সেপ্টেম্বর রাতে সাতক্ষীরায় এক নিকাহ রেজিষ্টারের কাছে ১০ হাজার টাকা চাঁদাদাবির অভিযোগে সাংবাদিক পরিচয়দানকারি চারজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। প্রতারক চক্রটি সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী পরিচয়ে জেলাব্যাপি ব্যাপক চাঁদাবাজি করে আসছিল। নানা শ্রেণি পেশার মানুষকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে তারা চাঁদা আদায় করতো।

গত ২৪ আগস্ট খুলনায় সাংবাদিক পরিচয়ে এক ব্যবসায়ীর কাছে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগে আদালতে মামলা দায়ের করা হয়। আদালত বাদির অভিযোগ আমলে নিয়ে তদন্তের জন্য পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) কে নির্দেশ দিয়েছেন। প্রতারক চক্রটি অনলাইন টিভি’র সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে চাঁদা চেয়েছেন বলে ওই ব্যবসায়ী জানিয়েছেন। ওই ব্যবসায়ীর দায়ের করা মামলায় অভিযুক্তরা হলো খালিশপুর এলাকার তানজীর, আলামিন, উদয়, মোতালেব, হাসান।

গত ২৫ আগস্ট যশোরের অভয়নগরে ম্যাজিস্ট্রেট ও অনলাইন টিভির সাংবাদিক পরিচয়ে চাঁদাবাজির সময় খুলনার ৩ জনসহ চার প্রতারক গ্রেফতার হয়। তাদের কাছ থেকে ভুয়া আইডি কার্ড ও বুম, ক্যামেরা ও একটি প্রাইভেটকার জব্দ করে পুলিশ। গ্রেফতার হওয়া প্রতারকরা হলো খুলনার দৌলতপুর উপজেলার দক্ষিণ পাবলা গ্রামের নূর মোহাম্মদের ছেলে শাহাদৎ হোসেন (৩৫), খালিশপুর উপজেলার গোয়াখালী গ্রামের বাবর আলীর ছেলে মোস্তফা কামাল (৩৫) ও আব্দুর রাজ্জাকের মেয়ে ইতি খাতুন (২২), ঝিনাইদহের কোটচাদপুর উপজেলার আলুকদিয়া গ্রামের শহিদুল ইসলামের ছেলে জহিরুল ইসলাম (৪০)।

তাদের বিরুদ্ধে অভয়নগর থানায় প্রতারনা ও চাঁদাবাজির অভিযোগে মামলা হয়েছে। রাজধানীর পুরানা পল্টন এলাকায় গত ৩ সেপ্টেম্বর র‌্যাবের অভিযানে দু’টি ভুয়া অনলাইন টিভি অফিস সিলগালা করা হয়। এসময় সেখান থেকে কয়েকজনকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। সর্বশেষ রোববার খুলনায় গাঁজাসহ এক ভুয়া সাংবাদিককে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এর আগেও সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী পরিচয়দানকারী বেশ কয়েকজন মাদক ব্যবসায়ী, অস্ত্র ব্যবসায়ী ও চাঁদাবাজকে আটক করেছে পুলিশ। তথাপি এদের সংখ্যা কোন ক্রমেই যেন কমছেনা।

 

Surfe.be - Banner advertising service

https://www.facebook.com/gnewsbd24

Leave a Reply

More News Of This Category
<script async src="https://pagead2.googlesyndication.com/pagead/js/adsbygoogle.js?client=ca-pub-3423136311593782"
     crossorigin="anonymous"></script>
© All rights reserved © 2011 Live Media
কারিগরি সহযোগিতায়: মোঃ শাহরিয়ার হোসাইন
freelancerzone