মঙ্গলবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২২, ০১:৫৬ অপরাহ্ন
শিরোনাম :

নবাব সিরাজউদ্দৌলা বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব : জন্মদিনে শুভেচ্ছা

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২০
  • ২৬২ বার পঠিত

।। এম. গোলাম মোস্তফা ভুইয়া ।।
যে মানুষটির সাথে বাঙালী জাতির ভাগ্য গাঁথা হয়ে গেছে তিনি হলেন নবাব সিরাজউদ্দৌলা। আগ্রাসী কূটকৌশলী ইংরেজ ও দেশীয় বিশ্বাসঘাতকদের হাতে নবাবের পতন কেবল একটি ব্যক্তির পতন ছিলো না, উনার পতনের সাথে সাথে আমাদের জাতিরও পতন ঘটে। বর্তমান বাংলাদেশের দৈন্যদশা দেখে চারিদিকে কেবল নবাবের অভাব বোধ করি। মনে মনে কেবলই কামণা করি মীরজাফরেরা দূরিভুত হয়ে সিরাজউদ্দৌলার মত দেশপ্রেমিকে দেশ ভরে উঠুক।

বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার ২৯৩তম জন্মদিন ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০। ১৭২৭ সালের এই দিনে মুর্শিদাবাদে জন্ম গ্রহন করেন তিনি। মাত্র ২৩ বছর বয়সে বাংলার-বিহার-উরিস্যার শাসনভারের দায়িত্ব নিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু, মীরজাফর-উর্মীচাদ-রায়দুর্লভদের বিশ্বাসঘাতকতায় সময়টা দীর্ঘ হয়নি।

নবাব সিরাজউদ্দৌলা বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার শেষ স্বাধীন নবাব। ১৭২৭ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর মুর্শিদাবাদে জায়েন উদ্দিন ও আমেনা বেগমের ঘরে জন্ম সিরাজউদ্দৌলার। ২৩ বছর বয়সে নানা নবাব আলীবর্দী খান বাংলার নবাবের দায়িত্ব দেন তাকে। কিন্তু ১৪ মাসের শাসনামলে ইতিহাসের কুখ্যাত চরিত্র মীরজাফর ও খালা ঘষেটি বেগমের বিশ্বাস ঘাতকতায় পরাজিত হন পলাশী যুদ্ধে।

নবাব সিরাজউদ্দৌলা ছিলেন বাংলার নবাব আলীবর্দী খান-এর নাতি। আলীবর্দী খানের কোন পুত্র ছিল না। তার ছিল তিন কন্যা। তিন কন্যাকেই তিনি নিজের বড়ভাই “হাজি আহমদ”-এর তিন পুত্র, নোয়াজেশ মোহাম্মদের সাথে বড় মেয়ে ঘসেটি বেগমের, সাইয়েদ আহম্মদের সাথে মেজ মেয়ে এবং জয়েনউদ্দিন আহম্মদের সাথে ছোট মেয়ে আমেনা বেগম-এর বিয়ে দেন। আমেনা বেগমের দুই পুত্র ও এক কন্যা ছিল। পুত্ররা হলেন মির্জা মোহাম্মদ (সিরাজউদ্দৌলা) এবং মির্জা মেহেদী।

আলীবর্দী খাঁ যখন পাটনার শাসনভার লাভ করেন, তখন তার তৃতীয়া কন্যা আমেনা বেগমের গর্ভে মির্জা মোহাম্মদ (সিরাজউদ্দৌলা)-এর জন্ম হয়। এ কারণে তিনি সিরাজের জন্মকে সৌভাগ্যের লক্ষণ হিসেবে বিবেচনা করে আনন্দের আতিশয্যে নবজাতককে পোষ্যপুত্র হিসেবে গ্রহণ করেন। সিরাজ তার নানার কাছে ছিল খুবই আদরের, যেহেতু তার কোনো পুত্র ছিলনা। তিনি মাতামহের স্নেহ-ভালোবাসায় বড় হতে থাকেন। সিরাজউদ্দৌলা জন্মতারিখ বা সাল নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। তবে অধিক গ্রহণযোগ্য মত হলো সিরাজ ১৭৩২ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন।

১৭৪৬ সালে আলিবর্দী খান মারাঠাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে গেলে কিশোর সিরাজ তার সাথী হন। আলিবর্দী খান সিরাজউদ্দৌলা বালক বয়সেই পাটনার শাসনকর্তা নিযুক্ত করেছিলেন। তার বয়স অল্প ছিল বলে রাজা জানকীরামকে রাজপ্রতিনিধি নিযুক্ত করা হয়। নবাব আলি বর্দী খান সিরাজউদ্দৌলাকে মাত্র সতেরো বছর বয়সেই তার সিংহাসনের উত্তরাধিকার ঘোষণা করেন। তবে তাকে সিংহাসনের উত্তরাধিকারী মনোনয়ন করার ঘটনা তার আত্মীয়বর্গের অনেকেই মেনে নিতে পারেনি। অনেকেই তার বিরোধিতা শুরু করেন। এদের মধ্যে ছিলেন আলিবর্দি খাঁর বড় মেয়ে ঘসেটি বেগম এবং তার স্বামী নোয়াজেশ মোহাম্মদ। এছাড়া আলিবর্দী খানের জীবদ্দশায় সিরাজউদ্দৌলা ঢাকার নৌবাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

১৭৫২ সালের মে মাসে আলীবর্দী খান সিরাজউদ্দৌলাকে তার উত্তরাধিকার হিসেবে ঘোষণা করেন। আলীবর্দী খান ১৭৫৬ সালের ১০ এপ্রিল ৮০ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। নানার ইন্তিকালের পরই বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার শাসনভার গ্রহণ করেন তরুণ নবাব সিরাজউদ্দৌলা।

খালা ঘষেটি বেগমের কূটচালে তরুণ নবাবের বিরুদ্ধে চক্রান্তের জাল বিছানো ছিল চারদিকে। ১৪ মাস ১৪ দিনের নবাবীকালে সিরাজউদ্দৌলা নিশ্চিন্তে বিশ্রাম নেয়ার সময় পর্যন্ত পাননি। চক্রান্তে হাবুডুবু খেলেও তরুণ নবাব সিরাজ পুর্নিয়া জেলা থেকে কলিকাতা হয়ে মুর্শিদাবাদ পর্যন্ত হাজার হাজার কিলোমিটার পথ ঘোড়া ছুটিয়েছেন। মসনদ ঠিক রাখতে ৫টি যুদ্ধে অংশ নিয়ে হয়েছে।

২৩ শে জুন, ১৭৫৭ সাল। পলাশীর যুদ্ধে পরাজিত হয়েছেন বাংলার শেষ নবাব সিরাজউদ্দৌলা। পলাশির যুদ্ধে পরাজয় অতঃপর গ্রেফতারের পর ১৭৫৭ সালের ৩ জুলাই মীর জাফরের পুত্র মীর সাদিক আলী খান মীরনের নির্দেশে মোহাম্মদী বেগ কারাগারেই সিরাজউদ্দৌলাকে নির্মমভাবে হত্যা করেন। অস্তমিত হয় বাংলার সূর্য। হত্যার পর নবাবের রক্তাক্ত লাশ হাতির পিঠে করে মুর্শিদাবাদ শহর প্রদক্ষিণ করা হয়। ১৭৩৩ সালে বিহারে জন্ম নেয়া সিরাজউদ্দৌলার খুনি মুহাম্মদী বেগকে লালনপালন করেন আলীবর্দী খানের স্ত্রী শরফুন্নেসা। তিনিই নবাবকে খুন করেন।

১৭৫৭ সালের ৩ জুলাই সিরাজউদ্দৌলা মহানন্দা নদীর স্রোত অতিক্রম করে এলেও তাতে জোয়ার ভাটার ফলে হঠাৎ করে জল কমে যাওয়ায় নাজিমপুরের মোহনায় এসে তার নৌকা চড়ায় আটকে যায়। তিনি নৌকা থেকে নেমে খাবার সংগ্রহের জন্য একটি মসজিদের নিকটবর্তী বাজারে আসেন। সেখানে কিছু লোক তাকে চিনে ফেলে অর্থের লোভে মীর কাশিমের সৈন্যবাহিনীকে খবর দেয়। এ সম্পর্কে ভিন্ন আরেকটি মত আছে যে এক ফকির এখানে নবাব কে দেখে চিনে ফেলে।

উক্ত ফকির ইতঃপূর্বে নবাব কর্তৃক শাস্তিপ্রাপ্ত হয়ে তার এক কান হারিয়েছিল। সেই ফকির নবাবের খবর জানিয়ে দেয়। তারা এসে সিরাজউদ্দৌলাকে বন্দি করে রাজধানী মুর্শিদাবাদে পাঠিয়ে দেয়। বন্দী হবার সময় নবাবের সাথে ছিলেন তার স্ত্রী লুতফা বেগম এবং চার বছর বয়সী কন্যা উম্মে জহুরা। এর পরের দিন ৪ জুলাই (মতান্তরে ৩রা জুলাই) মীরজাফরের আদেশে তার পুত্র মিরনের তত্ত্বাবধানে মুহম্মদিবেগ নামের এক ঘাতক সিরাজউদ্দৌলাকে হত্যা করে। কথিত আছে, সিরাজের মৃত্যুর পর তার মৃতদেহ হাতির পিঠে চড়িয়ে সারা শহর ঘোরানো হয়। মুর্শিদাবাদের খোশবাগে নবাব আলিবর্দী খানের কবরের কাছে তাকে কবর দেয়া হয়।

মীর জাফরের বিশ্বাসঘাতকতায় ২৩ জুন সিরাজউদ্দৌলা লুটেরা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে পলাশির প্রান্তরে যুদ্ধে পরাজিত হন। পশ্চিমবঙ্গের পলাশী প্রান্তরে আম্রকাননে নবাবের সেনাপতি মীর জাফর আলী খান, রাজবল্লভ, শওকত জঙদের মুনাফিকির কারণে নবাবের বাহিনীর পরাজয় ঘটে। এই পরাজয়ে মধ্য দিয়ে বাংলার স্বাধীনতা সূর্য অস্তমিত হয়। বাংলাসহ ভারত উপমহাদেশে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর নামে বর্বর লুটেরা ইংরেজ শক্তির অভ্যূদয় ঘটে। তারপর থেকে ১৮০ বছর ভারতে একচ্ছত্র রাজত্ব চালিয়েছে ইংরেজরা।

পলাশী যুদ্ধে সিরাজ বিজয়ী হতে পারেন নি। কিন্তু গ্লানিও পাননি। তবে পলাশীর যুদ্ধে যারা নবাবের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে ইংরেজদের জিতিয়ে দেন পরবর্তীতে তাদের সকলের মৃত্যু হয়েছে অস্বাভাবিক এবং করুণভাবে। মীরজাফরদের বিশ্বাসঘাতকতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সতর্ক থাকবে হবে ব্যক্তি, সমাজ কিংবা রাষ্ট্রকেও। নবাবের বীরত্বের অধ্যায় প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম বহনমান থাকবে। নবাব সিরাজউদ্দৌলার সততা, দেশপ্রেম, আদর্শ, চেতনা, ভালোবাসা আজও বাংলার দেশপ্রেমী প্রতিটি হৃদয়কে অনুপ্রাণিত করে।

[ মহাসচিব, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি-বাংলাদেশ ন্যাপ ও আহ্বায়ক, জাতীয় কৃষক-শ্রমিক মুক্তি আন্দোলন]

Surfe.be - Banner advertising service




নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

এ জাতীয় আরো খবর..

<a href=”https://surfe.be/ext/446180″ target=”_blank”><img src=”https://static.surfe.be/images/banners/en/240x400_1.gif” alt=”Surfe.be – Banner advertising service”></a>

via Imgflip

Surfe.be - Banner advertising service

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি  © All rights reserved © 2011 Gnewsbd24
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com
themesbazargewsbd451