বৃহস্পতিবার, ০২ ফেব্রুয়ারী ২০২৩, ০৭:০৪ পূর্বাহ্ন

মার্চ মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৫১৩, আহত ৫৯৮ জন

Reporter Name
  • Update Time : সোমবার, ৫ এপ্রিল, ২০২১

গত মার্চ মাসে দেশে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ৪০৯টি। নিহত ৫১৩ জন এবং আহত ৫৯৮ জন। নিহতের মধ্যে নারী ৭৮, শিশু ৬৩। ১৩৮টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত ১৪৭ জন, যা মোট নিহতের ২৮.৬৫ শতাংশ। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার হার ৩৩.৭৪ শতাংশ।

দুর্ঘটনায় ১৩৬ জন পথচারী নিহত হয়েছে, যা মোট নিহতের ২৬.৫১ শতাংশ। যানবাহনের চালক ও সহকারী নিহত হয়েছেন ৮২ জন, অর্থাৎ ১৫.৯৮ শতাংশ।

এই সময়ে ২টি নৌ-দুর্ঘটনায় ২ জন নিহত এবং ৮ জন আহত হয়েছে। ১৫টি রেলপথ দুর্ঘটনায় ১৯ জন নিহত এবং ৬ জন আহত হয়েছে।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশন ৭টি জাতীয় দৈনিক, ৫টি অনলাইন নিউজ পোর্টাল এবং ইলেক্টনিক গণমাধ্যমের তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে।
দুর্ঘটনায় মোট নিহতের যানবাহনভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়- মোটরসাইকেল আরোহী ১৪৭ জন (২৮.৬৫%), বাস যাত্রী ৩০ জন (৫.৮৪%), ট্রাক-পিকআপ-ট্রাক্টর-ট্রলি যাত্রী ৫১ জন (৯.৯৪%), মাইক্রোবাস-প্রাইভেটকার যাত্রী ৫০ জন (৯.৭৪%), থ্রি-হুইলার যাত্রী (সিএনজি-ইজিবাইক-অটোরিকশা-অটোভ্যান-টেম্পু-মিশুক) ৮১ জন (১৫.৭৪%), নসিমন-ভটভটি-মাহিন্দ্র-লাটাহাম্বা ও বাই-সাইকেল আরোহী ১৮ জন (৩.৫০%) নিহত হয়েছে।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ বলছে, দুর্ঘটনাগুলোর মধ্যে ১৭২টি (৪২.০৫%) জাতীয় মহাসড়কে, ১১৬টি (২৮.৩৬%) আঞ্চলিক সড়কে, ৭৩টি (১৭.৮৪%) গ্রামীণ সড়কে, ৩৬টি (৮.৮০%) শহরের সড়কে এবং অন্যান্য স্থানে ১২টি (২.৯৩%) সংঘটিত হয়েছে।

দুর্ঘটনাসমূহের ৯১টি (২২.২৪%) মুখোমুখি সংঘর্ষ, ১৪২টি (৩৪.৭১%) নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে, ১৩৪টি (৩২.৭৬%) পথচারীকে চাপা/ধাক্কা দেয়া, ২৯টি (৭.০৯%) যানবাহনের পেছনে আঘাত করা এবং ১৩টি (৩.১৭%) অন্যান্য কারণে ঘটেছে।

দুর্ঘটনার জন্য দায়ী যানবাহন- ট্রাক-কাভার্ডভ্যান-পিকআপ ২৭.৫৪ শতাংশ, ট্রাক্টর-ট্রলি-লরি ৬.১৩ শতাংশ, মাইক্রোবাস-প্রাইভেটকার ৪.০৪ শতাংশ, যাত্রীবাহী বাস ১১.০৭ শতাংশ, মোটরসাইকেল ২১.৫৫ শতাংশ, থ্রি-হুইলার (ইজিবাইক-সিএনজি-অটোরিকশা-অটোভ্যান-লেগুনা-টেম্পু-মিশুক) ১৭.৫১ শতাংশ, নসিমন-ভটভটি-আলমসাধু-মাহিন্দ্র- বাই-সাইকেল-প্যাডেল রিকশা ৮.৯৮ শতাংশ এবং অন্যান্য (মাটিকাটা ট্রাক্টর-ড্রাম ট্রাক-লাটাহাম্বা-তেলবাহী লরি-পাওয়ারটিলার-কন্টেইনার-কোস্টার-ঠেসার) ৩.৫৯ শতাংশ।

দুর্ঘটনায় আক্রান্ত যানবাহনের সংখ্যা ৬৬৮টি। (ট্রাক ১২৬, বাস ৭৪, কাভার্ডভ্যান ২১, পিকআপ ৩৭, লরি ৫, ট্রলি ২০, ট্রাক্টর ১৬, তেলবাহী লরি ৩, কন্টেইনার ২, ড্রাম ট্রাক ৩, মাইক্রোবাস ১৫, প্রাইভেটকার ১৭, মোটরসাইকেল ১৪৪, ইজিবাইক-সিএনজি-অটোরিকশা-অটোভ্যান- লেগুনা-টেম্পু-মিশুক ১১৭, নসিমন-ভটভটি-আলমসাধু-মাহিন্দ্র-ঠেসার ৪৭, বাই-সাইকেল ৫, প্যাডেল রিকশা ৯, লাটাহাম্বা ৩ এবং পাওয়ারটিলার ৪ টি।

সময় বিশ্লেষণে দেখা যায়, দুর্ঘটনাসমূহ ঘটেছে ভোরে ৪.৬৪%, সকালে ৩৩%, দুপুরে ১৭.৬০%, বিকালে ২০.৫৩%, সন্ধ্যায় ৪.৮৮% এবং রাতে ১৯.৩১%।

দুর্ঘটনার বিভাগওয়ারী পরিসংখ্যান বলছে, ঢাকা বিভাগে দুর্ঘটনা ২৯.০৯%, প্রাণহানি ২৬.৫১%, রাজশাহী বিভাগে দুর্ঘটনা ১৬.৬২%, প্রাণহানি ১৮.১২%, চট্টগ্রাম বিভাগে দুর্ঘটনা ১৭.১১%, প্রাণহানি ১৯.৬৮%, খুলনা বিভাগে দুর্ঘটনা ১০.৫১%, প্রাণহানি ৯.৯৪%, বরিশাল বিভাগে দুর্ঘটনা ৫.১৩%, প্রাণহানি ৫.০৬%, সিলেট বিভাগে দুর্ঘটনা ৫.৬২%, প্রাণহানি ৬.৪৩%, রংপুর বিভাগে দুর্ঘটনা ৫.৫৭%, প্রাণহানি ৬.২৩% এবং ময়মনসিংহ বিভাগে দুর্ঘটনা ৮.৩১%, প্রাণহানি ৮% ঘটেছে।

ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ঘটেছে। ১১৯টি দুর্ঘটনায় নিহত ১৩৬ জন। সবচেয়ে কম বরিশাল বিভাগে। ২১টি দুর্ঘটনায় নিহত ২৬ জন। একক জেলা হিসেবে চট্টগ্রাম জেলায় সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ঘটেছে। ১৭টি দুর্ঘটনায় ৩৩ জন নিহত। সবচেয়ে কম বাগেরহাট জেলায়। ১টি দুর্ঘটনা ঘটলেও কেউ হতাহত হয়নি।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়, নিহতদের মধ্যে পুলিশ সদস্য ৬ জন, বিভিন্ন স্কুল-কলেজ-মাদরাসার শিক্ষক ১৩ জন, গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের প্রকৌশলী ১ জন, উপজেলা কার্যালয়ের অফিস সহকারী ১ জন, উপজেলা স্বাস্থ্য উপ-সহকারী ২ জন, আইনজীবী ৩ জন, যন্ত্রসংগীত শিল্পী ২ জন, স্থানীয় সাংবাদিক ৪ জন, সংবাদপত্র এজেন্ট ১ জন, ব্যাংক কর্মকর্তা ৪ জন, এনজিও কর্মকর্তা-কর্মচারী ১১ জন, ঔষধ ও বিভিন্ন পণ্যসামগ্রী বিক্রয় প্রতিনিধি ২৩ জন, স্থানীয় পর্যায়ের বিভিন্ন ব্যবসায়ী ৪৭ জন, যুক্তরাজ্য প্রবাসী ২ জন, পোশাক শ্রমিক ৭ জন, ইটভাটা শ্রমিক ৪ জন, কৃষি শ্রমিক ৫ জন, রাজমিস্ত্রি ১ জন, টোল আদায়কারী ১ জন, ফুটপাতের হকার ১ জন, মানসিক ও শারীরিক প্রতিবন্ধি ৪ জন, উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগ সভাপতি ১ জন, ইউপি চেয়ারম্যান ১ জনসহ স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ১১ জন এবং দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ৭২ জন শিক্ষার্থী নিহত হয়েছে।

সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণসমূহ:
১. ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন; ২. বেপরোয়া গতি; ৩. চালকদের অদক্ষতা ও শারীরিক-মানসিক অসুস্থতা; ৪. বেতন-কর্মঘন্টা নির্দিষ্ট না থাকা; ৫. মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহন চলাচল; ৬. তরুণ-যুবদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো; ৭. জনসাধারণের মধ্যে ট্রাফিক আইন না জানা ও না মানার প্রবণতা; ৮. দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা; ৯. বিআরটিএ’র সক্ষমতার ঘাটতি; ১০. গণপরিবহন খাতে চাঁদাবাজি।

সুপারিশসমূহ:
১. দক্ষ চালক তৈরির উদ্যোগ বৃদ্ধি করতে হবে; ২. চালকদের বেতন-কর্মঘন্টা নির্দিষ্ট করতে হবে; ৩. বিআরটিএ’র সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে; ৪. পরিবহন মালিক-শ্রমিক, যাত্রী ও পথচারীদের প্রতি ট্রাফিক আইনের বাধাহীন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে; ৫. মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহন বন্ধ করে এগুলোর জন্য আলাদা রাস্তা (সার্ভিস লেন) তৈরি করতে হবে; ৬. পর্যায়ক্রমে সকল মহাসড়কে রোড ডিভাইডার নির্মাণ করতে হবে; ৭. গণপরিবহনে চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হবে; ৮. রেল ও নৌ-পথ সংস্কার করে সড়ক পথের উপর চাপ কমাতে হবে; ৯. টেকসই পরিবহন কৌশল প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে; ১০. “সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮” বাধাহীনভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।
মন্তব্য: গত ফেব্রুয়ারি মাসে ৪০৬টি দুর্ঘটনায় ৫১৭ জন নিহত হয়েছিল। গড়ে প্রতিদিন নিহত হয়েছিল ১৮.৪৬ জন। মার্চ মাসে প্রতিদিন নিহত হয়েছে গড়ে ১৬.৫৪ জন। এই হিসেবে মার্চ মাসে প্রাণহানি কমেছে ১০.৪০ শতাংশ। উল্লেখ্য, প্রাণহানি কমার এই হার কোনো টেকসই উন্নতি সূচক নির্দেশ করছে না।

সাম্প্রতিক সময়ে যানবাহনের চাপায়-ধাক্কায় পথচারী নিহতের হার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার হারও উদ্বেগজনক পর্যায়ে। সড়কে নিরাপদে চলাচল বিষয়ে অজ্ঞতা, অবহেলা এবং ট্রাফিক আইনের প্রয়োগহীনতা এর প্রধান কারণ। মোটরসাইকেল ক্রয় এবং চালনার ক্ষেত্রে ট্রাফিক আইনের প্রয়োগ এবং নিয়মিত মনিটরিং নিশ্চিত করতে না পারলে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার চিত্র আরও ভয়াবহ হবে। এই আতঙ্কজনক প্রেক্ষাপটেও সরকার মোটরসাইকেলের নিবন্ধন ফিস কমানো এবং সিসি বা অশ^শক্তি সীমা উন্মুক্ত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে, যা মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা বৃদ্ধি করবে। বিষয়টি সরকারের ভেবে দেখা উচিত।

মার্চ মাসে রেল ক্রসিংয়ে ৩টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। দেশে ৮২% রেল ক্রসিং অরক্ষিত। এসব রেল ক্রসিংয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। দুর্ঘটনায় ১৮ থেকে ৬৫ বছর বয়সী কর্মক্ষম মানুষ নিহত হয়েছেন ৪২১ জন, অর্থাৎ ৮২.০৬ শতাংশ। চিত্রটি ভয়াবহ! সড়ক দুর্ঘটনায় অসংখ্য পরিবার তার একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তির নিহত বা পঙ্গুত্বের মধ্য দিয়ে পথে বসছে, হারিয়ে যাচ্ছে সামাজিক অর্থনীতির মূল স্রোত থেকে। ফলে দেশে আর্থ-সামাজিক সংকট বাড়ছে। পৃথিবীর অধিকাংশ দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ প্রদান করা হয়। বাংলাদেশে ক্ষতিপূরণ প্রদানের বিধান থাকলেও কোনো সময়ই এই বিধান কার্য়কর ছিল না, বর্তমানেও নেই।

সেজন্য কেউই ক্ষতিপূরণ পান না। অথচ অধিকাংশ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে সড়ক পরিবহন খাতে বিদ্যমান নৈরাজ্য ও অব্যবস্থাপনার কারণে, যার দায় রাষ্ট্রের। কিন্তু রাষ্ট্র কোনো প্রকার দায় নিচ্ছে না। বিষয়টি অমানবিক। সড়ক পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় সরকারের পক্ষ থেকে বার বার কমিটি গঠন ও সুপারিশমালা তৈরি করা হলেও আদতে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই।

কারণ পুরো খাতটি রাজনৈতিক চাঁদাবাজ সিন্ডিকেট দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। মূলত সড়ক পরিবহনে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করছে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছার উপর। সরকার চাইলেই সম্ভব। কিন্তু সরকার আন্তরিকভাবে চায় কি না এটাই বড় প্রশ্ন (?)।

 

Surfe.be - Banner advertising service

https://www.facebook.com/gnewsbd24

Leave a Reply

More News Of This Category
<script async src="https://pagead2.googlesyndication.com/pagead/js/adsbygoogle.js?client=ca-pub-3423136311593782"
     crossorigin="anonymous"></script>
© All rights reserved © 2011 Live Media
কারিগরি সহযোগিতায়: মোঃ শাহরিয়ার হোসাইন
freelancerzone