শুক্রবার, ০৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৩, ০৪:০৫ পূর্বাহ্ন

তিন মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় ৪০৯ জন পথচারী নিহত

জি-নিউজবিডি২৪ ডেস্ক :
  • Update Time : মঙ্গলবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২১

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত তিন মাসে সড়ক-মহাসড়কে ৩৯৮টি দুর্ঘটনায় ৪০৯ জন পথচারী নিহত হয়েছে। নিহত পথচারীর মধ্যে পুরুষ ২৪৬, নারী ৬৬ এবং শিশু ৯৭ জন।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশন ৭টি জাতীয় দৈনিক, ৫টি অনলাইন নিউজ পোর্টাল এবং ইলেক্টনিক গণমাধ্যমের তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে।

দুর্ঘটনায় পথচারী নিহতের ধরন:
গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাস্তায় হাঁটার সময় দুর্ঘটনা ঘটেছে ২১৩টি (৫৩.৫১ শতাংশ) এবং রাস্তা পারাপারের সময় ঘটেছে ১৮৫টি (৪৬.৪৮ শতাংশ)। দুর্ঘটনাসমূহের মধ্যে পথচারীকে যানবাহনের ধাক্কা দেয়ার ঘটনা ঘটেছে ১৭৯টি (৪৪.৯৭ শতাংশ), এতে নিহত হয়েছে ১৮৩ জন (৪৪.৭৪ শতাংশ)। পথচারীকে যানবাহনের চাপা দেয়ার ঘটনা ঘটেছে ২১৯টি (৫৫ শতাংশ), এতে নিহত হয়েছে ২২৫ জন (৫৫ শতাংশ)। কয়েকটি দুর্ঘটনায় একাধিক প্রাণহানি ঘটেছে।

দুর্ঘটনায় পথচারী নিহতের কারণ:
দুর্ঘটনার কারণ বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৬১.৮০ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে যানবাহনের বেপরোয়া গতির কারণে এবং ৩৮.১৯ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে পথচারীদের অসতর্কতার কারণে।

যানবাহন দ্বারা পথচারী নিহতের চিত্র:
যানবাহন দ্বারা পথচারী নিহতের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বাস ১৮.০৯%, ট্রাক ৩২.৫১%, কাভার্ডভ্যান-পিকআপ-ট্রাক্টর-ট্রলি-লরি ১৯.৮০%, মোটরসাইকেল ১০.৭৫%, প্রাইভেটকার-মাইক্রোবাস-জীপ ৩.১৭%, থ্রি-হুইলার (সিএনজি-ইজিবাইক-অটোরিকশা) ১০.০২%, নসিমন-আলমসাধু-অটোভ্যান-মাহিন্দ্র-টমটম-বোরাক ৪.৪০% এবং অন্যান্য যানবাহন দ্বারা (পাওয়াটিলার-ডাম্পার-ঠেসার) ১.২২% পথচারী নিহত হয়েছে।

নিহত পথচারীদের বয়স বিশ্লেষণ:
প্রাপ্ত তথ্যের আলোকে নিহত পথচারীদের বয়স বিশ্লেষণ বলছে, ৩-১০ বছর বয়সী নিহত হয়েছে ২৩.৪৬ শতাংশ, ১১-২৫ বছর বয়সী নিহত হয়েছে ১৯.২৩ শতাংশ, ২৬-৫০ বছর বয়সী নিহত হয়েছে ৩২.৩০ শতাংশ, ৫১-৭০ বছর বয়সী নিহত হয়েছে ২১.৯২ শতাংশ এবং ৭১-তদুর্ধ বছর বয়সী নিহত হয়েছে ৩.০৭ শতাংশ।

দুর্ঘটনা সংঘটিত সড়কের ধরণ:
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ বলছে, পথচারী নিহতের ঘটনা মহাসড়কে ঘটেছে ১২৩টি (৩০.৯০%), আঞ্চলিক সড়কে ঘটেছে ৯৫টি (২৩.৮৬%), গ্রামীণ সড়কে ঘটেছে ১১৯টি (২৯.৮৯%), শহরের সড়কে ঘটেছে ৫৭টি (১৪.৩২%) এবং অন্যান্য স্থানে ৪টি (১%) ঘটেছে।

পথচারী নিহতের জন্য দায়ী যানবাহন:
দুর্ঘটনায় পথচারী নিহতের জন্য বাস ১৭.৮৬%, ট্রাক ৩২.৫০%, কাভার্ডভ্যান-পিকআপ-ট্রাক্টর-ট্রলি-লরি ১৯.৬০%, মোটর সাইকেল ১০.৯১%, প্রাইভেটকার-মাইক্রোবাস-জীপ ৩.২২%, থ্রি-হুইলার (সিএনজি-ইজিবাইক-অটোরিকশা) ১০.১৭%, নসিমন-আলমসাধু-অটোভ্যান-মাহিন্দ্র-টমটম-বোরাক ৪.২১% এবং অন্যান্য (পাওয়াটিলার-ডাম্পার-ঠেসার) ১.২৪% দায়ী।

দায়ী যানবাহনসমূহ:
দুর্ঘটনায় পথচারী নিহতের ক্ষেত্রে দায়ী যানবাহনের সংখ্যা ৪০৩টি। (বাস-৭২, ট্রাক-১৩১, কাভার্ডভ্যান-১৭, পিকআপ-২৬, ট্রাক্টর-১৫, ট্রলি-১৩, লরি-৮, তেলবাহী লরি-২, মোটরসাইকেল-৪৪, প্রাইভেটকার-৪, মাইক্রোবাস-৮, জীপ-১, সিএনজি-৩, ইজিবাইক-৫, অটোরিকশা-৩৩, নসিমন-৬, আলমসাধু-৩, অটোভ্যান-২, মাহিন্দ্র-৪, টমটম-২, বোরাক-১, ঠেসার-১ এবং ডাম্পার-২টি)।

দুর্ঘটনার সময় বিশ্লেষণ:
দুর্ঘটনার পথচারী নিহতের সময় বিশ্লেষণে দেখা যায়, ভোরে ৩%, সকালে ২৮.৩৯%, দুপুরে ২০.১০%, বিকালে ২২.১১%, সন্ধ্যায় ১১.৫৫% এবং রাতে ১৪.৮২% দুর্ঘটনা ঘটেছে।

বিভাগওয়ারী পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ঢাকা বিভাগে ৩৩.৭২%, রাজশাহী বিভাগে ১৫.২৯%, চট্টগ্রাম বিভাগে ১৪.৯০%, খুলনা বিভাগে ৯.৮০%, বরিশাল বিভাগে ৬.২৭%, সিলেট বিভাগে ৪.৭০%, রংপুর বিভাগে ৬.৬৬% এবং ময়মনসিংহ বিভাগে ৮.৬২% পথচারী নিহত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ঢাকা বিভাগে এবং সবচেয়ে কম সিলেট বিভাগে। ঢাকা মহানগরে সবচেয়ে বেশি পথচারী নিহতের ঘটনা ঘটেছে।

পথচারী নিহতের কারণসমূহ:
১. চালকদের অদক্ষতা ও বেপরোয়া মনোভাব;
২. যানবাহনের অতিরিক্ত গতি;
৩. সড়কের সাইন, মার্কিং ও জেব্রা ক্রসিং চালক এবং পথচারীদের না মানার প্রবণতা;
৪. নগরীর যথাস্থানে সঠিকভাবে ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ না করা এবং ব্যবহার উপযোগী না থাকা;
৫. বিদ্যমান ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহারে পথচারীদের অনীহা;
৬. পথচারীদের বেখেয়ালী-অসতর্কভাবে রাস্তায় হাঁটা ও রাস্তা পারাপারের অভ্যাস;
৭. রাস্তায় হাঁটা ও পারাপারের সময় মোবাইল ফোনে কথা বলা, গান শোনা ও চ্যাটিং করা;
৮. অপ্রাপ্ত বয়স্ক, প্রশিক্ষণহীনদের মোটরসাইকেল ও স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহন চালানো;
৯. শিশু-কিশোরদের এলোমেলোভাবে রাস্তায় হাঁটা-চলা করা;
১১. সড়ক ঘেঁষে বসতবাড়ি নির্মাণ এবং সড়কের উপরে হাট-বাজার গড়ে উঠা;
১২. জনসাধারণের মধ্যে সড়কে নিরাপদ চলাচল বিষয়ে জ্ঞান না থাকা এবং অবহেলার মানসিকতা।

সুুপারিশসমূহ:
১. অদক্ষ চালক কর্তৃক যানবাহন চালনা বন্ধ করতে হবে;
২. গণপরিবহন চালকদের বেতন ও কর্মঘন্টা নিশ্চিত করতে হবে;
৩. স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহনের চালকদের প্রশিক্ষণ প্রদান এবং নিবন্ধনের আওতায় আনতে হবে;
৪. যানবাহন চালকদের নিয়মিত মোটিভেশনাল প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে;
৫. অতিরিক্ত গতিতে যানবাহন চালনা রোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে;
৬. যথাস্থানে ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ করে তা ব্যবহারে পথচারীদের উৎসাহিত ও বাধ্য করতে হবে;
৭. ফুটপাত ও ফুটওভার ব্রিজ হকারদের দখলমুক্ত রাখতে হবে;
৮. কিশোর-যুবকদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালনা বন্ধে প্রচারণাসহ কঠোর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে;
৯. সড়কে নিরাপদ চলাচল বিষয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মোটিভেশনাল ক্যাম্পেইন পরিচালনা করতে হবে;
১০. শহরে-গ্রামে লোকসঙ্গীত ও পথনাটকের মাধ্যমে সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে;
১১. ইলেক্টনিক গণমাধ্যমে মাঝে-মধ্যেই সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ক ডক্যুমেন্টারী/শর্টফিল্ম প্রদর্শন এবং জনস্বার্থে দিনে ৪/৫ বার সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতামূলক বার্তা প্রচারের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে;
১২. সড়ক ঘেঁষে গড়ে উঠা হাট-বাজার বন্ধ করতে হবে;
১৩. ট্রাফিক আইনের অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিধিসমূহ মানুষের মধ্যে প্রচার করতে হবে;
১৪. “সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮” বাধাহীনভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।

মন্তব্য:
দেশে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে। বাড়ছে নানা প্রকার অপরিকল্পিত যানবাহন। প্রয়োজনের তাগিদে মানুষের যাতায়াত বাড়লেও সড়কে নিরাপদ চলাচল বিষয়ে সচেতনতা তৈরি হচ্ছে না। সরকার সড়ক-সেতু নির্মাণে ব্যাপক অর্থ খরচ করছে, কিন্তু সড়ক ব্যবহারকারীদের মধ্যে সক্ষমতা বৃদ্ধি ও সচেতনতা সৃষ্টির জন্য অর্থ ব্যয় করছে না। ফলে কোনোভাবেই সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না।

ইদানিং সড়ক দুর্ঘটনায় পথচারী নিহতের হার চরমভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। গত তিন মাসে থ্রি-হুইলার এবং স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহনের চেয়ে দ্রুতগতির ভারী যানবাহন দ্বারা পথচারী বেশি নিহত হয়েছে। মোটরসাইকেলের ধাক্কায় পথচারী নিহতের ঘটনার অধিকাংশই ঘটেছে গ্রামীণ সড়কে। রাস্তা পারাপারে নারী, শিশু ও বৃদ্ধরা বেশি নিহত হয়েছে। বেশকিছু দুর্ঘটনা ঘটেছে সড়ক ঘেঁষা হাট-বাজারে এবং বসতবাড়ির সন্নিকটে। এই প্রতিবেদন গত তিন মাসের হলেও এটাই মূলত দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় পথচারী নিহতের সামগ্রিক প্রকৃত চিত্র। অতএব এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি।

Surfe.be - Banner advertising service

https://www.facebook.com/gnewsbd24

Leave a Reply

More News Of This Category
<script async src="https://pagead2.googlesyndication.com/pagead/js/adsbygoogle.js?client=ca-pub-3423136311593782"
     crossorigin="anonymous"></script>
© All rights reserved © 2011 Live Media
কারিগরি সহযোগিতায়: মোঃ শাহরিয়ার হোসাইন
freelancerzone