বুধবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৬:০০ অপরাহ্ন

গাংনী; গোর খনন আর লাশ দাফন করে ক্লান্ত গোর খোদকরা

মজনুর রহমান আকাশ, মেহেরপুর প্রতিনিধি :
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৩০ জুলাই, ২০২১
  • ৩১ বার পঠিত

মসজিদের মাইকের ঘোষণা অথবা অ্যাম্বুলেন্সের করুন সুর এখন আর ঘুম ভাঙ্গায় না গোর খোদকদের। এখন প্রতি রাত জেগে থাকতে হচ্ছে তাদের। একের পর এক গোর খনন আর লাশ দাফন করে বেশ ক্লান্ত। এদের মধ্যে কেউ প্রতিবেশি কিংবা একান্ত আপনজন। যত রাতই হোক কিংবা প্রতিকুল আবহাওয়াই হোক সব কিছুকে উপেক্ষা করে জীবনের মায়া ত্যাগ করে লাশ দাফন করতেই হবে। আপনজন নাহোক কিংবা করোনা আক্রান্ত হোক, সামাজিক দ্বায়বদ্ধতা যেন তাদেরকে তাড়িয়ে ফেরে। এমনি অভিজ্ঞতার কথা জানালেন গাংনীর গাড়াডোব ও জোরপুকুরিয়া গ্রামের গোর খোদকরা।

গাড়াডোব গ্রামের গোর খোদক ভাদু মিয়া, আবুল হাসেন ও নাজির হোসেন বলেন, প্রায় ২৫ বছর ধরে গোর খোদকের দায়িত্ব পালন করছি। এক মাসে ২১ টি গোর খনন করতে হয়েছে। এখন এ্যাম্বুলেন্স এর শব্দ শুনলেই বুকের মধ্যে আতকে ওঠে। মনে হয় ওই বুঝি এলো লাশের গাড়ি। তারা বলেন, একতে লাশের ওপর মহব্বত অন্যদিকে করোনা আতংক। তবুও পালন করছি সামাজিক এই অবৈতনিক দায়িত্ব। তবে ইহকালের রোজগার নয়, পরকালে সৃষ্টিকর্তা যেন ক্ষমা করেন। ধর্মীয় এই অনুভুতি নিয়েই দায়িত্ব পালন করছি। তিনি আরো জানান, এক জনের দাফন করে ফিরে আসতে না আসতেই আরেক জনের মৃত্যুর খবর! এতো মানুষের মৃত্যুর ঘটনা এটাই প্রথম দেখছেন গ্রামের মানুষ।

গাংনীর জোড়পুকুরিয়া গ্রামের গোর খোদক মসলেম জানান, প্রায় ২০ বছর যাবত গোর খনন করছেন। সাথে রয়েছে আরো তিনজন। এমনিতেই কেউ গোর খনন করতে চান না। গোর খননের অভিজ্ঞতা সবার থাকেনা। আবার গভীর রাতে গোরস্থানে সবাই যেতে চান না। তার ওপর আবার করোনা। অনেকেই ভয়ে লাশ দাফনে আসতে চাননা। কে কখন খবর দিবে তার অপেক্ষা না করে রাত জেগে থাকতে হচ্ছে। কেন না, করোনা কখন কাকে নিয়ে যাবে তা কেউ জানে না। সামাজিক দায়বদ্ধতার কারনে তারা গোর খননের দায়িত্ব কাধে তুলে নিয়েছেন। স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রীসহ অন্যান্য সুবিধা প্রদান করার ছাড়াও সকলকেই করোনা পরিক্ষা করে চিকিৎসা নেয়ার আহবান জানান।

সরেজমিনে গাংনীর গাড়াডোব ও জোড়পুকুরিয়া কবরস্থানে গিয়ে দেখা যায়, সারিবদ্ধ ৪৪ টি কবর । সকলেই করোনা ও করোনা উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন। গাড়াডোব ও জোড়পুকুরিয়া গ্রামের মানুষকে করোনা পরিক্ষা করলে কয়েকশত করোনা রোগী সনাক্ত হবে। সামাজিক হেয়, হোমকোয়ারেন্টিন হওয়া ছাড়াও নানা ওজুহাত দেখিয়ে কেউ করোনা পরিক্ষা করতে চাইছেন না। ফলে করোনা সংক্রমন বেড়েই চলেছে বলে মন্তব্য করেছেন স্থানীয়রা।

জোড়পুকুরিয়া গ্রামের গ্রাম্য চিকিৎসক লিটন হোসেন জানান, প্রতিদিন তার কাছে চিকিৎসার জন্য আসা লোকজনকে করোনা টেস্টের জন্য জোর তাগিদ দিয়েও কোন লাভ হচ্ছে না। জোড়পুকুরিয়া ও আশেপাশের গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়ির মানুষেরই করোনা উপসর্গ আছে। পরীক্ষা করলে শতকরা ৮০ জনের করোনা পজিটিভ হবে। এমনিতেই কেউ কোন কিছু স্বীকার করে না। যখন গুরুতর অবস্থা হয় কিংবা অক্সিজেন সংকটে পড়েন তখনই জানা যায়।

গাড়াডোব গ্রামের আবু সুফিয়ান জানান, তিনি চলতি মাসের ৭ তারিখ করোনায় আক্রান্ত হন। করোনা পজেটিভ হবার পর নিজ বাড়িতে চিকিৎসা নিয়েছেন তিনি। ২২ জুলাই অ্যান্টিজেন পরীক্ষায় নেগেটিভ আসার পর থেকে দোকান খুলেছেন। তিনি আরো জানান, যাদের বাড়ির লোকজন করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন অথবা আক্রান্ত তারাও কোন স্বাস্থ্য বিধি মানছেন না। চায়ের দোকানে আড্ডা দিচ্ছেন। নিয়মিত বাজার করছেন। তাদেরকে নিষেধ করেও কোন লাভ হচ্ছে না। করোনায় যেভাবে মানুষ মরছে তাতে কবরস্থান বাড়াতে হবে সেই সাথে গোর খোদকদের প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা নিতে হবে।

ধানখোলা ইউপি চেয়ারম্যান আখেরুজ্জামান বলেন, গাড়াডোব গ্রামে এক মাসে ২১ জন মারা গেছেন। স্থানীয় গোর খোদকরাই তাদের দাফন করেছেন। তবে তাদের কোনো স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রী প্রদান কিংবা আর্থিক সহায়তা করা হয়না। করোনা সময়কালীন সময়ে তারাও মারাতœক ঝুঁকিতে আছে। তাদেরকে করোনা পরিক্ষা করা দরকার। আমাদের পরিষদ থেকে তাদের জন্য কিছু করার সুযোগ নেই। তবে তারা যে দায়িত্ব পালন করছেন তাদের জন্য কিছু করতে পারলে ভাল লাগতো। তাদের এই মানবিক কর্মকান্ডে আমরা সকলেই কৃতজ্ঞ।

মেহেরপুর সিভিল সার্জন ডাঃ নাসির উদ্দীন বলেন, ঠা-া কাশি যাদের হচ্ছে তারা যদি সচেতন হয় তাহলে অনেক নিয়ন্ত্রণ করা যায়। তাদেরকে হাসপাতালে আসতে হবে, প্রয়োজনে টেস্ট করতে হবে। পরীক্ষায় যদি কেউ পজিটিভ হন তাহলে তার সু চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করা সম্ভব। কিন্তু গোপন করলে তিনি যেমনি শারীরিকভাবে ক্ষতির শিকার হচ্ছেন তেমনি তার মাধ্যমে অন্য মানুষের শরীরেও ছড়িয়ে পড়ছে। তাই ভয় ভীতি উপেক্ষা করে পরীক্ষা ও চিকিৎসা নেওয়ার আহবান জানালেন তিনি।

Surfe.be - Banner advertising service




নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..

<a href=”https://surfe.be/ext/446180″ target=”_blank”><img src=”https://static.surfe.be/images/banners/en/240x400_1.gif” alt=”Surfe.be – Banner advertising service”></a>

via Imgflip

Surfe.be - Banner advertising service

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি  © All rights reserved © 2011 Gnewsbd24
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com
themesbazargewsbd451