সোমবার, ২৫ অক্টোবর ২০২১, ০১:৪৬ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
বর্তমান সরকারের পদত্যাগ করা উচিত – মির্জা ফখরুল ময়মনসিংহে মাদক মামলায় যুবকের যাবজ্জীবন কারাদন্ড সাম্প্রদায়িক হামলার প্রতিবাদে জয়পুরহাটে চিকিৎসকদের মানববন্ধন বাগেরহাটে শেখ হেলাল উদ্দিন ফুটবল টুর্নামেন্ট শেখ রাসেল ক্রীড়া চক্র চ্যাম্পিয়ন বালিয়াকান্দি ও কালুখালি ১৪ ইউপি থেকে আওয়ামীলীগের মনোনীত প্রার্থী যারা সুনামগঞ্জে ধর্ম নিয়ে কুটক্তি,বিক্ষোভ: ডিজিটাল মামলায় ৪ যুবক গ্রেফতার জয়পুরহাটে আন্তর্জাতিক জলবায়ু ধর্মঘট পালিত গণতন্ত্রের জন্য সত্যতথ্য গোপন করবেন না, ব্যবস্থা নেওয়া হবে – তথ্য কমিশনার ময়মনসিংহে কোতোয়ালীর অভিযানে ৯ মাদক ব্যবসায়ীসহ গ্রেফতার ২০ বালিয়াকান্দিতে ইউপি নির্বাচনে নৌকা প্রতীক পেলেন যারা

আজ ১৫ আগস্ট : জাতির পিতাকে হারানোর দিন

ড. আসাদুজ্জামান খান, সিনিয়র সাংবাদিক ঃ
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ১৫ আগস্ট, ২০২১
  • ৯৬ বার পঠিত

॥ ড. আসাদুজ্জামান খান ॥
আজ ১৫ আগস্ট। জাতীয় শোক দিবস। আজ কান্নার দিন। আজ গোটাদিনভর বাঙালি জাতি কান্নায় বুক ভাসাবে। কারণ, পঁচাত্তরের এইদিনে আমরা হারিয়েছি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। বাংলাদেশের ইতিহাসে পনেরই আগস্ট এক অভিশপ্ত রাত। এ রাতে একদল বিপথগামী সেনা সদস্যের হাতে নির্মমভাবে সপরিবারে নিহত হন জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বঙ্গবন্ধু।

আজ সারাদিন জাতি নানা আয়োজনে স্মরণ করবে সেই মহান নেতাকে যার জন্ম না হলে বাংলাদেশ নামক এই স্বাধীন ভূখন্ডের জন্ম হতো না। দীর্ঘ শোষণ, নিপীড়ন থেকে মুক্ত হতো না বাঙালি জাতি। যার জন্ম না হলে আমরা মায়ের ভাষা হারিয়ে পরিণত হতাম এক শরণার্থী জাতিতে। নিজ ভূমে আমরা হয়ে থাকতাম পরবাসী। সেই বীর বাঙালি, সেই মহানায়ককে হারিয়ে ফেলার দিন আজ।

কি ঘটেছিল সেদিন?

১৫ আগস্ট রাতে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কের বাড়িতে ডিউটিরত ছিলেন বঙ্গবন্ধুর রেসিডেন্ট পিএ আ ফ ম মোহিতুল ইসলাম। বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার এজাহারে মোহিতুল উল্লেখ করেছেন-“১৫ আগস্ট রাত ১টার দিকে আমি বিছানায় যাই। তারপর কখন যে ঘুমিয়ে পড়লাম তা খেয়াল নেই। হঠাৎ টেলিফোন মিস্ত্রি আমাকে উঠিয়ে (জাগিয়ে তুলে) বলেন, প্রেসিডেন্ট সাহেব আপনাকে ডাকছেন। তখন সময় ভোর সাড়ে চারটা কী পাঁচটা।

চারদিকে আকাশ ফর্সা হয়ে গেছে। বঙ্গবন্ধু ফোনে আমাকে বললেন, সেরনিয়াতের বাসায় দুষ্কৃতকারী আক্রমণ করেছে। আমি জলদি পুলিশ কন্ট্রোল রুমে ফোন করলাম। অনেক চেষ্টার পরও পুলিশ কন্ট্রোল রুমে লাইন পাচ্ছিলাম না। তারপর গণভবন এক্সচেঞ্জে লাইন লাগানোর চেষ্টা করলাম। এরপর বঙ্গবন্ধু ওপর থেকে নীচে নেমে এসে আমার কাছে জানতে চান পুলিশ কন্ট্রোল রুম থেকে কেন কেউ ফোন ধরছে না।

এমন সময় আমি ফোন ধরে হ্যালো হ্যালো বলে চিৎকার করছিলাম। তখন বঙ্গবন্ধু আমার হাত থেকে রিসিভার নিয়ে বললেন, আমি প্রেসিডেন্ট বলছি। এমন সময় দক্ষিণ দিকের জানালা দিয়ে একঝাক গুলি এসে ওই কক্ষের দেয়ালে লাগল। তখন অন্য ফোনে চিফ সিকিউরিটি মহিউদ্দিন কথা বলার চেষ্টা করছিলেন। গুলির তা-বে কাঁচের আঘাতে আমার ডান হাত দিয়ে রক্ত ঝরতে থাকে। এ সময় জানালা দিয়ে অনর্গল গুলি আসা শুরু হলে বঙ্গবন্ধু শুয়ে পড়েন। আমিও শুয়ে পড়ি।

কিছুক্ষণ পর সাময়িকভাবে গুলিবর্ষণ বন্ধ হলে বঙ্গবন্ধু উঠে দাঁড়ালেন। আমিও উঠে দাঁড়ালাম। ওপর থেকে কাজের ছেলে সেলিম ওরফে আবদুল বঙ্গবন্ধুর পাঞ্জাবী ও চশমা নিয়ে এলো। পাঞ্জাবী ও চশমা পরে বঙ্গবন্ধু বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন। তিনি (বঙ্গবন্ধু) বললেন আর্মি সেন্ট্রি, পুলিশ সেন্ট্রি এত গুলি চলছে তোমরা কি কর? এ সময় শেখ কামাল বলল আর্মি ও পুলিশ ভাই আপনারা আমার সঙ্গে আসুন। কালা পোষাক পরা একদল লোক এসে শেখ কামালের সামনে দাঁড়ালো।

আমি (মহিতুল) ও ডিএসপি নূরুল ইসলাম খান শেখ কামালের পিছনে দাঁড়িয়েছিলাম। নূরুল ইসলাম পেছন দিক থেকে টান দিয়ে আমাকে তার অফিস কক্ষে নিয়ে গেল। আমি ওখান থেকে উঁকি দিয়ে বাইরে দেখতে চেষ্টা করলাম। কিছুক্ষণের মধ্যে আমি গুলির শব্দ শুনলাম। এ সময় শেখ কামাল গুলি খেয়ে আমার পায়ের কাছে এসে পড়লেন। কামাল ভাই চিৎকার করে বললেন, আমি শেখ মুজিবের ছেলে শেখ কামাল, ভাই ওদেরকে বলেন।”

মোহিতুল ইসলাম এজাহারের বর্ণনায় আরো বলেন, “আক্রমণকারীদের মধ্যে কালো পোষাকধারী ও খাকি পোষাকধারী ছিল। এ সময় আবার আমরা গুলির শব্দ শোনার পর দেখি ডিএসপি নূরুল ইসলাম খানের পায়ে গুলি লেগেছে। তখন আমি বুঝতে পারলাম আক্রমণকারীরা আর্মির লোক।

হত্যাকান্ডের জন্যই তারা এসেছে। নূরুল ইসলাম যখন আমাদেরকে রুম থেকে বের করে নিয়ে যাবার চেষ্টা করছিলেন তখন মেজর বজলুল হুদা এসে আমার চুল টেনে ধরলো। বজলুল হুদা আমাদেরকে নিচে নিয়ে গিয়ে লাইনে দাঁড় করালো। কিছুক্ষণ পর নিচে থেকে আমরা বঙ্গবন্ধুর উচ্চকণ্ঠ শুনলাম। বিকট শব্দে গুলি চলার শব্দ শুনতে পেলাম আমরা। শুনতে পেলাম মেয়েদের আর্তচিৎকার, আহাজারি।

এরই মধ্যে শেখ রাসেল ও কাজের মেয়ে রুমাকে নিচে নিয়ে আসা হয়। রাসেল আমাকে জড়িয়ে ধরে বলে, আমাকে মারবেনাতো। আমি বললাম, না তোমাকে কিছু বলবেনা। আমার ধারণা ছিল অতটুকু বাচ্চাকে তারা কিছু বলবে না। কিছুক্ষণ পর রাসেলকে তার মায়ের কাছে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে রুমের মধ্যে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এরপর মেজর বজলুল হুদা বঙ্গবন্ধুর বাসভবনের গেটে দাঁড়িয়ে থাকা মেজর ফারুককে বলে, অল আর ফিনিশড।”

বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর লন্ডনের ‘দ্য স্টেটম্যান’ পত্রিকার সম্পাদকীয় কলামে লেখা হয়েছিল, ‘এরপর আর বাঙালিদের বিশ্বাস করা যায় না।’ বঙ্গবন্ধুর দুর্ভাগ্য, তিনি জন্মেছিলেন এই দেশে। ঘাতকদের অস্ত্রাঘাতে রক্তাক্ত হয়েছে শুধু বঙ্গবন্ধু নন, গোটা বাংলাদেশও।

বঙ্গবন্ধু হত্যার অভিঘাত পড়েছিল সারা বিশ্বের ওপর। পৃথিবীর শান্তিকামী মানুষ শোকে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ কন্যা আজকের প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা তখন ছিলেন দেশের বাইরে। পরে দেশে ফিরে তিনি লিখেছিলেন- ‘ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যাকান্ড’ নামে একটি নিবন্ধ। সেখান থেকে উদ্ধৃতি-
“আল্লাহু আকবর……
…………….হা ইয়া আলাছ ছালা
হা ইয়া আলাল ফালা
…………………… নামাজের দিকে এসো
কল্যাণের দিকে এসো

মসজিদ থেকে আযানের ধ্বনি ভেসে আসছে প্রতিটি মুসলমানকে আহ্বান জানাচ্ছে- সে আহ্বান উপেক্ষা করে ঘাতকের দল এগিয়ে এলো ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যাকান্ড ঘটাবার জন্য।

গর্জে উঠলো ওদের হাতের অস্ত্র। ঘাতকের দল হত্যা করল স্বাধীনতার প্রাণ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। এই নরপিশাচরা হত্যা করল আমার মাতা বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুননেছা মুজিবকে, হত্যা করল মুক্তিযোদ্ধা ছাত্রনেতা শেখ কামালকে, শেখ জামালকে, তাদের নব পরিণীতা বধূ সুলতানা কামাল ও রোজী জামালকে। যাদের হাতের মেহেদীর রং বুকের তাজা রক্তে মিশে একাকার হয়ে গেল।

খুনিরা হত্যা করল বঙ্গবন্ধুর একমাত্র ভ্রাতা শেখ আবু নাসেরকে।

সামরিক বাহিনীর ব্রিগেডিয়ার জামিলকে, যিনি রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তা দানের জন্য ছুটে এসেছিলেন। হত্যা করল কর্তব্যরত পুলিশ অফিসার ও কর্মকর্তাদের।

আর সবশেষে হত্যা করল শেখ রাসেলকে যার বয়স মাত্র দশ বছর। বার বার রাসেল কাঁদছিল‘ ‘মায়ের কাছে যাব’ বলে। তাকে বাবা ও ভাইয়ের লাশের পাশ কাটিয়ে মায়ের লাশের পাশে এনে নির্মমভাবে হত্যা করল। ওদের ভাষায় রাসেলকে মার্সি মার্ডার (দয়া করে হত্যা) করেছে-
ঐ ঘৃণ্য খুনিরা যে এখানেই হত্যাকান্ড শেষ করেছে তা নয়, একই সাথে একই সময়ে হত্যা করেছে যুবনেতা শেখ ফজলুল হক মণিকে ও তার অন্তঃসত্ত্বা

স্ত্রী আরজু মণিকে – হত্যা করেছে কৃষক নেতা আবদুর রব সেরনিয়াবতকে, তার তের বছরের কন্যা বেবীকে। রাসেলের খেলার সাথী তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র ১০ বছরের আরিফকে।

জেষ্ঠ্য পুত্র আবুল হাসনাত আব্দুল্লাহর জ্যেষ্ঠ সন্তান চার বছরের সুকান্তকে। তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র সাংবাদিক শহীদ সেরনিয়াবত ও নান্টুসহ পরিচারিকা ও আশ্রিত জনকে।

আবারও একবার বাংলার মাটিতে রচিত হল বেঈমানীর ইতিহাস।”

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ছিলেন বাঙালি জাতি ও বাংলাদেশের প্রতি সম্পূর্ণ আত্মোৎসর্গকারী। তার মন ছিল উদার আকাশের মত নির্মল। জেলায় জেলায় গ্রামে গঞ্জে ঘুরে বেড়ানো, সভা-সমিতিতে বক্তৃতা দিতেই তিনি আনন্দ পেতেন। চার পাশের মানুষকে জানাই ছিল তার আকাক্সক্ষা। তার সমসাময়িক কালে পৃথিবীব কোন নেতাই তার মত করে কাব্যিক ভাষণ দিতে পারতেন না। বঙ্গবন্ধু প্রতি মিনিটে দু’শ থেকে আড়াই’শ শব্দ উচ্চারণ করতে পারদর্শী ছিলেন।

বহু শতাব্দী পূর্বে, ঘনিষ্ঠ সহচর ব্রুটাসের শাণিত তরবারির আঘাতে রক্তাক্ত জুলিয়াস সিজার আর্তনাদ করে উঠেছিলেন- ব্রুটাস তুমিও! তেমনি বঙ্গবন্ধুর প্রশস্ত বক্ষ যখন ঝাঝরা করে দিচ্ছিল ঘাতকের বুলেট, তখন কি তিনি বুঝতে পেরেছিলেন ঘাতকদের পশ্চাতে সক্রিয় কিছু নাটের গুরুকে? আমরা কিন্তু চিনেছি তাদের ও তাদের বংশধরদের …।
লেখক ঃ ড. আসাদুজ্জামান খান, সাহিত্যিক ও সিনিয়র সাংবাদিক।

 

Surfe.be - Banner advertising service




নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..

<a href=”https://surfe.be/ext/446180″ target=”_blank”><img src=”https://static.surfe.be/images/banners/en/240x400_1.gif” alt=”Surfe.be – Banner advertising service”></a>

via Imgflip

Surfe.be - Banner advertising service

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি  © All rights reserved © 2011 Gnewsbd24
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com
themesbazargewsbd451