শনিবার, ০১ অক্টোবর ২০২২, ০৭:৫৩ অপরাহ্ন

শোকের মাস আগস্ট-১৩ ঃ আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন : বঙ্গবন্ধু

ড. আসাদুজ্জামান খান ঃ
  • Update Time : শনিবার, ১৩ আগস্ট, ২০২২

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হারানোর মাস আগস্ট। যার আত্মত্যাগের বিনিময়ে বাঙালি পেয়েছে তার কাক্সিক্ষত স্বদেশ। আপন ঠিকানা। জাতির জন্য, দেশের জন্য তার অবদান আকাশচুম্বি। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের পর থেকে দেশ চলছিল বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে। ২৩ মার্চ ঢাকার সর্বত্র বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলিত হয়। ২৪ মার্চ সকাল থেকেই বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে ঢাকার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বহু মিছিল আসতে থাকে।

বঙ্গবন্ধু ওইদিন সমবেত জনতার উদ্দেশে বলেন- ‘আমার মাথা কেনার শক্তি কারো নেই। বাংলার মানুষের সাথে-শহীদের রক্তের সাথে- আমি বেইমানী করতে পারব না। আমি কঠোরতর সংগ্রামের নির্দেশ দেয়ার জন্য বেঁচে থাকব কিনা জানি না। দাবী আদায়ের জন্য আপনারা সংগ্রাম চালিয়ে যাবেন।’ ২৪ মার্চ দিন পেরিয়ে রাত নামে বাংলার বুকে আর শুরু হয় পৃথিবীর ইতিহাসে জঘন্যতম গণহত্যার।

ডেটলাইন- ২৫ মার্চ ১৯৭১- দৈনিক বাংলায় প্রকাশিত প্রতিবেদন- ‘রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে খান খান করে গর্জে উঠল মেশিনগান। একটি নয়। দুটি নয়। অসংখ্য। দেখতে দেখতে ঢাকার আকাশ লালে লাল হয়ে উঠল আগুনের লেলিহান শিখায়। আগুন জ্বলছে রাজারবাগে, আগুন জ্বলছে পীলখানায়, আগুন জ্বলছে বস্তিতে বস্তিতে। হাজার হাজার নারী পুরুষ শিশুর মর্মভেদী আর্ত চিৎকারে ভরে উঠল ঢাকার আকাশ-বাতাশ। শুধু মেশিনগান নয়- আরো কত স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের গোলাগুলির একটানা শব্দে বিষাক্ত হয়ে উঠল রাজধানীর রাত।

একাত্তরের ২৫ শে মার্চের রাত। বাঙালি জাতির জীবনে সবচেয়ে বিভীষিকাময় রাত। দানবিক নৃশংসতায় এই রাতে বর্বর পাকিস্তানী সৈন্যরা ঝাঁপিয়ে পড়ে বাঙালিদের উপর। অথচ বাঙালিরা আশা করেছিল, এইদিন কিছু একটা সমঝোতা হবেই। দেশী-বিদেশী শত শত সাংবাদিকের ভিড়ে ভরে ছিল বঙ্গবন্ধুর বাসভবন। এরই মধ্যে ইয়াহিয়ার সাথে বৈঠক সেরে সাংবাদিক সম্মেলন করলেন ভুট্টো। বল্লেন, পরিস্থিতি অত্যান্ত আশঙ্কাজনক। সাংবাদিক সম্মেলন শেষে সাংবাদিকরা দৌড়ে এলেন বঙ্গবন্ধুর কাছে। তাঁকে জানালেন ভুট্টোর বক্তব্য।

সব শুনে বঙ্গবন্ধুর সদা প্রফুল্ল চেহারায় ফুটে উঠল গাম্ভীর্য। আওয়ামী লীগ নেতাদের সাথে আলোচনার জন্য তিনি গিয়ে ঢুকলেন পাশের ঘরে। বাইরের আঙ্গিনায় সাংবাদিকদের ভিড় ক্রমেই বাড়ছিল, সবার মনে উত্তেজনা- কি হবে? এর আগেই সবাই জেনেছেন- মুজিব- ইয়াহিয়া আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে। এরই মধ্যে খবর এলো চিড়িয়া ভেগেছে। কি ব্যাপার? এক সাংবাদিক জানালেন- ইয়াহিয়া এইমাত্র সাদা পোষাকে প্রেসিডেন্ট ভবন থেকে বেরিয়ে বিমানবন্দরের দিকে গেল। কিছু সময় পরে ঢাকা বিমানবন্দর থেকে একটি বোয়িং উড়ল। বঙ্গবন্ধুর বাড়ীর উপর দিয়েই উড়ে সেটা মিলিয়ে গেল পশ্চিম আকাশে।…

রাত তখন আটটার কিছু বেশী। বঙ্গবন্ধু বাইরের ঘরে বসে আলোচনায় ব্যস্ত। কোন জরুরী খবর নিয়ে ছুটে এলেন কর্নেল ওসমানী। বঙ্গবন্ধুর সাথে কি আলোচনা করলেন। সারা মুখ তাঁর থমথমে হয়ে উঠল। ইতোমধ্যে বঙ্গবন্ধুর বাড়ী ফাঁকা হতে শুরু করেছে। সাংবাদিকরাও যে যার কাজে ছুটে গেছেন। রাত তখন নয়টার কিছু উপরে। হাইকোর্টের মোড় এবং আরো কয়েকটি স্থানে বিক্ষিপ্ত ভাবে কিছু গোলাগুলির শব্দ শোনা গেল।

ঘন ঘন টেলিফোন আসতে লাগল সংবাদপত্র অফিস গুলিতে। সবারই একই প্রশ্ন, সেনাবাহিনী নাকি বেরিয়ে পড়েছে। পাড়ায় পাড়ায় তখন শুরু হয়েছে রাস্তায় ব্যারিকেড সৃষ্টির পালা। সর্বত্র এক আতঙ্কিত জনরব- সেনাবাহিনী বেরিয়ে পড়েছে। রাত এগারটার দিকে টেলিফোন বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। সব যোগাযোগ বিছিন্ন।

রাত তখন বারটা বাজেনি। হঠাৎ রাতের নিস্তব্ধতা খান খান করে দিয়ে গর্জে উঠল মেশিনগান। আগুনে আগুনে লাল হয়ে গেল সারা আকাশ। চারদিক আলোকিত করে ছুটলো হানাদারদের রঙ- বেরঙের ম্যাগনেশিয়াম ফ্লাশ। ঘরে ঘরে উঠল হাহাকার। রাস্তায় রাস্তায় জমে উঠল লাশের স্তূপ।

কিন্তু এরই মধ্যেও গড়ে উঠল প্রতিরোধ। হানাদারদের প্রতিরোধ করা হলো রাজারবাগে, পিলখানায়। ফলে রাজারবাগ পুলিশ ব্যারাকে জ্বলে উঠল আগুন। আগুন জ্বলল বস্তিতে বস্তিতে। রাতেই ওরা হানা দিল বঙ্গবন্ধুর বাড়ীতে। গোলার আঘাতে ক্ষতিসাধন করল বাড়ীর। গ্রেফতার করল বঙ্গবন্ধুকে।

২৫ মার্চ রাত একটার পর বঙ্গবন্ধুকে তার বাসা থেকে গ্রেফতার করা হয়। ইচ্ছা করলে তিনি পালিয়ে যেতে পারতেন। কিন্তু পারলেন না। দেশবাসীকে বন্দুকের নলের মুখে রেখে পালিয়ে যেতে বিবেক বাঁধা হওয় দাঁড়াল। ভাবলেন, এতদিনতো তাকে মেরে ফেলার পরিকল্পনাই করেছিল পাকিস্তানিরা। এবার তাকে হাতের কাছে পেয়ে যদি তাকে হত্যা করার বিনিময়ে দেশবাসী রেহাই পায়, তাহলে সে মৃত্যুই তার কাম্য।

তবে গ্রেফতারের আগে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা সংগ্রামের ডাক দিয়ে বাংলার মানুষের কাছে একটি বার্তা পাঠান টিএন্ডটির মাধ্যমে। ‘দিজ ইজ মে বি মাই লাস্ট ম্যাসেজ। ফ্রম টুডে, বাংলাদেশ ইজ ইনডিপেন্টডেন্ট, আই কল আপন দ্য পিপলস অব বাংলাদেশ হটইভার ইউ মাইট বি এন্ড উইথ হট ইভার ইউ হ্যাভ টু রিসিস্ট দ্য আর্মি অব অকুপেশন টু দ্য লাস্ট, ইউ ফাইট মাস্ট গো অন আনটিল দ্য লাস্ট সোলজার অফ দ্য পাকিস্তান অকুপেশন আর্মি ইজ ড্রাইভেন আউট অব দ্য সোল অব বাংলাদেশ, ফাইনাল ভিক্টরি ইজ আওয়ার।
বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে প্রথমে ঢাকা সেনানিবাস ও পরে পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়। তার ৭ মার্চের ভাষণের আলোকে শুরু হয়ে যায় বাঙালির মহান মুক্তিযুদ্ধ। বাংলার আকাশে বাতাশে ধ্বনিত হয়ে ওঠে এক অবিনাশী গান-
শোন একটি মুজিবরের থেকে লক্ষ মুজিবরের কণ্ঠ স্বরের ধ্বনি
প্রতিধ্বনি আকাশে বাতাশে ওঠে রণি
বাংলাদেশ আমার বাংলাদেশ।
লেখক ঃ – ড. আসাদুজ্জামান খান।

Surfe.be - Banner advertising service

https://www.facebook.com/gnewsbd24

Leave a Reply

More News Of This Category
<script async src="https://pagead2.googlesyndication.com/pagead/js/adsbygoogle.js?client=ca-pub-3423136311593782"
     crossorigin="anonymous"></script>
© All rights reserved © 2011 Live Media
কারিগরি সহযোগিতায়: মোঃ শাহরিয়ার হোসাইন
freelancerzone