মঙ্গলবার, ২৯ নভেম্বর ২০২২, ০৪:৩০ পূর্বাহ্ন

রামুতে সহিংস ঘটনার ১০ বছরেও  মামলার নিষ্পত্তি হয়নি

মোঃআমান উল্লাহ, কক্সবাজার।
  • Update Time : শুক্রবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২২

কক্সবাজারের রামুতে দেশব্যাপী আলোচিত সহিংসতার গতকাল ২৯ সেপ্টেম্বর১০ বছর পূর্ণ হয়েছে।

২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর পবিত্র কোরআন অবমাননা করে ফেসবুকে ছবি পোস্ট করার অভিযোগ তুলে রামুর ১২টি ৪৷  আগুন দেয় দুষ্কৃতকারীরা ৷ হামলা করা হয় বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের বাড়িঘরও৷ এ ঘটনায় ১৯টি মামলার কোনটিরই এখনও  মীমাংসা হয়নি৷ পুলিশ মামলার অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেয়ার দশ বছরেও একটি মামলাও নিষ্পত্তি হয়নি। স্বাক্ষীর অভাবে মামলার বিচারপ্রক্রিয়া প্রাথমিক পর্যায়ে থমকে আছে।জানা যায়,  রামুর হাইটুপী গ্রামের সুদত্ত বড়ুয়ার ছেলে দলিল লেখকের সহকারী উত্তম কুমার বড়ুয়া নামের ফেসবুকে পবিত্র কুরআন শরীফ অবমাননাকর ছবি সংযুক্ত করার খবর প্রকাশিত হওয়ার পর ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে রামুর বৌদ্ধ বিহার ও বৌদ্ধ পল্লীতে আগুন লাগিয়ে দেয় উত্তেজিত জনতা। দুষ্কৃতকারীদের তান্ডবলীলা, অগ্নি সংযোগে রামুর ১২টি বৌদ্ধ মন্দির ও ৩০ টি ঘর পুড়িয়ে দেয়। পরে তা ছড়িয়ে পড়ে টেকনাফ, উখিয়া ও পটিয়াতে।এতে কয়েক শত বছরের প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন পুড়ে যায়। ঘটনার পরপরই পোড়া মন্দিরে তৈরী হয়েছে নান্দনিক স্থাপনা।২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর এসব হামলায়  ক্ষমতাসীন দলসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে হামলায় অংশ নেয়ার অভিযোগ ওঠে৷ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার মাথা গোঁজার ঠাই পেয়েছিল৷ পরবর্তীতে পুড়ে যাওয়া বৌদ্ধ বিহার এবং বসতবাড়ি নির্মাণ করে দিয়েছিল সরকার, আশ্বাস দেয়া হয়েছিল দ্রুত বিচারের।দশ বছরে বৌদ্ধদের মাঝে ফিরেছে সম্প্রীতি। দৃষ্টিনন্দন স্থাপনাশৈলীতে পূণ্যার্থীদের পাশাপাশি বেড়েছে পর্যটক আকর্ষণ। ক্ষতিগ্রস্থরা পেয়েছেন নতুন ঘর।

এখনও বিভিন্ন বিহারগুলোতে নিরাপত্তায় সতর্ক রয়েছে পুলিশ বাহিনী। স্থানীয় প্রশাসন ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা সার্বক্ষণিক নজরদারী রেখেছে সকল বৌদ্ধ বিহারে।বর্তমানে পুজাপার্বন, ধর্মীয় উৎসবে অন্যধর্মালম্বীর সরব উপস্থিতে মুখরিত হয় এখন বিহার প্রাঙ্গন। সম্প্রীতিতে ফিরতে পেরে খুশি বৌদ্ধরা। তবে বিচারপ্রক্রিয়ার অচলাবস্থা নিয়ে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মাঝে রয়েছে এখনও অসন্তোষ। অপরাধীরা আইনের আওতায় না আসায় তাদের শংকা কাটছেনা।রামুতে বুদ্ধমুর্তি, বৌদ্ধ বিহার ও বৌদ্ধ বসতিতে ভাংচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগসহ উগ্র সাম্প্রদায়িক হামলার সেই বিভীষিকাময় দিনকে স্মরণে রামু কেন্দ্রীয় বৌদ্ধ যুব পরিষদ দিনব্যাপী কর্মসূচী পালন করছে।রামুতে লাল চিং বিহারে প্রথম অগ্নিসংযোগ করে দূর্বৃত্তরা। আজ ২৯ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার ‘লাল চিং ও মৈত্রী বিহার’ প্রাঙ্গণের এ স্মরণ অনুষ্ঠানে প্রধান ধর্মদেশক হিসেবে উপস্থিত থাকবেন, দমদমা নবাবপুর ধর্মকীর্তি বৌদ্ধ বিহারের অধ্যক্ষ ড.ধর্মকীর্তি মহাথের। রামু পানের ছড়া বৌদ্ধ বিহারের অধ্যক্ষ সুচারিতা মহাথের এ অনুষ্ঠানের সভাপতি করবেন।

ভোরে বুদ্ধপূজা, সকালে জাতীয় ও ধর্মীয় পতাকা উত্তোলন, অষ্ট পরিষ্কার দানসহ মহাসংঘদান, দুপুরে শান্তিপুর্ণ মানববন্ধন, অতিথি ভোজন, বিকালে হাজার প্রদীপ প্রজ্জ্বলন ও সন্ধ্যায় বিশ্ব দশান্তি কামনায় সমবেত প্রার্থনার মাধ্যমে রামু সহিংসতার দশ বছর স্মরণানুষ্ঠানে মানবতা ও শান্তি কামনা করা হবে বলে জানান, রামু কেন্দ্রীয় বৌদ্ধ যুব পরিষদের সাধারন সম্পাদক বিপুল বড়ুয়া আব্বু। অনুষ্ঠানে বৌদ্ধ ভিক্ষুসহ স্থানীয় বৌদ্ধ গ্রামবাসীরা অংশ নিবেন বলে জানান সদস্য সচিব বিপ্লব বড়ুয়া।রামুর ওই  হামলায় ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিলেন শিক্ষক সুমথ বড়ুয়া। তিনি জানান, ওই দিনের হামলায় আমাদের মনে যে ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে তা কখনো শুকাবার নয়।

তবে এখন সম্প্রীতি ফিরেছে, অতিতের ন্যায় সবাই মিলেমিশে থাকার অনুভুতি প্রকাশ করেন তিনি। পাশাপাশি হামলার ১০ বছর পরেও বিচারকার্য শেষ না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন। ঐদিন রাতে মিছিল নিয়ে আসা হাজার হাজার মানুষকে শান্ত করার চেষ্টা করেছিলেন তৎকালীন উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সোহেল সরওয়ার কাজল৷ মাইকে সকলকে শান্ত হওয়ার অনুরোধ করলেও থামাতে পারেননি হামলা। চোখের সামনে নিজ এলাকার হাজার বছরের স্মৃতি পুড়ে যেতে দেখেছিলেন তিনি৷তিনি জানান,সেদিনের সেই ঘটনা আমাদেরকে আসলে নাড়া দিয়েছিল৷ জাতি ধর্ম নির্বিশেষে আমরা সেদিন লড়াই করেছিলাম, চেষ্টা করেছি সেটি নিবারণ করার জন্য৷ অনেকটা পেরেছি আবার অনেকখানি পারেনি৷ এতদিন পরে এসে এত বছর কিভাবে চলে গেছে সেটিও কল্পনা করতে পারিনা৷ তবে সেই ক্ষত এখনো আমরা ভুলতে পারি নাই৷ সেটিকে মনে রেখে আগামীতে যাতে এই ধরনের ঘটনা না ঘটে সে ব্যবস্থা আমরা নিচ্ছি৷রামু সহিংসতার সেই কালো রাতের ঘটনা স্মরণ করে রামু কেন্দ্রীয় সীমা মহাবিহারের পরিচালক শীলপ্রিয় থের জানান, ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর আমাদের বৌদ্ধ বিহারগুলো ধ্বংস করা হয়েছে। সেই সম্পদ ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়। সেই সময়ে কিছু দুর্বৃত্তের একটি রাত ছিলো। ঘটনাটি স্মরণ করলে এখনও চোখ দিয়ে জল বাহির হয়ে যায়। কঠিন সময় গেছে আমাদের। দূর্বৃত্তরা আমাদের বৌদ্ধ বিহার ও বৌদ্ধ পল্লী পুড়িয়ে দিয়ে অনেক ক্ষতি করেছে। তিনি আরও জানান, আমরা হারিয়ে যাওয়া দিনের চেয়ে, বর্তমানে অনেক সম্প্রীতি ভোগ করছি। এখন আমাদের সম্প্রীতি অনেক বৃদ্ধি হয়েছে। আমরা রামুবাসি সম্প্রীতিতে আছি। আগামী দিনেও আমাদের এ সম্প্রীতি ধরে রাখতে হবে।শীলপ্রিয় থের বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তড়িৎ সিদ্ধান্তে ওই সময়ে আমাদের নিরাপত্তা বৃদ্ধি করা হয়। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মাধ্যমে পুণঃনির্মাণ করে দেয়া হয় বৌদ্ধ বিহারগুলো। এ জন্য আমরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

কক্সবাজার বৌদ্ধ সুরক্ষা পরিষদের সভাপতি প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু জানান, রামু সহিংসতার দশ বছরে ফিরে এসেছে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি। রামুর বৌদ্ধরা পেয়েছে দৃষ্টিনন্দন বৌদ্ধ বিহার। কিন্তু রামুর ঘটনার দশ বছরেও মামলার কার্যক্রম প্রাথমিক পর্যায়ে থমকে আছে। পুলিশ মামলার অভিযোগপত্র আদালাতে জমা দিলেও একটি মামলাও নিষ্পত্তি হয়নি। সেই মামলার বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে দেখা দিয়েছে নানা সংশয়।তিনি আরো জানান, রামুতে ১৮টি মামলার বাদীই পুলিশ। পুলিশ কাকে আসামি করেছে, কাকে বাদ দিয়েছে কিছুই বৌদ্ধ সম্প্রদায় জানেন না। বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে পুলিশকে বারবার তাগিদ দেওয়া সত্ত্বেও যারা মিছিলের সামনের সারিতে ছিল, যারা ভাংচুর-অগ্নিসংযোগে নেতৃত্ব দিয়েছে এদের অনেকেরই নাম পুলিশের অভিযোগপত্রে নেই। রামু সহিংসতার মতো আর কোন ঘটনা যাতে বাংলাদেশে আর না ঘটে সেটার একটা দৃষ্টান্ত রচিত হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।তিনি আরো জানান, চাঞ্চল্যকর এ ঘটনার পর আদালতের নির্দেশে গঠিত বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে গঠিত উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি জড়িতদের দ্রুত বিচারের মুখোমুখি করতে সুপারিশ করে। কিন্তু ঘটনার পরিকল্পনাকারী গডফাদারদের কাউকেই গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। উল্টো অনেক নিরপরাধ ব্যক্তিকে আটক করে এসব মামলা দুর্বল করে ফেলা হয়েছে।

আবার অনেক সাক্ষীর নাম-ঠিকানাও লেখা হয় ভুলভাবে। তাই সহিংসতার মামলার  আটক আসামীরা সবাই জামিনে রয়েছে। দায়ীরা রয়েছে এখনও অধরা। সচেতন মহলের মতে ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বরের ন্যাক্কারজনক এ ঘটনার পরিকল্পনাকারী গডফাদার বা নেতৃত্বদাতাদের মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা হলে বেরিয়ে আসবে ঘটনার আসল রহস্য।রামু একশফুট ভূবণ শান্তি গৌতম বুদ্ধমূর্তি’র প্রতিষ্ঠা ও পরিচালক করুণাশ্রী থের জনান, মধু পূর্ণিমার রাতে রামু, উখিয়ার প্রায় ২০টি বৌদ্ধ বিহার পুড়িয়ে দেয়া হয়েছিল। হামলা ও অগ্নিসংযোগ করা হয় আমাদের ‘একশ ফুট বিশ্বশান্তি গৌতম বুদ্ধ মূর্তি’ ও ‘বিমুক্তি বিদর্শন ভাবনা কেন্দ্রে’। তিনি অবিলম্বে বিচারকার্য শেষ করার জন্য সরকারের কাছে বিনীত অনুরোধ জানান।বৌদ্ধরা জানান, ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর রামু ট্র্যাজেডির ঘটনায় ফেইসবুকে কোরআন অবমাননার ছবি ট্যাগকারী সেই উত্তম বড়ুয়া কোথায়, কি অবস্থানে আছে জানেনা আইনশৃংখলা বাহিনী।

বৌদ্ধদের অনেকে সন্দেহ, নিখোঁজ উত্তম বড়ুয়া আজও বেঁচে আছে তো? যে উত্তম কুমারকে কেন্দ্র করে লঙ্কাকান্ড ঘটে গেছে রামু, টেকনাফ, উখিয়া ও পটিয়ায়। বেঁচে থাকলে তার হদিস এখনো পাইনি কেন পুলিশ? উত্তম কোথায় আছে সেই বিষয়েও নিশ্চিত কোন তথ্য জানা নেই পুলিশের। ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে দরকার উত্তম বড়ুয়াকে। ক কিভাবে তার ফেইসবুকে এই ছবি ট্যাগ করলো সেটি জানতেও দরকার উত্তম বড়ুয়ার স্বীকারোক্তি। কিন্তু ঘটনার দশ বছরেও পুলিশ তার অবস্থান সর্ম্পকে নিশ্চিত হতে না পারায় ক্ষুদ্ধ রামুর সাধারণ মানুষ। রামুতে বৌদ্ধ বিহার পোড়ানোর দিনই পালিয়ে যায় উত্তম বড়ুয়া।কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পি. পি) অ্যাডভোকেট ফরিদুল আলম জানান, বৌদ্ধ বিহার ও বসতিতে হামলার ঘটনায় সর্বমোট ১৯টি মামলা দায়ের করা হয়। তৎমধ্যে বাদীর সম্মতিতে ১টি মামলা প্রত্যাহার করা হয়।

অন্য ১৮টি মামলা আদালতে বিচার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। সাক্ষীর সহযোগীতায় বিচারকার্য তরান্বিত হবে বলে জানান।২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বরের ঘটনায় জাতি, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে সকলের প্রত্যাশা ছিল প্রকৃত দোষীদের শাস্তি দিয়ে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করা হবে। এ ঘটনার বিপরীতে যেসব মামলা হয়েছে তার সুষ্ঠু প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কোন নিরাপরাধ ব্যক্তি যাতে হয়রানির শিকার না হন এবং প্রকৃত দোষীদের শাস্তির আওতায় আনা হয় এমন প্রত্যাশা রামুর বৌদ্ধদের।

Surfe.be - Banner advertising service

https://www.facebook.com/gnewsbd24

More News Of This Category
<script async src="https://pagead2.googlesyndication.com/pagead/js/adsbygoogle.js?client=ca-pub-3423136311593782"
     crossorigin="anonymous"></script>
© All rights reserved © 2011 Live Media
কারিগরি সহযোগিতায়: মোঃ শাহরিয়ার হোসাইন
freelancerzone