যশোরে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক সেফাউর রহমান এর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ

নজরুল ইসলাম, ভ্রাম্যমান প্রতিনিধি ( যশোর ) ঃ
প্রকাশিত: শনিবার, ৬ ডিসেম্বর, ২০২৫, ১২:৫৫ অপরাহ্ণ
যশোরে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক সেফাউর রহমান এর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ

শোর জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের বিরুদ্ধে নানান অভিযোগ। ছাত্রলীগের রাজনীতি থেকে উঠে আসা আলোচিত এই খাদ্য কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তিনি নিজ জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জের কিং ছিলেন। তার ছিল বিশাল গ্যাং বাহিনী । ৫ আগস্টের পরে গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে সারা দেশে ফ্যাসিস্টের দোসর হিসেবে যে সকল সরকারি কর্মকর্তাদের তালিকা করা হয়েছে তার শীর্ষ স্থানে এই খাদ্য কর্মকর্তার নাম আছে বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে ।

নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, যশোর জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক সেফাউর রহমানের গ্রামের বাড়ি চাঁপাই নবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার বোয়ালিয়া ইউনিয়নের কাওয়াভাষা গ্রামে। তিনি ২৫ তম বিসিএস ক্যাডার হিসেবে খাদ্য অধিদপ্তরে যোগদান করেন। সরকারি চাকরির আগে ছাত্রলীগ ও পরে সক্রিয়ভাবে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন ।

বিশেষ করে ওয়ান ইলেভেনের পর আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এলে তিনি রীতিমতো ক্যাডার বাহিনী গড়ে তোলেন ।ওই বাহিনীর নেতৃত্বে এলাকায় চাঁদাবাজি, টেন্ডারসহ বিভিন্ন অপকর্ম চালাতেন। জামায়াত বিএনপির উপর কঠোর নির্যাতন করে তিনি সরকারের নেক নজরে আসেন । চাকরির পাশাপাশি এলাকায় রীতিমতো ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেন । সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে রয়েছে তার একাধিক আইডি । সেফাউর ভাইয়ের বোয়ালিয়া সমর্থক গোষ্ঠী নামের আইডি থেকে রাজনৈতিক কর্মকান্ডের ছবিও ভিডিও পোস্ট দিতেন ।

তার স্ত্রী সাবিহা শবনম কেয়া ছিলেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান । সেফাউর রহমান বিগত আওয়ামী লীগের শাসনামলে সরকারি চাকরি করেও তিনি প্রকাশ্যে দলীয় সব প্রোগ্রামে অংশ নিতেন। এমপি মন্ত্রীদের সাথে তার ছিল গভীর সখ্যতা । সাবেক নৌ পরিবহনমন্ত্রী শাহাজাহান খান, ব্যারিস্টার সুমনসহ আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ একাধিক মন্ত্রী ও এমপির সাথে তিনি ওঠাবসা করতেন । ওই সময় রীতিমতো দলীয় সব প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ ও মিছিল মিটিংয়ে করতেন ।

তিনি আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ব্যানারে গোপালগঞ্জে গিয়ে শেখ মুজিবুর রহমানের কবরে ফুল দিয়েছেন । এ সংক্রান্ত একাধিক ছবি ও ভিডিও ফুটেজ সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদকের হাতে এসেছে ।সূত্র বলছে, ৫ আগস্টের পর আওয়ামী লীগ সরকার পালিয়ে গেলে কৌশল নিজেকে পাল্টে ফেলেন সেফাউর রহমান।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে পরিবার নিয়ে আসেন ঢাকায়।এরপর থেকে গোপনে আওয়ামী লীগ সরকারকে পূর্ণবাসনের জন্য নানা তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের গ্রামের বাড়িতে এখন আর যান না।পাশাপাশি চাঁপাই নবাবগঞ্জের আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের একত্রে সংঘটিত করতে চাপাই উৎসব নামে প্রোগ্রাম করেন । প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিতে এমন আয়োজন বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে ।

যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের তার জেলার ছাত্রলীগের একাধিক নেতাকর্মীদের নিয়ে চাপাই উৎসব পালন করেন।এখানে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যারা যশোরে অবস্থান করছেন তাদের আমন্ত্রণ করা হয়। যশোর ডিসি ফুড অফিসের উপরে অতিথিদের রেস্ট হাউসে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের নিয়ে সেফাউর রহমান গোপন মিটিং করেন বলে অভিযোগ রয়েছে ।

এছাড়া ঢাকার বাসায় নিজ জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জের আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের নিয়ে একাধিক বৈঠক করেন যশোরে ডিসি ফুড সেফাউর রহমান । দলকে পুনরায় সংগঠিত করতে নিয়মিত অর্থায়নও করে যাচ্ছেন ।

সূত্র বলছে, অনৈতিক অর্থ উপার্জন করতে গিয়ে ডিসিফুড সেফাউর রহমান জেলা খাদ্য বিভাগকে অস্থির করে তুলেছেন । অভ্যন্তরীণ খাদ্য সংগ্রহ প্রোগ্রামে ধান চাল ক্রয়ে ওসিএলএসডিদের কাছ থেকে অর্থ আদায়, গুদাম পরিদর্শনে অনৈতিক সুবিধা গ্রহণ সহ নানাভাবে হয়রানি করে যাচ্ছেন । তার স্বেচ্ছাচারিতার কারণে কৃষক সরকারি ক্রয়কেন্দ্রে ধান বিক্রির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

যশোর ডিজিটাল জেলা হওয়ার সত্ত্বেও লটারিতে অ্যাপসের মাধ্যমে বিগত মৌসুমে বোরো ধান না কিনে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন । সদ্য শুরু হওয়া আমন সংগ্রহে ওসি এলএসডিদের একই কায়দায় কেনাকাটা নির্দেশ দিয়েছেন । মিলারদের কাছ থেকে অনৈতিক অর্থ আদায় করায় তারা গুদামে ভালমানের চাল সরবরাহ করতে পারছে না। যেন দেখার কেউ নেই।

সরকারের নিয়ম আছে, ঠিকাদারের মাধ্যমে শ্রম ও হস্তান্তর বিল পরিশোধ করা। কিন্তু ডিসি ফুড ঠিকাদার নিয়োগ না দিয়ে মাস্টাররোলের মাধ্যমে কাজ করাচ্ছেন এবং গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মাধ্যমে বিল পরিশোধ করছেন । আর ভূয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে লাখ লাখ টাকা কমিশন বাণিজ্য করছেন । পরিবহন ঠিকাদার নিয়োগ না দিয়ে দিনের পর দিন একই ভাবে কাজ করে যাচ্ছেন । ধান মিলিংয়ের ক্ষেত্রে মিলারদের থেকে ও অগ্রিম কমিশন নিয়ে মিলিংয়ের ব্যবস্থা করে দেন । টাকা না দিলে কালক্ষেপণ করে বিল দেয়া হয়।

সূত্র বলছে, হত দরিদ্রের জন্য বরাদ্দকৃত সরকারের ওএমএস আটা ও চালে ভাগ বসাচ্ছেন যশোরে ডিসি ফুড সেফাউর রহমান। স্থানীয় একটি রাজনৈতিক দলের কতিপয় সুবিধাবাদী নেতাদের ছত্রছায়ায় তিনি ওএমএস থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন।ফলে ভোক্তারা ঠিকমত চাল, আটা প্রাপ্তি বঞ্চিত হচ্ছেন ।

খাদ্যশস্যের বাজার দর নিয়ন্ত্রণে আসছে না। সরকারের ভর্তুকী কোন কাজে আসছে না।যশোরের মত একটা গুরুত্বপূর্ণ জেলায় ফ্যাসিস্ট সরকারের অন্যতম দোসর সেফাউর রহমান এখনো কিভাবে দায়িত্ব পালন করছে তা নিয়ে নানা প্রশ্ন সৃষ্টি হয়েছে।ক্ষোভ বাড়ছে যশোরে কর্মরত খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে।

এ ব্যাপারে একজন খাদ্য পরিদর্শক নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তিনি বলেন, অফিসে কোন মিটিং অথবা গুদামে গেলে স্যার বারবার ফ্যাসিস্ট – ফ্যাসিস্ট বলেন অথচ তিনিই ফ্যাসিস্টের দোসর জানতাম না।

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে যশোরে ডিসি ফুড সেফাউর রহমান সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করলেও বিগত সময় চাকরির সুবাদে সরকারের বিভিন্ন এমপি, মন্ত্রীদের সাথে কাজ করতে হয়েছে বলে তিনি স্বীকার করেছেন।ব্যক্তিগত জীবনে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জামায়াতসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সাথে তার কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না । এই ব্যাপারে কেউ কোনো প্রমাণও দিতে পারবে না ।