আলু পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন তানোরের কৃষক ও শ্রমিকরা

তানোর প্রতিনিধি (রাজশাহী) ঃ
প্রকাশিত: শনিবার, ৩ জানুয়ারি, ২০২৬, ১১:১৭ অপরাহ্ণ
আলু পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন তানোরের কৃষক ও শ্রমিকরা

িগন্ত মাঠ জুড়ে আলুর সবুজ পাতার সমারোহ। দেখে মনে হবে কেউ সবুজ চাঁদর বিছিয়ে রেখেছে। রাজশাহীর তানোরে হাড় কাঁপানো শীত উপেক্ষা করে আলু পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষক ও শ্রমিকরা। ভোরে কঠিন কুয়াশা ও হিমেল বাতাসের ঠান্ডা উপেক্ষা করে চলছে পরিচর্যার কাজ। কেউ টপড্রেসিং, কেউ সেচ নিচ্ছে আবার কেউ রোগবালা দূর করতে কীটনাশক স্প্রে করছেন।

এভাবেই ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রচুর ব্যস্ত সময় পার করছেন। আবার বিল পাড়ের কৃষকরা বোরো রোপনের বীজ তলা পরিচর্যা ও জমি তৈরির কাজে কোমর বেধে নেমে পড়েছেন। খাওয়া দাওয়ার সময় নেই। জমিতেই সকাল দুপুরের খাবার খেতে হচ্ছে শ্রমিকদের। প্রতিযোগিতা করে খাদ্য উৎপাদনে মরিয়া হয়ে কাজ করছেন বরেন্দ্র অঞ্চল হিসেবে পরিচিত পা ফাটা শ্রমিকরা।

দীর্ঘ দিনের আলু চাষী পৌর এলাকার ইউসুফ জানান, আলুর কতা বলতে শরীর শিউরে ওঠে। কারন গত মৌসুমে যে হারে লোকসান হয়েছে তা ভাষায় বলা যাবেনা। কিন্তু ুপায় নেই লোকসানে পথে বসলেও চাষাবাদ চাড়া কোন উপায় নেই। চাষাবাদ না করলে চলবেনা। লোকসান হোক আর লাভ হোক চাষ করতেই হবে। গতবারে উৎপাদন খরচ বয়াপক হারে বেড়েছিল। কারন জমি লীজ বিঘা প্রতি নিম্মে ২২ হাজার থেকে ২৮/৩০ হাজার টাকায় নিয়েছিল চাষীরা।

আবার বীজের দাম ছিল আকাশ ছোয়া। কয়েকগুণ বাড়তি দামে বীজ কিনে আলু চাষ করা হয়েছিল। আর সারেরও দাম ছিল ব্যাপক। এবারে জমি লীজ কমে গেছে, বীজের দাম কম থাকার কারনে উৎপাদন খরচ কমে গেছে। তবে সারের দাম বাড়তি। এখনো সার নিয়ে চলছে সিন্ডিকেট। কোনভাবেই সরকারি মূল্যে সার পাওয়া যাচ্ছে না। গতবার ৭০ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছিলাম। কিন্তু ব্যাপক লোকসান গুনতে হয়েছে। একারনে কমিয়ে ৬০ বিঘা জমিতে আলু চাষ করা হয়েছে।

আলু রোপন করা এক মাস হচ্ছে। আলুর গাছে টপড্রেসিং চলছে। বিগত ১০/১২ দিন ধরে সূর্যের আলোর দেখা ছিল না। তবে গত তিনদিন ধরে সূর্যের আলোর দেখা মিলেছে। একারনে টপড্রেসিং শুরু করা হয়েছে। টপড্রেসিংয়ের পর সেচ দেয়া হবে। এসময় বিঘায় ১৫ কেজি ডিএপি, ১০ কেজি পটাশ, ৫ কেজি সালফা ও ১০ কেজি ইউরিয়া এবং রোগবালাই দূর করতে কীটনাশক প্রয়োগ করা হবে।

সুজন নামের আরেক আলু চাষী জানান, গতবারে ২০ বিঘা আলু চাষ করে সবার মত আমিও ধরাসয়ী। এবারো ২০ বিঘা জমি লীজ নিয়ে চাষ করা হয়েছে।
সুমন নামের আরেক চাষী জানান, গতবারে ১২ বিঘা জমিতে আলুর চাষাবাদ করে লোকসান গুনতে হয়েছে। একারনে এবারে ৮ বিঘা জমিতে আলু চাষ করা হয়েছে।
তালন্দ ইউপির আলু চাষী শরিফুল জানান, ১০ বিগা জমিতে আলু রোপন করা হয়েছে। টপড্রেসিং চলছে। শেষ হলে সেচ দেয়া হবে।

পৌর এলাকার মনির নামের চাষী জানান, সাড়ে তিন বিঘা জমিতে আলু চাষ করা হয়েছে। মাটি খনন করা হয়েছে। আগামী সোমবার থেকে টপড্রেসিং শুরু হবে। তার আগে অল্প পরিমানে সার ও কীটনাশক প্রয়োগ করা হবে।

উপজেলার বিভিন্ন আলুর মাঠ ঘুরে দেখা যায়, কেউ জমিতে সেচ নিচ্ছে, আবার কেউ টপড্রেসিং করছে, আবার কেউ সার কীটনাশক প্রয়োগ করছেন। এভাবে সারা দিন জমিতেই সময় পার হচ্ছে চাষী ও শ্রমিক দের। আলুর বয়স প্রায় এক মাস, বা ২৫ দিন কিংবা ৩৫ দিন হচ্ছে।

তবে গত কয়েকদিন ধরে প্রচন্ড শীত থাকার কারনে আলুর গাছের চেহারা ভালো হয়ে আছে।

শ্রমিক, মোস্তফা, কাবিল, মতিউর, হাবিলসহ অনেকে জানান, এক বিঘা জমি টপড্রেসিং করতে ২ হাজার ২০০ টাকা থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা ধরে কাজ করা হচ্ছে। বেশির বাগ শ্রমিকরা বিঘা চুক্তিতে টপড্রেসিংয়ের কাজ করছে। ভোরে ঘন কুয়াশা ও প্রচন্ড শীত উপেক্ষা করে জীবিকা নির্বাহের তাগিদে আলুর কাজে নেমে পড়ছেন। কুয়াশার মধ্যে কাজ করার কারনে জামা কাপড় ভিজে যাচ্ছে। কিন্তু ুপায় নেই কাজ করতেই হবে।

চাষী ইউসুফ আরো জানান, এবারে জমি লীজ অনেক কম টাকায় পাওয়া গেছে এবং বীজেরও দাম কম ছিল বা অনেকে গত মৌসুমে বীজ তৈরি করেছিল। একারনে খরচ কম হচ্ছে। এখন পর্যন্ত বিঘায় নিজস্ব জমি হলে ৪০/৪৫ হাজার টাকা খরচ হবে। আর লীজে হলে বিঘায় ৬০/৬৫ হাজার টাকা খরচ হবে। উত্তোলন পর্যন্ত এখরচ দাড়াবে নিজস্ব এক বিঘা জমিতে ৬০/৬৫ হাজার এবং লীজের একবিঘায় ৭৫/৮০ হাজার টাকা পড়বে। অথচ গত মৌসুমে নিজস্ব একবিঘা জমিতে ৮৫/৯০ হাজার টাকা আর লীজের একবিঘা জমিতে ১ লাখ থেকে ১ লাখ ১০ হাজার টাকা মত খরচ হয়েছে।

উপজেলা কৃষি অফিসার সাইফুল্লাহ আহম্মেদ জানান, এবারে উপজেলায় ১২ হাজার ১৯০ হেক্টর জমিতে আলু চাষ হয়েছে। গত মৌসুমের চেয়ে ১ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে আলু চাষ কম হয়েছে। আলু রোপনের পর থেকে আবহাওয়া অনুকূলে আছে। এখন পর্যন্ত আলুতে তেমন রোগবালাইয়ের খবর পাওয়া যায় নি। মাঠে সার্বক্ষণিক বিএসরা কাজ করছে।

কোন সমস্যা হলে কীটনাশক দোকানে না গিয়ে কৃষি অফিসে বা বিএসদের মাধ্যমে পরামর্শ নিয়ে কীটনাশক প্রয়োগ করার পরামর্শ দেন তিনি। তবে নভেম্বর মাসের শুরুতে একরাতের রেকর্ড পরিমান ভারি বর্ষনের কারনে কিছুটা দেরিতে আলু রোপন হয়েছে। অবশ্য বিলকুমারী বিলের রহিমা ডাংগা নামক মাঠে ৪৬ হেক্টর জমিতে আগাম আলু চাষ হয়েছে। যা অল্প কিছুদিনের মধ্যে উত্তোলন শুরু হবে।