তানোরে বিএমডির বীজে বিপর্যস্ত বীজতলা হতাশ বোরো চাষীরা

তানোর প্রতিনিধি (রাজশাহী) ঃ
প্রকাশিত: শনিবার, ১০ জানুয়ারি, ২০২৬, ৫:০৮ অপরাহ্ণ
তানোরে বিএমডির বীজে বিপর্যস্ত বীজতলা হতাশ বোরো চাষীরা

াজশাহীর তানোরে বিএমডিএর বোরো রোপনে জিরাশাল ধানের বীজ কিনে ধরাশায়ী হয়েছেন বোরো চাষীরা। এছাড়াও প্রচন্ড শীতে বীজ তলায় ব্যাপক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। সেই সাথে দেখা দিয়েছে বীজতলায় নানা রোগবালাই। একাধিকবার কীটনাশক প্রয়োগ করেও স্বাভাবিক পর্যায় আনতে পারছেন না কৃষকরা।

ঠান্ডায় বীজতলা রক্ষার জন্য কৃষি অফিস থেকেও পাচ্ছে না কোন ধরনের পরামর্শ। সার ও কীটনাশক দোকানীদের পরামর্শে একাধিক বার কীটনাশক প্রয়োগ করেও রোগবালা দূর হচ্ছে না। এতে করে বোরো রোপনে হুমকিতে পড়েছেন চাষীরা।

জানা গেছে, উপজেলার চান্দুড়িয়া ব্রীজ ঘাট থেকে চৌবাড়িয়া ব্রীজ পর্যন্ত বিলকুমারী বিলের পানি শুকিয়ে গেছে। আর এসব জমিতে আগাম বোরো ধানের চাষ হয়ে আসছে যুগযুগ ধরে। এবারে অবশ্য বোরো রোপন কিছুটা দেরিতে হচ্ছে।

কারন গত নভেম্বর মাসের শুরুতে একরাতের ভারী বর্ষনে বিলের পানি ব্যাপক হারে বেড়ে যায়। পানি নামতে কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে। বিলপাড়ের কৃষকরা ইতিপূর্বেই বোরো বীজতলায় বীজ রোপনের অবস্থা হয়ে পড়েছে। বিলের উপরিভাগের জমি চাষ শুরু হয়েছে। গত ৩১ ডিসেম্বর থেকে শৈত্যপ্রবাহ শুরু হয়। বেশকিছু দিন সূর্যের আলোর দেখা মিলেনি। প্রচন্ড শীত ও কুয়াশার কারনে বীজতলায় নানা রোগবালাই দেখা দিয়েছে।

বিএমডিএ থেকে ৩০ কেজি জিরাশাল বীজ কিনে বপন করেন পৌর সদরের কৃষক ইসাহাক। তিনি জানান, তিন বস্তা বীজ বরেন্দ্র থেকে কিনে বপন করি দু কাঠা জমিতে। এক বস্তায় ১০ কেজি করে বীজ ছিল। ১০ কেজির এক বস্তা বীজের দাম ধরা হয়েছিল ১৭০ টাকা। তিনবস্তা ৫৭০ টাকায় কিনেছিলাম। কিন্তু গাছ তেমন ভাবে গজায়নি এবং পচন, বালকাটি ও কারেন্ট পোকার আক্রমণ শুরু হয়েছে।

তিনবার কীটনাশক প্রয়োগ করেও বীজ ভালো হচ্ছে না। ভালো বীজ হলে ৬ বিঘা জমি রোপন করা যেত। এখন তিন বিঘা জমি রোপন করায় কষ্টকর। ৩০ কেজি বীজের দাম ৫৭০ টাকা, জমি চাষ এক হাজার টাকা, পানির সেচ ৩০০ টাকা, প্রথম দফায় ২৬০ টাকা, ২য় বারে ১৮০ টাকা ও ৩য় বারে ২৩০ টাকার কীটনাশক প্রয়োগ করা হয়েছে। সব মিলে ৩ হাজার ৫৪০ টাকা খরচ হয়েছে।

শাকির নামের আরেক কৃষক জানান, নিজস্ব একমন বীজ বপন করে শীতে নানা প্রকার রোগ দেখা দিয়েছে। একমন বীজে ৬ বিঘা জমি রোপন করা যেত। কিন্তু রোগবালার কারনে বীজ ভালো হয়নি। একারনে তিন বিঘা জমি রোপন করা যাবেনা। গত বছরে বিএমডিএ থেকে ৪০ কেজি বীজ নিয়ে গাছ হয়নি।পুরোটাই লোকসান। একারনে এবারে বরেন্দ্র থেকে বীজ কিনা হয়নি।

তিনি আরো জানান, হামিক বিএমডিএ থেকে জিরাশাল জাতের ৪০ কেজি বীজ কিনে বপন করে ধরাশয়ী হয়েছেন। তেমন গাছ বের হয়নি।

ডলার নামের আরেক চাষী দু মন বীজ কিনে তেমন গাছ বের হয়নি এবং পচন, বালকাটি ও কারেন্ট পোকার আক্রমণ দেখা দিয়েছে। রুহুল ৩০ কেজি আলতাব ২০ কেজি বীজ কিনে একই অবস্থা।

রঞ্জু নামের আরেক কৃষক জানান, আমি তালন্দ বাজার থেকে ১৪ কেজি বীজ কিন বপন করার পর বীজতলার অবস্থা ভালো না। কারন অতিরিক্ত ঠান্ডা ও কুয়াশার কারনে নানা সমস্যা দেখা দিয়েছে। বীজ কিনে জমি রোপন করতে হবে।

সাহেব নামের আরেক কৃষক জানান, ৩০ কেজি বীজ বরেন্দ্র থেকে কিনে শোয়া দু কাঠা জমিতে বপন করে অর্ধেক গাছ বের হয়েছে। বড় ভাই মোস্তফা ৩০ কেজি বীজ কিনে চরম লোকসানে পড়েছেন। তার গাছ বের হয়নি।

তিনি আরো জানান, শাওন নামের আরেক বোরো চাষী ৮০ কেজি বীজ কিনে অর্ধেকও গাছ বের হয়নি। ভালো বীজ হলে ১১/১২ বিঘা জমি রোপন করা যেত। এখন ৩/৪ বিঘা জমি রোপন করতে পারবে।

হালিম নামের আরেক কৃষক জানান, বরেন্দ্র অফিস থেকে ১০ কেজির ১৬ বস্তা বীজ কিনে ১২ কাঠা জমিতে বপন করা হয়েছিল। অর্ধেক গাছ বের হয়নি। এপরিমান বীজ দিয়ে ৩০/৩২ বিঘা জমি রোপন করা যেত। কিন্তু গাছ বের না হওয়ার কারনে ১০/১২ বিঘা জমি রোপন করা যাবে।

কৃষক সাহেব আরো জানান, বিএমডিএর বীজ বপনের আগে একদিন রোদে শুকিয়েছি, তিনদিন ভিজে রেখেছিলাম, পানি থেকে তুলে দুদিন ঢেকে রাখা হয়। বরেন্দ্র অফিসের বীজ তিন দিন ভিজে রাখার পরও গাছ বের হয়নি। ভিজানোর তিনদিন পর সব ধানের গাছ বা স্থানীয় ভাষা টেক বের হলে বীজ ভালো হয়। কিন্তু বিএমডিএর বীজ ভিজানোর পর টেক বা গাছ বের হয়নি এবং জিরাশাল বীজেও অনেক মিকচার ছিল।

বিএমডিএর সহকারী প্রকৌশলী (অতিরিক্ত) দায়িত্ব প্রাপ্ত জামিনুর রহমান জানান, প্রায় ৭ টনের মত বীজ বিক্রি করা হয়েছে। গাছ বের হয়নি বা বীজে সমস্যা এসব বিষয় অজানা।

আদর্শ কৃষক স্ব শিক্ষিত কৃষি বিজ্ঞান নুর মোহাম্মদ জানান, বীজ বপনের আগে ভিজিয়ে রাখার পর সব ধানে যদি ট্যাক বা গাছ বের হয় তাহলে বীজ সঠিক আছে। কিন্তু ভিজিয়ে রাখার পর ট্যাক বা গাছ বের না হয় তাহলে বীজের সমস্যা। তবে এবারে প্রচন্ড শীত ও কুয়াশার কারনে বীজতলায় নানা রোগবালাই দেখা দিয়েছে এবং বীজের রং সবুজের বিপরীতে লালচে ও হলুদ কালার হয়ে আছে। তিনি আরো জানান, রোগবালা দূর করতে বীজতলা শুকনো রাখা যাবেনা, এমিস্টারটপ এক লিটার পানিতে দুই এমএল করে এক সপ্তাহ পরপর দুইবার দিতে হবে এবং শুকনো ছাই দিতে হবে।

উপজেলা কৃষি অফিসার সাইফুল্লাহ আহম্মেদ জানান, এবারে বোরো চাষের লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১৪ হাজার ১৩০ হেক্টর জমিতে। এপরিমান জমি রোপন করতে ৭১০ হেক্টর বীজতলার প্রয়োজন। তিনি আরো জানান, লম্বা সময় ধরে প্রচন্ড শীত ও কুয়াশা ছিল। আমরা বীজতলা পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখতে পরামর্শ দিয়েছিলাম। যারা পলিথিন দিয়ে বীজতলা ঢেকে রেখেছে তাদের বীজতলা ভালো আছে, যারা একাজ করেনি তাদের বীজতলায় সমস্যা দেখা দিবে বা দিয়েছে ।

বীজতলা ভালো রাখার জন্য রাতের পানি রেখে সকালে বের করে দিতে হবে এবং সালফার ও জিং ব্যবহার করতে হবে।