প্রথম সিলেট ডটকম’-এর প্রধান সম্পাদক কায়ছারুল ইসলাম সুমনের আকস্মিক মৃত্যু

আনোয়ার হো‌সেন র‌নি, ছাতক প্রতিনিধি (সুনামগঞ্জ)ঃ
প্রকাশিত: বুধবার, ৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১:০৮ অপরাহ্ণ
প্রথম সিলেট ডটকম’-এর প্রধান সম্পাদক কায়ছারুল ইসলাম সুমনের আকস্মিক মৃত্যু

িলেটের সাংবাদিকতা অঙ্গন ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের মাঝে শোকের ছায়া নেমেছে। নিউজ পোর্টাল ‘প্রথম সিলেট ডটকম’-এর প্রধান সম্পাদক, এটিএন বাংলার যুক্তরাজ্য প্রতিনিধি এবং বিএনপি সমর্থিত প্রবাসী রাজনীতির পরিচিত মুখ কায়ছারুল ইসলাম সুমন আর
আমা‌দের মা‌ঝে নেই।

মঙ্গলবার (০৩ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যার পর বড়লেখা যাওয়ার পথে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে না–ফেরার দেশে পাড়ি জমান তিনি। তাঁর আকস্মিক মৃত্যু পরিবার, সহকর্মী, রাজনৈতিক সহযোদ্ধা এবং শুভানুধ্যায়ীদের ভেঙে দিয়েছে, স্তব্ধ করে দিয়েছে অনেক প্রাণকে।

পরিচয় থেকে আস্থা—এক আত্মিক বন্ধনের গল্প
কায়ছারুল ইসলাম সুমনের সঙ্গে অনেকের মতো লেখকেরও পরিচয় হয়েছিল প্রায় ৫ বছর আগে—২০২০ সালের দিকে। পরিচয়টুকু প্রথমে ছিল পেশাদার, পরে ধীরে ধীরে তা পরিণত হয় বিশ্বাসে, আস্থায় এবং গভীর পারস্পরিক সম্পর্কের বন্ধনে। সুমন ছিলেন এমন একজন মানুষ—যার কাছে নির্দ্বিধায় মনের কথা বলা যায়, যে মানুষের সঙ্গে মতবিরোধ থাকলেও অসম্মান করা যায় না।

লেখকের সম্পাদনায় পূর্বে বন্ধ হয়ে যাওয়া নিউজ পোর্টাল ‘প্রথম সিলেট’ পুনরায় চালু করার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল সুমনের। তাঁর তাগিদ, অনুপ্রেরণা এবং আংশিক সহযোগিতায় ২০২৫ সালের জুনে আবার যাত্রা শুরু করে ‘প্রথম সিলেট ডটকম’। সুমন ছিলেন পোর্টালটির প্রধান সম্পাদক। এটি ছিল না কেবল একটি ওয়েবসাইটের পুনর্জন্ম; লেখকের জন্য এটি ছিল নতুন করে স্বপ্ন দেখার সাহস, পুনরায় দাঁড়িয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা।

বিএনপি অন্তপ্রাণ মানুষটি রাজনীতিতে কায়ছারুল ইসলাম সুমন ছিলেন বিএনপি-মনোভাবাপন্ন এবং কেন্দ্রীয় নেতাদের ঘনিষ্ঠজন। গত মাসের ১৬ জানুয়ারি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সিলেট সফরের আগেই তিনি যুক্তরাজ্য থেকে দেশে ফেরেন। লক্ষ্য—১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে দলের পক্ষে প্রচার–প্রচারণায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করা।

দীর্ঘ প্রবাস জীবন শেষে রাজনৈতিক অঙ্গনকে প্রাণ দেওয়ার দৃঢ় মনোভাব ছিল তাঁর। দেশে ফেরেন পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে।

গত কালই সিলেট আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে স্ত্রী ও সন্তানদের যুক্তরাজ্যে বিদায় জানান। কারও কল্পনাতেও ছিল না—পরিবারের সঙ্গে সেটিই হবে তাঁর শেষ সাক্ষাৎ, শেষ বিদায়।

শেষ দেখা—শেষ দুপুরের আড্ডা বিমানবন্দরে পরিবারের সদস্যদের পাঠিয়ে সিলেটে ফিরে আসেন সুমন। গত মঙ্গলবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে লেখকের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়। দু’জনে একসঙ্গে মধ্যাহ্নভোজন করেন। দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, প্রবাসী রাজনীতি, গণমাধ্যমের ভবিষ্যৎসহ নানা বিষয় নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়। কথা বলার সময় চোখে-মুখে ছিল দায়িত্ববোধ, কণ্ঠে দৃঢ়তা, আর দেশে রাজনীতির দিনে–দিনে জটিল হয়ে ওঠা পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ।

আলোচনা শেষে বেলা সাড়ে ৩টার দিকে বড়লেখার উদ্দেশে সিলেট ত্যাগ করেন তিনি। তখনও কেউ ভাবেননি—এটাই হবে তাঁর শেষ যাত্রা, শেষ দেখা, শেষ কথা।

পরদিন দেখা হওয়ার কথা—দেখা হলো মরদেহের সঙ্গে পরিকল্পনা ছিল বুধবার ৪ ফেরুয়া‌রি আবার দেখা হওয়ার। কথাও হয়েছিল। সেই দেখা হয়েছে ঠিকই—কিন্তু নির্মম এক বাস্তবতায়। দেখা হয়েছে কায়ছারুল ইসলাম সুমনের নিথর দেহের সঙ্গে।

একটি তাজা প্রাণের এত দ্রুত নিভে যাওয়া, এত হঠাৎ চলে যাওয়া কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যাচ্ছে না সহকর্মীদের।

সুমনের ছিল অসাধারণ মানবিকতা যাঁরা সুমনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছেন, তাঁরা জানেন—তিনি ছিলেন সৎ, নির্লোভ, নরম–মনের, কিন্তু নীতির জায়গায় ছিলেন অনড় একজন মানুষ। সাংবাদিকতায় তাঁর ছিল পেশাদারিত্বের কঠোর মানদণ্ড, আবার ব্যক্তিজীবনে ছিলেন সবার কাছে সহজ, আন্তরিক।

রাজনীতিতে মতভেদ থাকলেও সুমন ছিলেন মানবিক, যুক্তিবাদী ও প্রগতিশীল ধারণার মানুষ। তিনি বিতর্ক করতেন, কিন্তু অসম্মান করতেন না; তিনি মতামত দিতেন, কিন্তু কাউকে ছোট করতেন না। তাঁর উন্মুক্ততা ও মনন তাঁকে আলাদা করে তুলে ধরেছিল প্রবাসী রাজনীতি ও সাংবাদিকতার পরিমণ্ডলে।

চলে যাওয়ার বেদনা—এক শূন্যতা যা পূরণ হবে না
কায়ছারুল ইসলাম সুমনের মৃত্যু শুধু একটি পরিবারকেই শোকাহত করেনি, ব্যথিত করেছে সাংবাদিক সমাজ, সিলেট এবং প্রবাসী সিলেটিদের হৃদয়কে। বিশেষ করে লেখকের কাছে তাঁর মৃত্যু যেন ব্যক্তিগত এক শোক—যে সম্পর্কটি ছিল স্থায়ী, দৃঢ় এবং আত্মিক। লেখার ফাঁকে ফাঁকে বারবার থমকে দাঁড়াতে হয়—চোখ ভিজে ওঠে, শব্দগুলো আর পথ খুঁজে পায় না। একজন মানুষের চলে যাওয়ায় থমকে যাওয়া সময়মানুষের মৃত্যু অনিবার্য—তবুও কিছু মৃত্যু আমাদের স্তব্ধ করে দেয়। সুমন ভাই ছিলেন এমনই একজন মানুষ, যাঁর অনুপস্থিতি শুধু দেখা যাবে না—অনুভব করা যাবে প্রতিদিন, প্রতিটি কাজে, প্রতিটি সিদ্ধান্তে। তিনি ছিলেন একটি স্বপ্নের নির্মাতা, উদ্যমের উৎস, আর এক নীরব শক্তি। তাঁর মৃত্যু শুধু একটি প্রস্থান নয়—এটি একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি।

শেষ প্রার্থনা এই পৃথিবী হয়তো আপনাকে ধরে রাখতে পারেনি, সুমনকে। হয়তো আপনার চলার গতি, মানবিকতা এবং দায়িত্ববোধ এই পৃথিবীর চাহিদার চেয়েও বড় ছিল। পারাপারের ওপারে আপনি ভালো থাকুন। আপনার অসমাপ্ত কাজ, অসমাপ্ত স্বপ্ন মানুষদের অনুপ্রাণিত করবে আরও অনেক দিন। আর আপনার শূন্যতা—তা অপূরণীয়।