এবারের নির্বাচন শুধু প্রতিনিধি বাছাই নয়, দেশ পুনর্গঠনের লড়াই : ঠাকুগাঁওয়ে তারেক রহমান

ঠাকুরগাঁও থেকে ফিরে- আশরাফুজ্জামান খোকন ঃ
প্রকাশিত: রবিবার, ৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১০:৩৫ পূর্বাহ্ণ
এবারের নির্বাচন শুধু প্রতিনিধি বাছাই নয়, দেশ পুনর্গঠনের লড়াই : ঠাকুগাঁওয়ে তারেক রহমান

িএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, মানুষ জীবন দিয়েছে, বিগত সরকারের আমলে অত্যাচারিত হয়েছে, নির্যাতিত হয়েছে। তাদের এই মূল্যায়ন কখনো বৃথা যেতে দেওয়া যাবে না। এবারে নির্বাচন শুধু দেশের জন্য প্রতিনিধি নির্বাচন করার জন্য নয়, এবারের নির্বাচন হবে আমাদের দেশকে পুণর্গঠনের নির্বাচন।

তিনি বলেন, গত এক যুগ ধরে বাংলাদেশের মানুষ তাদের রাজনৈতিক অধিকার প্রয়োগ করতে পারেনি। তারা কথা বলার বাক স্বাধীনতা পায়নি। একইভাবে বাংলাদেশের মানুষ তাদের অর্থনৈতিক অধিকার থেকে অনেকটা পিছিয়ে গেছে। গতকাল শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে (বড় মাঠ) জেলা বিএনপির আয়োজনে নির্বাচনী গণসমাবেশে তিনি এসব কথা বলেন।

তারেক রহমান বলেন, দেশের যুবক তরুণের যেভাবে কর্মসংস্থান তৈরির ব্যবস্থা করার কথা ছিল, সেভাবে ব্যবস্থা হয়নি। দেশের মা-বোনদেরও সেভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি। দেশের কৃষকদের যেভাবে অর্থনৈতিকভাবে সহযোগিতা করার কথা ছিল, সেভাবে তাদের সহায়তা করা হয়নি।

তিনি বলেন, দেশের প্রকৃত মালিক জনগণ। জনগণের সমর্থন ও সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া বাংলাদেশকে নতুন করে গড়ে তোলা সম্ভব নয়।

একটি সমৃদ্ধ, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়তে বিএনপি কাজ করতে চায়। সে লক্ষ্যেই দলীয় কর্মসূচি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন তিনি। খালেদা জিয়া (মরহুমা আমার মা’) বলতেন বাংলাদেশ ছাড়া তার আর কোনও ঠিকানা নেই। বিএনপির প্রতিটি নেতাকর্মী বিশ্বাস করে বাংলাদেশ তাদের প্রথম এবং শেষ ঠিকানা। এজন্য আমরা জনগণের সামনে দাঁড়িয়েছি। জনগণের শক্তিতে দেশ পুনর্গঠন করতে চাই।

একইসঙ্গে বিএনপি সরকার গঠন করলে দ্রুত সময়ের মধ্যে ঠাকুরগাঁও বিমানবন্দর চালুর প্রতিশ্রুতি দেন দলটির চেয়ারম্যান।

তিনি বলেন, আমাকে মির্জা ফখরুল ইসলাম সাহেব বললেন যে এই এলাকার এয়ারপোর্টের কাজ অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছে। ইনশাআল্লাহ বিএনপি আগামী ১২ তারিখের নির্বাচনে সরকার গঠন হলে যত দ্রুত সম্ভব আমরা এই এলাকার এয়ারপোর্ট ইনশাআল্লাহ চালু করব।

২০২৪ সালে জুলাই অভ্যুত্থান দিয়ে দেশকে রক্ষা করেছি জানিয়ে বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, এখন দেশকে এগিয়ে নিতে হবে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় আমরা দেখিনি কে কোন ধর্মের। ২৪ এও একই। এই দেশে হাজার বছর ধরে প্রত্যেক ধর্মের মানুষ শান্তিতে বসবাস করেছে। আগামীতেও তাই হবে। ধর্ম দিয়ে কাউকে বিচার করা হবে না।

নারীকে কর্মের সঙ্গে সম্পৃক্ত না করলে দেশ এগিয়ে যাবে না উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, খালেদা জিয়া বিনামূল্যে নারীদের শিক্ষার ব্যবস্থা করেছিলেন। আমরা নারীদের স্বাবলম্বী করতে চাই। প্রত্যেক নারীর কাছে ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দিতে চাই। ফ্যামিলি কার্ডের পাশাপাশি কৃষি কার্ড নিয়ে তিনি বলেন, কৃষকদের কাছে কৃষি কার্ড পৌঁছাতে চাই। এর মাধ্যমে সহজে ঋণ নেয়া যাবে। ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ করতে চাই। এনজিও থেকে ক্ষুদ্র ঋণ যেসব নেওয়া হয়েছে সেসব সরকারের হয়ে জনগণের পক্ষ থেকে পরিশোধ করতে চাই।

ঠাকুরগাঁও কৃষিনির্ভর এলাকা জানিয়ে বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, কৃষকদের পাশে যেমন দাঁড়াবো তেমনভাবে এই এলাকায় কৃষিনির্ভর শিল্প বিকশিত করবো। যাতে কর্মসংস্থান হয়। বহু যুবক আছে যারা বেকার। যুবকদের ট্রেনিং দিয়ে দক্ষ শ্রমিক করতে চাই। আমরা আন্দোলন সংগ্রাম করেছি। মানুষকে সাথে নিয়ে দেশ পুনর্গঠন করতে চাই। এই কাজ করতে হলে জনগণের সহযোগীতা লাগবে।

উত্তরাঞ্চলকে কৃষিপ্রধান এলাকা উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, বৃহত্তর দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড় অঞ্চলের কৃষিপণ্য সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী হিমাগার (কোল্ড স্টোরেজ) নির্মাণের পরিকল্পনার কথা জানান তিনি।

এ ছাড়া বন্ধ হয়ে যাওয়া চিনিকল, রেশম কারখানা ও চা শিল্প পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে আশ্বাস দেন বিএনপির এই নেতা। তারেক রহমান বলেন, এসব শিল্প পুনরুজ্জীবিত হলে স্থানীয় অর্থনীতি সচল হবে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে।

বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, তরুণদের দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে কারিগরি ও কৃষিভিত্তিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে। তথ্যপ্রযুক্তি খাতে কর্মরত স্থানীয় তরুণদের জন্য ঠাকুরগাঁওয়ে আইটি পার্ক বা আইটি হাব স্থাপন করা হবে, যাতে তারা নিজ এলাকায় থেকেই কর্মসংস্থানের সুযোগ পায়।

স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে গ্রামে গ্রামে হেলথকেয়ার কর্মী নিয়োগের পরিকল্পনার কথাও জানান তারেক রহমান। এসব কর্মী মূলত মা ও শিশুদের ঘরে গিয়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দেবেন বলে জানান তিনি। এ ছাড়া এলাকায় মেডিকেল কলেজ, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও ক্যাডেট কলেজ স্থাপনের জনদাবি বাস্তবায়নের আশ্বাস দেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

সমাবেশে তারেক রহমান আরও বলেন, বিএনপি এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে চায় যেখানে ধর্মের ভিত্তিতে কেউ বৈষম্যের শিকার হবে না। হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান—সব নাগরিক মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে সমান সুযোগ পাবে। আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে খেটে খাওয়া মানুষ, ব্যবসায়ী ও নারীরা নিরাপদে চলাচল ও জীবনযাপন করতে পারবেন।

এসময় ঠাকুগাঁও-১ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আরমগীর, ঠাকুরগাঁও-২ বিএনপি প্রার্থী ও ড্যাবের সাবেক মহাসচিব ডা. আব্দুস সালাম, ঠাকুরগাঁও-৩ বিএনপির মনোনীত প্রার্থী ও সাবেক এমপি জাহিদুর রহমান জাহিদ ও পঞ্চগড়-১ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার মুহাম্মদ নওশাদ জমির, পঞ্চগড়-২ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির পল্লী উন্নয়ন বিষয়ক সম্পাদক ও পঞ্চগড় জেলা বিএনপির সদস্য সচিব আলহাজ্ব ফরহাদ হোসেন আজাদ সহ জেলা বিএনপির নেতাকর্মীবৃন্দ, বোদা-দেবীগঞ্জ, তেঁতুলিয়া-আটোয়ারী-পঞ্চগড় সদর উপজেলা ও পৌর বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সহ বিএনপির সকল অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীবৃন্দ, সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীবৃন্দ, প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

বক্তব্য শেষ করার পূর্বে ঠাকুগাঁও এবং পঞ্চগড় পাঁচটি আসনের বিএনপি প্রার্থীদের হাত তুলে মঞ্চে পরিচয় করে দেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এ সময় তিনি তাঁদের ধানের শীষে ভোট দিতে এবং তাঁদের জন্য দোয়া চান।