ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শেষ হাসিটা কে দিবেন ?

আমিনুল আমিন ঃ
প্রকাশিত: রবিবার, ৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১:১৪ পূর্বাহ্ণ
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শেষ হাসিটা কে দিবেন ?

০২৬ সালে বাংলাদেশের আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতিতে অন্তর্র্বতী সরকারের অধীনে এই নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি শেষ প্রান্তে, প্রার্থীদের শেষ মূহুর্তের প্রচারণা। এবার নির্বাচন কমিশনার ভোট কিভাবে নিবেন চলছে তার পরিকল্পনা। এর মধ্যে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রধান যে দিকগুলো তার বিশেষ অংশগুলো তুলে ধরা হলো।

নির্বাচনের তারিখ: প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিন ঘোষণা করেছেন আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। উক্ত নির্বাচনের একই দিনে সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে ‘জুলাই চার্টার’ বা জুলাই সনদের ওপর একটি জাতীয় গণভোটও অনুষ্ঠিত হবে।

অংশগ্রহণকারী দল হিসেবে বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে প্রধান দুটি দলের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যান্য দল নির্বাচনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের প্রস্তুতিও প্রায় শেষের দিকে। তবে আইনিভাবে নিষিদ্ধ হওয়ায় আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশগ্রহণে করতে পারছেনা।

এই নির্বাচনে মোট দেশে ভোটারের সংখ্যা প্রায় ১২ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ১৮৩ জন, যা ২০২৬ সালের বিশ্বের অন্যতম বড় গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

এবারের ভোটে যা নতুন সংযোজন হয়েছে এবং নির্বাচনে প্রথমবারের মতো পোস্টাল ব্যালট ব্যবহারের সুযোগ থাকছে এবং ব্যালট পেপারে ’হ্যাঁ ভোট’ এবং ‘না ভোট’ অপশনটি চালু করা হয়েছে ।

সংস্কারের ভূমিকা হিসেবে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্র্বতী সরকার নির্বাচনী ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের নিশ্চয়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে।

নির্বাচনের ফলাফল বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

বিএনপি যে কারনে নির্বাচনে জয়লাভ করার সম্ভাবনা রয়েছে:
এবছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ের দৌড়ে বর্তমানে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে বলে বিভিন্ন জনমত জরিপে উঠে এসেছে।

আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশগ্রহণে নিষিদ্ধ থাকায় এবারের নির্বাচন মূলত বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে একটি ‘দ্বিমুখী’ লড়াইয়ে পরিণত হবে।

জয়লাভ করার সম্ভাবনা নিয়ে প্রধান তথ্যগুলো নিচে দেওয়া হলো:
বিএনপি-র অবস্থান: বিভিন্ন জরিপ (যেমন: ইমিনেন্স এবং ইনোভিশন কনসাল্টিং) অনুযায়ী, ৪৭% থেকে ৭০% ভোটার বিএনপি-কে সমর্থন করছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান আগামী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছেন।

জামায়াতে ইসলামী: জামায়াত এবং তাদের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট (জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ) দ্বিতীয় শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। জরিপ অনুযায়ী তাদের জনসমর্থন ১৯% থেকে ৩৪% এর মধ্যে ওঠানামা করছে। তারা একটি দুর্নীতিমুক্ত বিকল্প গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রচারণা চালাচ্ছে।

আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি: গত চারটি নির্বাচনে বিজয়ী আওয়ামী লীগকে বর্তমান অন্তর্র্বতী সরকার ও আদালত নির্বাচনে অংশগ্রহণে অযোগ্য ঘোষণা করেছে, যা নির্বাচনী সমীকরণ সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে।

নতুন রাজনৈতিক শক্তি: ছাত্র আন্দোলনের ফলে গঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টি (NCP) এবং অন্যান্য ছোট দলগুলো নতুন ভোটারদের আকর্ষণ করার চেষ্টা করছে, তবে তারা মূলত জামায়াত বা অন্যান্য জোটের সাথে যুক্ত হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে।

সামগ্রিকভাবে, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং জনমত জরিপগুলো বিএনপি-র বিজয়ী হওয়ার এবং সরকার গঠনের জোরালো সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) যে কারণে এগিয়ে:
২০২৬ সালের নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-র এগিয়ে থাকার পেছনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও সামাজিক কারণ রয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং সাম্প্রতিক জনমত জরিপগুলোর তথ্য অনুযায়ী এই কারণগুলো নিচে ব্যাখ্যা করা হলো:

আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি ও ভোটার স্থানান্তর: আওয়ামী লীগ নির্বাচনে নিষিদ্ধ হওয়ায় তাদের একটি বিশাল ভোটব্যাংক (প্রায় ৪৮%) এখন বিএনপি-র দিকে ঝুঁকেছে। ভোটাররা বিকল্প প্রধান শক্তি হিসেবে বিএনপি-কে বেছে নিচ্ছেন।

তারেক রহমানের নেতৃত্ব ও নতুন উদ্দীপনা: দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসন কাটিয়ে তারেক রহমান দেশে ফিরে দলের হাল ধরায় তৃণমূলে নতুন প্রাণের সঞ্চার হয়েছে। তাকে অনেক ভোটার বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশকে ঐক্যবদ্ধ করার সক্ষম একমাত্র নেতা হিসেবে দেখছেন।

সংগঠিত তৃণমূল ও সাংগঠনিক শক্তি: বিএনপি-র বিশাল তৃণমূল ভিত্তি এবং বর্তমানে দলের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা বৃদ্ধি তাদের এগিয়ে রাখছে। জরিপ অনুযায়ী, অনেক নির্বাচনী এলাকায় জামায়াতের চেয়ে বিএনপি প্রার্থীদের পরিচিতি ও গ্রহণযোগ্যতা বেশি।

ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের সমর্থন: বিএনপি এবার হিন্দুসহ অন্যান্য ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল ও সেল গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ফলস্বরূপ, সংখ্যালঘু ভোটারদের একটি বড় অংশ বিএনপি-র প্রতি আস্থা দেখাচ্ছে।

অন্তর্ভুক্তিমূলক ও উদারনীতি: বিএনপি নিজেকে একটি উদারপন্থী শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করছে। জামায়াতের নির্দিষ্ট কিছু নীতি (যেমন নারী বা ধর্মীয় সংখ্যালঘু বিষয়ক) নিয়ে ভোটারদের মধ্যে যে দ্বিধা রয়েছে, বিএনপি-র ‘ইনক্লুসিভ ভিশন’ বা অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গি সেটি কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করছে।

আর্থ-সামাজিক প্রতিশ্রুতি: বিএনপি-র ইশতেহারে অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং স্বাস্থ্যসেবাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

১ লক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ এবং আইটি শিক্ষার মাধ্যমে তরুণদের স্বাবলম্বী করার মতো প্রতিশ্রুতিগুলো সাধারণ মানুষের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে ।

বিভিন্ন জরিপ (যেমন: প্রথম আলো এবং ইএএসডি) বলছে, ৬৬% থেকে ৭০% মানুষ মনে করেন বিএনপি সবচেয়ে বেশি আসন পেয়ে সরকার গঠন করবে।

জামায়াতে ইসলামী যে কারণে পিছিয়ে:
২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী জয়ের লড়াইয়ে অত্যন্ত শক্তিশালী অবস্থানে থাকলেও, জনমত জরিপে তারা বিএনপির তুলনায় কিছুটা পিছিয়ে রয়েছে। বিভিন্ন বিশ্লেষক ও জরিপ সংস্থার মতে এর প্রধান কারণগুলো হলো:

১. আদর্শিক সীমাবদ্ধতা ও ধর্মভিত্তিক রাজনীতি
জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশের একটি বড় অংশের ভোটার ব্যক্তিগত জীবনে ধর্মপ্রাণ হলেও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় কট্টর রক্ষণশীল ইসলামী নেতৃত্ব আসার ব্যাপারে দ্বিধাগ্রস্ত। জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমানের নারীদের নেতৃত্ব নিয়ে মন্তব্য এবং দলের শরিয়াহ-ভিত্তিক আইন প্রবর্তনের লক্ষ্য অনেক উদারপন্থী ও নারী ভোটারদের মধ্যে সংশয় তৈরি করেছে।

২. ঐতিহাসিক নেতিবাচক ভাবমূর্তি
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের ভূমিকা এবং যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিষয়টি এখনও অনেক ভোটারের জন্য সংবেদনশীল। বিএনপি তাদের নির্বাচনী প্রচারণায় জামায়াতের এই বিতর্কিত অতীতকে বারবার সামনে আনছে, যা নতুন প্রজন্মের অনেক ভোটারকে প্রভাবিত করছে।

৩. কৌশলগত ও জোটগত অবস্থান
একক লড়াই: আগে বিএনপি-জামায়াত জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করলেও এবার তারা আলাদাভাবে লড়ছে। বিএনপির বিশাল ভোটব্যাংক ও শক্তিশালী তৃণমূল কাঠামোর বিপরীতে জামায়াতের সমর্থন মূলত নির্দিষ্ট কিছু পকেটে সীমাবদ্ধ।

নতুন রাজনৈতিক শক্তির চ্যালেঞ্জ: ২০২৪-এর ছাত্র আন্দোলনের পর গঠিত ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’ (NCP) এবং অন্যান্য ছোট দলগুলো জামায়াতের সম্ভাব্য তরুণ ও সংস্কারপন্থী ভোট ভাগ করে নিচ্ছে।

৪. সংখ্যালঘু ভোটারদের আস্থার অভাব
সংখ্যালঘু ভোটাররা (হিন্দু, খ্রিস্টান ইত্যাদি) ঐতিহাসিকভাবেই জামায়াতের চেয়ে বিএনপির প্রতি বেশি আস্থা রাখে। যদিও জামায়াত এবারই প্রথম হিন্দু প্রার্থী দিয়ে ভাবমূর্তি পরিবর্তনের চেষ্টা করছে, তবুও সংখ্যালঘু ভোট এখনও বড় আকারে বিএনপির পক্ষেই দেখা যাচ্ছে।

৫. জনমত জরিপের ব্যবধান
সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, বিএনপি প্রায় ৩৪.৭% সমর্থন নিয়ে শীর্ষে রয়েছে, যেখানে জামায়াত ৩৩.৬% সমর্থন নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে। মাত্র ১.১ শতাংশের ব্যবধান সংসদীয় আসনের ক্ষেত্রে বিশাল পার্থক্য তৈরি করতে পারে।

তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, জামায়াত এবার তাদের ইতিহাসের সেরা ফল করতে পারে এবং প্রায় ১৮% ভোটার এখনও সিদ্ধান্তহীন রয়েছেন, যারা নির্বাচনের দিনে ফলাফল বদলে দিতে পারেন।