লোকসানে তানোরের আগাম আলু চাষীরা সাড়ে ৯ টাকা কেজিতে বিক্রি

আব্দুস সবুর, তানোর প্রতিনিধি (রাজশাহী) ঃ
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৫:৫০ অপরাহ্ণ
লোকসানে তানোরের আগাম আলু চাষীরা সাড়ে ৯ টাকা কেজিতে বিক্রি

র পর লোকসানে পথে বসে পড়েছেন রাজশাহীর তানোরের আগাম আলু চাষীরা। ফলন তুলনামূলক ভালো হলেও দাম একেবারে নিম্ন। আবার অতিরিক্ত ৫ কেজি করে ঢলন দিতে হচ্ছে চাষীদের। ফলে চরম লোকসান গুনতে হচ্ছে। এতে করে চরমভাবে কপালে ভাজও পড়েছে চাষীদের।

গত সোমবার বিকেলের দিকে গোকুল মোড়ে ট্রাকে আলু লোড করছেন শ্রমিকরা। মলিন মুখে গালে হাত দিয়ে বসে আছেন আলু চাষী। আগাম জাতের আলু তুলে খরচের অর্ধেক টাকাও তুলতে পারছেন চাষীরা। গত মৌসুমে একই কায়দায় লোকসানে পড়েছিলেন চাষীরা। ঘুরে দাড়াতে পুনরায় বিল পাড়ের উঁচু জমিতে করেন আগাম জাতের আলু চাষ। লাভের আশায় আগাম আলু চাষ করে চরম ভাবে ধরাসয়ী হয়েছেন।

আলুর বস্তার উপরে মুলিন মুখে বসে ছিলেন চাষী ফিরোজ। তিনি জানান এক বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছিলাম। ফলন যা হয়েছে তুলনামূলক ভালো। কিন্তু দাম একেবারেই নেই। বিঘায় ফলন ৫০ বস্তা করে হয়েছে। বিঘায় ৪৫ হাজার টাকা থেকে ঊর্ধ্বে ৫০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে।

বিক্রি করা হয়েছে সাড়ে ৯ টাকা কেজি দরে। এক বস্তায় ৭০ কেজি আলু নিলেও ৬৫ কেজির দাম দেয়া হচ্ছে। সব মিলে ২৫ হাজার থেকে ২৮ হাজার টাকা আসছে। বিঘায় ২২/২৫ হাজার টাকা করে লোকসান হচ্ছে।

আরেক চাষী রইচ জানান সাড়ে তিন বিঘা আলু উত্তোলন করে সাড়ে ৯ টাকা কেজি দরে বিক্রি করা হয়েছে। কুরবান নামের আরেক চাষী জানান আড়াই বিঘা জমির আলু সাড়ে ৯ টাকা কেজিতে বিক্রি করা হয়েছে।

তারা জানান বিঘায় ৫০ হাজার টাকা খরচ করে পাওয়া যাচ্ছে ২৬/২৮ হাজার টাকা করে। বিঘায় ৩২ হাজার টাকা লোকসান হচ্ছে। বিঘা ৩২ হাজার টাকা লোকসান হলে পথে বসা ছাড়া উপায় নেই। আবার ৫ কেজি করে বাড়তি দিতে হচ্ছে। ৭০ কেজির বস্তা লোড হলেও ৬৫ কেজির দাম পাচ্ছি। যার কারনে বস্তায় ৪৭ টাকা ৫০ পয়সা করে পাওয়া যাচ্ছে না। বিঘায় ২৫০ কেজি করে বাড়তি আলু নিচ্ছে ব্যবসায়ীরা। যার দাম লাগছে ২ হাজার ৩৭৫ টাকা। ৫ কেজি করে ঢলন না দিলে তারা আলু কিনবেনা।

বাড়তিটাই নাকি তাদের লাভ। কারন আলুর দাম নাই। আবার এখান থেকে আলু ট্রাকে করে খুলনায় নিয়ে গিয়ে বিক্রি করবেন। এখান থেকে খুলনা যাওয়া ও সেখানে গিয়ে অপেক্ষা করার পর আলু বিক্রি করে। এজন্য জমির কাঁচা আলু নাকি অনেক শুকিয়ে যায়। তাদের সাথে কথা বলার সময় উপস্থিত হন ব্যবসায়ী আইনুল, তিনি জানান, এসব আলু সব যাবে খুলনাতে।

সেখানে গিয়ে খুব বেশি হলে কেজিতে এক টাকা থেকে দু টাকা বাড়তি দামে বিক্রি করা যাবে। ঢলনের নামে অতিরিক্ত ৫ কেজি করে আলু নেয়া হচ্ছে জানতে চাইলে তিনি জানান, জমি থেকে একেবারেই কাঁচা আলু কিনা হচ্ছে। খুলনা মোকামে যেতেই অনেক ওজন কমে যায়। আবার কয়েকদিন বিক্রি করতে না পারলে বেশি পরিমান কমে। এজন্য ঢলন নিতে হয়।

মাসুদ নামের আরেক ব্যবসায়ী এসে হাজির হন। তিনি বলেন, গতবারের মত এবারো আলুতে ধরাসয়ী চাষীরা। বিঘায় খরচ হয়েছে ৫০ হাজার টাকা আর বিক্রি করে পাচ্ছে ২৫ থেকে ২৮ হাজার টাকা। বিঘায় ২২ থেকে ২৫ হাজার টাকা আবার ঊর্ধ্বে ৩০ হাজার টাকাও লোকসান গুনতে হচ্ছে।

গতবার ধরা খেয়ে জমির পরিমান কমিয়ে ঋণ মহাজন করে আলু চাষ করে পুনরায় লোকসান। আমি সাড়ে ৯ টাকা কেজি দরে জর্জিসের ২ বিঘা জমি ও ফজলুর এক বিঘা জমির আলু কিনেছি।

মুনসুর নামের আরেক চাষী জানান, রাব্বানী ২৫ কাঠা জমির আলু তুলে সাড়ে ৯ টাকা কেজি করে বিক্রি করেছেন। গতবার তিনি ৮ বিঘা জমিতে আলু চাষ করে ধরা খেয়ে এবার কমিয়ে ৪ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেন।

চাষীরা জানান, পুরোদমে আলু তুলা শুরু হয়নি। যারা আগে আলু রোপন করেছিলেন তাদের আলু উঠতে শুরু করেছে। প্রায় ৮/১০ দিন আগে রহিমা ডাংগা নামক বিলের জমির আলু উঠেছিল। ওই সময় আলুর বাজার ছিল সাড়ে ৯ টাকা কেজি । সে বাজার এখনো চলমান রয়েছে। অবশ্য এবারে জমি লীজ ও বীজ আলু কম দামে পাওয়ার কারনে উৎপাদন খরচ কিছুটা কম হয়েছে। তবে সার কীটনাশকের অতিরিক্ত দামের কারনে অনেকটা বেড়েছে উৎপাদন খরচ।

চাষীরা আরো জানান, গত ১২ ফেব্রুয়ারী জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়েছে। নির্বাচনের সময় বিএনপি জামায়াত দলের শীর্ষ নেতারা কৃষি ফসলের ন্যায্য মুল্য যাতে কৃষকরা পায় সে বিষয়ে কথা বলেছে। এমনকি উত্তর অঞ্চলে কৃষির রাজধানী করার ঘোষণাও দিয়েছেন।

নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠনের জন্য মন্ত্রী সভার শপথ হয়েছে। এখন দেখার বিষয় কৃষকের আলুর দাম নিয়ে নতুন সরকার কতটুকু কাজ করেন। আমাদের অতিরিক্ত লাভের দরকার নেই। উৎপাদন খরচ পেলেই হবে। বাজারে সব রকমের সবজির দাম তুলনামূলক ভালো আছে। শুধু আলুর দাম নেই।

আমরা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে আলু উৎপাদন করছি বলেই এত কম দামে জনসাধারণ আলু খেতে পারছে। যদি এত পরিমান উৎপাদন না হত তাহলে হাহাকার পড়ে যেত। আশা করছি নতুন সরকার আলুর দিকে নজর দিয়ে হাজারো চাষীদের পথে বসা থেকে রক্ষা করবেন।

উপজেলা কৃষি অফিসার সাইফুল্লাহ আহম্মেদ জানান, এবারে উপজেলায় ১২ হাজার ১৯০ হেক্টর জমিতে আলু চাষ হয়েছে। এখন পর্যন্ত ১৫০ হেক্টর জমির আলু তুলা হয়েছে। হেক্টর প্রতি ২৫ মে:টন করে ফলন হয়েছে। দামের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, আমাদের কাজ হচ্ছে চাষাবাদে রোগবালা আছে কিনা ও রোগবালা হলে দূর করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা। দামের বিষয়ে কৃষি বিপণন বিভাগের কাজ।

কৃষি বিপণন রাজশাহী বিভাগের উপপরিচালক (উপসচিব) শাহানা আখতার জাহানের মোবাইলে একাধিক বার ফোন দেয়া হলেও তিনি রিসিভ না করার কারনে কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি।