রাজশাহীর তানোরে গভীর নলকূপের আওতায় আলুর প্রজেক্টে জমি লীজের প্রায় কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ পাওয়া গেছে বিএনপি নেতা সাতজন গভীর নলকূপ অপারেটরের বিরুদ্ধে। এঘটনায় কামারগাঁ ইউনিয়ন ইউপির এক নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা কৃষক আব্দুস সালাম বাদি হয়ে অপারেটরসহ সাত নেতাকর্মীদের বিবাদী করে গত ২৪ ফেব্রুয়ারী মঙ্গলবার উপজেলা নির্বাহীর দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।
অভিযোগে বিবাদী টাকা আত্মসাত কারী অপারেটরের চাচা বিএনপি নেতা মালশিরা গ্রামের সুলতান আলী, সুমন সোনার, জয়নাল সোনার, হিমেল ও শাফিউল এবং বিহারইল গ্রামের আব্দুল মান্নান মেম্বার, সাদিকুল ইসলাম পিন্টু। অভিযোগ দেয়ার পর থেকে মারমুখী আচরণ শুরু করেছেন অপারেটরসহ নেতারা এবং তাদের অত্যাচার বেড়ে যাবে বলে মনে করছেন স্কীমভূক্ত কৃষক সহ অভিযোগ কারী।
বিগত ২০২৪ সালে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে গভীর নলকূপ গুলো দখলে নিয়ে রাম রাজত্ব শুরু করেন অপারেটর সহ নামধারী নেতারা। তাদের ভয়ে কেউ মুখ খুলতে পারেনি। আলুর প্রজেক্টে ইচ্ছে মত জমি লীজ দিয়ে নামমাত্র কৃষক দের টাকা ধরিয়ে দিয়ে কাড়িকাড়ি টাকা আত্মসাত করে আসছে তারা।
আর এসব কারনে বিএনপির প্রার্থী কে পরাজয় বরণ করতে হয় বলেও মনে করেন কৃষকরা। জাতীয় নির্বাচনের পর বিএনপির প্রার্থী পরাজিত হওয়ার কারনে কৃষকরা এক জোট হয়ে আত্মসাৎ কারী অপারেটরদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিতে সাহস পেয়েছে। তাছাড়া অভিযোগ করার মত কারো সাহস ছিল না। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তো দূরে থাক কথা বলার সাহস নেই কারো। তাদের কথায় ওই এলাকায় শেষ কথা।
কোন কৃষক বাড়াবাড়ি করলে তার ফসলহানি করতে যা যা করনীয় তাই করে থাকেন তারা। ফলে সরেজমিনে তদন্ত করলেই টাকা আত্মসাতের ঘটনা ধরা পড়বে। বিগত সময়েও এসব নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ হলেও টনক নড়েনি কর্তৃপক্ষের। চারদিক দিয়ে কৃষকদের গলা টিপে মারছে অসাধু অপারেটরেরা। শুধু এসব গভীর নলকূপে না যেখানেই আলুর প্রজেক্ট হয় সেই গভীর নলকূপে এমন ভয়াবহ দূর্নীতির চিত্র ফুটে উঠেছে । কিন্তু অসহায় হয়ে থাকে কৃষকরা।
কোন ধরনের প্রতিকার পায় না। আদিকাল থেকে এমন নিয়ম চলে আসলেও কোন প্রতিকার করেন না বিএমডিএ। অথচ নিয়োগের আগে নীতিমালা তৈরি হল কোন অপারেটর জমি লীজ দিতে পারবেন না, দিলে তার অপারেটর বাতিল হবে। কিন্তু নীতিমালা কাগজেই সীমাবদ্ধ। বিএমডিএর মেকানিক্স থেকে শুরু করে কর্তারা সব জানলেও রাজনৈতিক প্রভাবের কারনে কোন প্রতিকার নেই।
অভিযোগে উল্লেখ, উপজেলার কামারগাঁ ইউনিয়ন ইউপির এক নম্বর ওয়ার্ডে ৫ টি গভীর নলকূপ রয়েছে। এর মধ্যে মালশিরা মৌজায় তিনটি, বিহারইল মৌজায় একটি ও মির্জাপুর মৌজায় একটি গভীর নলকূপ রয়েছে। পাঁচ টি গভীর নলকূপে প্রায় ১৫০০ বিঘা আলুর প্রজেক্ট হয়ে থাকে। বিগত ২০২৪ ও ২৫ সালে পুরো জমি লিজ দেয় অপারেটরসহ তাদের সহযোগীরা। লীজের পুরো টাকা কৃষককে দেয়না। বিঘায় ৩/৪ হাজার টাকা করে কম দেয় কৃষক দের।
এভাবে তারা প্রায় কোটি টাকা আত্মসাত করেছে। কৃষক দের সাথে কোন ধরনের পরামর্শ করেনা। কোন কৃষক আলু করতে চাইলে তাকে আলু করতে দেয়া হয়না। কৃষককে না জানিয়ে তার জমি লীজ দেয়া হয়। এছাড়াও বোরো মৌসুমে বিঘা প্রতি হার ধরা হয়েছে ১৬০০ টাকা করে। অথচ অন্য গভীর নলকূপে ১১০০ টাকা থেকে ১২০০ টাকা করে নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু এরা নিজের ইচ্ছায় সবকিছু নির্ধারণ করে থাকে।
কৃষক দের দাবি অভিযোগের ভিত্তিতে সরেজমিনে তদন্ত করে আত্মসাৎ কৃত অর্থ ফেরত নিয়ে কৃষক দের মাঝে দেয়া হোক। দূর্নীতিবাজ অপারেটর পরিবর্তন করে কৃষকদের পরামর্শে অপারেটর নিয়োগ দেয়া এবং স্কীম ভুক্ত কৃষক দের নিয়ে সমিতির মাধ্যমে গভীর নলকূপ পরিচালনা করা। আর হার না সেচ কার্ডের মাধ্যমে জমিতে সেচ কার্যক্রমের ব্যবস্থা করা।
সুত্র জানায়, উপজেলা সেচ কমিটি রয়েছে। যাদের কাজ সেচ কার্যক্রমে কি পরিমান হার নির্ধারণ হবে বা কার্ডের মাধ্যমে জমিতে সেচ চলবে কিনা, বা কোন অপারেটর বাড়তি হার নিলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ সহ ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু নামে সেচ কমিটি থাকলেও বাস্তবে এর কোন কার্যকরিতা নেই।যার কারনে সেচ নিয়ে চলে নৈরাজ্য। আর বিএমডিএ এসব নিয়ে একেবারে উদাসীন।
সেচ হার বেশি নেয়ার কারনে কার্ডের মাধ্যমে জমিতে সেচ দেয়ার ব্যবস্থা করা হলেও প্রান্তিক কৃষকরা এর সুবিধা থেকে বঞ্চিত। সেচ হার নিয়ে বিএমডিএর কিছুই করনীয় থাকেনা। আর বিএমডিএর কিছু মেকানিক্স বড় ইঞ্জিনিয়ার। তারা আসেন আর যান। কখনো তাদেরকে মাঠে পাওয়া যায়না। আবার বসে বসে চলে রাজনীতি।
অভিযুক্ত অপারেটরের চাচা সুলতান, মিলন, জয়নালসহ তারা জানান, অভিযোগ কারী আগে ছিল আ”লীগ। এখন হয়েছে জামায়াত। তার কাছ থেকে অনেকে টাকা পাবে এসব আড়াল করতে মিথ্যা অভিযোগ দিয়েছে। তার বিরুদ্ধে আমরাও ব্যবস্থা নিব। আপনারা গভীর নলকূপ নিয়ে দীর্ঘ দিন ধরে নৈরাজ্য করে আসছেন ও জমি লীজের টাকা কৃষক দের দেননা জানতে চাইলে তারা এসব মিথ্যা বলে উড়িয়ে দেন।
অভিযোগ কারী সালাম জানান, আমি কোন দল করতাম কি করতাম সেটাতো জমি লীজের সাথে সম্পর্ক নাই। তারা জমি লীজের পুরো টাকা না দিয়ে আত্মসাৎ করেছে৷ আমার কাছ থেকে কেউ টাকা পেলে আমি দেখব এটা নিয়ে তাদের মাথা ব্যথা কেন। আমি অভিযোগ দেয়ার পর এমপি সাহেবকে সব বলেছি। আশা করছি নব নির্বাচিত এমপির মাধ্যমে আত্মসাৎ কৃত টাকা কৃষক রা ফেরত পাবে এবং শোষনকারীদের হাত থেকে গভীর নলকূপ কৃষকদের হাতে আসবে । তবে যদি কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হয় তাহলে মানববন্ধন সহ নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে।
বিএমডিএর সহকারী প্রকৌশলী (অতিরিক্ত) জামিনুর রহমানের কাছে এসব বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, আজকে এমপি মহোদয়ের সভায় এসব নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আমাদের নিয়ম কার্ডে সেচ দিতে হবে। কিন্তু কৃষক যদি মনে করে হারে সুবিধা বেশি তাহলে সেটাও করতে পারে।কিন্তু কার্ডেই প্রযোজ্য।
নিয়োগের আগে নীতিমালা ছিল কৃষকের জমি লীজ দিতে পারবেনা অপারেটর তাহলে কিভাবে লীজ দিয়ে টাকা আত্মসাত করে জানতে চাইলে তিনি জানান, সবকিছুই ঠিক আছে, কিন্তু রাজনীতির কারনে কোন কিছুই প্রয়োগ করা যাচ্ছে না। আজ এমপি ইউএনও র মিটিংয়ে আলোচনা হয়েছে। প্রতি নিয়তই এমন অভিযোগ আসতেই আছে আশা করছি সবকিছু অল্প সময়ের মধ্যে দূর হবে।
নির্বাহী অফিসার ইউএনও নাঈমা খান জানান, অভিযোগ পাওয়ার পর বিএমডিএকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বলা হয়েছে।