ঃ মোঃ সেলিম মিয়া ঃ প্রথমেই কৃষকের পক্ষ থেকে নতুন তথা কৃষকবান্ধব, দেশ দরদী সরকারের প্রতি আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের আগ মুহূর্তে কৃষকের গুরুত্বের কথা চিন্তা করে কৃষকের ভাগ্য উন্নয়নের স্বার্থে কৃষি ও ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার কথা বলেছিলেন এবং নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব প্রাপ্ত হয়ে শত ব্যস্ততার মধ্যে পরদিনই কার্ডের বিষয়ে কাজ শুরু করেন। এতে কৃষককুল খুবই খুশি ও আনন্দিত।

বাংলাদেশ কৃষি নির্ভর দেশ। এ দেশে প্রায় ৮০ ভাগ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কৃষির সহিত জড়িত। খাদ্য ছাড়া কারো বাঁচার উপায় নেই। সেই খাদ্য উৎপাদন করেন সোনার বাংলার সোনার কৃষক। সবাই বলেন, কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে, কৃষক হাসলে দেশ হাসবে। ১৯৬৪ সালে পাবনায় প্রাদেশিক কৃষক সম্মেলনের ভাষণে মাওলানা ভাসানী বলেন ‘কৃষকেরা দুনিয়ার লোকের আহার জোগায় অথচ সমাজে কৃষকের স্থান নেই’। আজও সেই কৃষকের কাঙ্খিত উন্নতি হয়নি।

তাঁরা বরাবরই অবহেলিত ও সুবিধা বঞ্চিত হয়ে আসছেন। বিগত সরকার কৃষি খাতে যেটুকু প্রণোদনা ও ভর্তুকি দিয়েছিল, সেটাও অনেক কৃষকের ভাগ্যে জোটেনি, গেছে আমলাদের পেটে। তারপরও কৃষক থেমে থাকেনি, স্বাধীনতার ৫৫ বছরে দেশে অনেক কৃষি জমি কমেছে, জনসংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে অনেক।

এ প্রতিকূল অবস্থার মোকাবিলায় বিশেষ করে চরাঞ্চলের কৃষক সকাল হতে সন্ধ্যা পর্যন্ত মাঠে খেটে, পিটের চামড়া পুড়ে ধান, পাট, গম, ভূট্টা, বাদাম, কলাই, রসুন, পিঁয়াজ, মরিচ, টমেটো, সিম, আলুসহ বিভিন্ন তরিতরকারি ও রবিশস্য উৎপাদন করে, মৎস্য চাষ, গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি পালন করে দেশের মানুষের খাদ্য ও পুষ্টির জোগান দিচ্ছেন এবং দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। অথচ তাঁদেরকে সর্বদাই প্রাকৃতিক দুর্যোগের সহিত লড়াই করে টিকে থাকতে হয়। এ বিষয়ে কারো মাথা ব্যাথা নেই।

চরাঞ্চলে অভাবি মানুষের সংখ্যাই বেশি। এখনো অনেকে ধার-দেনা করে এবং গ্রাম্য মহাজনের নিকট চড়া সুদে ঋণ নিয়ে আবাদ করেন। দেখা যায় ঋণ পরিশোধ করতে বাধ্য হয়ে অনেকেই জমিতেই ফরিয়া দালালের নিকট স্বল্প মূল্যে ফসল বিক্রয় করে ন্যায্য মূল্য হতে বঞ্চিত হন।

কেহ ঋণ পরিশোধ করতে না পেরে হতাশ হয়ে আত্মহত্যার পথও বেঁচে নেন। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে মাসে ১.৮ জন কৃষক আত্মহত্যা করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আমাদের দেশে অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি কৃষির বিকল্প কোনো প্রাকৃতিক সম্পদ দৃশ্যমান নেই। দেশকে আর্থ-সামাজিকভাবে টেকসই ও শক্তিশালী করতে হলে কৃষকদেরকে আত্মনির্ভরশীল ও শক্তিশালী করতে হবে।

কৃষক যাতে সরাসরি প্রণোদনা-ভর্তুকি পান, ভেজাল মুক্ত সার, বীজ, কীটনাশক ও বিদ্যুৎ সুবিধাসহ কৃষি উপকরণ সমুহ এবং সহজে স্বল্প সুদে কৃষি ঋণ পান সেজন্য কার্যকর দৃষ্টি রাখতে হবে। এতে রোধ হবে আত্মহত্যা, দেশ হবে অর্থনীতিতে শক্তিশালী।

উপনিবেশবিরোধী লড়াই, মুক্তিযুদ্ধ থেকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সবচেয়ে বেশি জীবন দিয়েছে কৃষক পরিবারের মানুষেরা। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে বৈষম্য ও বঞ্চনা দুর করার কথাসহ বিভিন্ন বিষয় কথা থাকলেও কৃষকের কোনো কথা গুরুত্ব পায়নি এবং কৃষি ও ভূমি ব্যবস্থাপনার কোনো কমিশন গঠন হয়নি। কৃষকেরা বিশ^াস করেছিল অন্তর্বতী সরকার তাঁদের দুঃখ কষ্ট বুঝবেন, কিন্তু তা হয়নি। কৃষকের কোনো ছুটি নেই। করোনাকালীন সময়ে অফিস-আদালত ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ বন্ধ ছিল।

সকলে লকডাউনে ঘরে বসে থেকেও বেতন-ভাতা পেয়েছেন। তখনও কৃষক ঘরে বসে থাকেননি জীবনবাজি রেখে মৃত্যুর ঝুঁকি মাথায় নিয়ে মাঠে খেটে গায়ের ঘাম জমিনে ফেলে দেশের মানুষের খাদ্য ও পুষ্টির জোগান দিয়েছেন এবং নিজের জীবন চাকা উপেক্ষা করে দেশের চাকা সচল রেখেছেন। সেই কৃষক মাঠে বসে মোটা চালের ভাত খায়, একটি ভাতও অপচয় করেন না।

কৃষকের উৎপাদিত চিকন চালের ভাত অনেকে ডাইনিং এ বসে খান আরামে। তারা জানেন না খাদ্য উৎপাদনে কত কষ্ট। আমাদের দেশে চাকরিজীবীরা নিয়মানুযায়ী ছুটি, স্বল্প সুদে ঋণ সুবিধা, দুই ঈদে ও পূজায় বোনাস, বৈশাখী ও ঝুঁকি ভাতা পেয়ে থাকেন।

এছাড়াও ভোটের ও ইজতেমার ডিউটিসহ বিভিন্ন ডিউটি করলে অতিরিক্ত টাকা পেয়ে থাকেন। চাকুরি শেষে মোটা অঙ্কের গ্র্যাচ্যুইটি পান। চাকুরিজীবী মারা গেলে পর্যায়ক্রমে স্ত্রী ও প্রতিবন্ধী সন্তান পেনশন পেতে থাকেন। ইমাম-মুয়াজ্জিন সাহেবেরাও ভাতা পেতে যাচ্ছেন। কৃষক কি পায়! তাঁদের কি কিছু পাওয়ার অধিকার নেই?

কৃষকের মনঃকষ্ট তাঁরা মাঠে কাজ করতে বজ্রপাতে, সর্প দংশনে, বিদ্যুৎপিষ্টে, গুলি খেয়ে মৃত্যুবরণ করলে, পঙ্গু হলে, তাদের গবাদি পশু মারা গেলে, প্রাকৃতিক দুর্যোগে অথবা উপকরণ জনিত কারণে ফসলহানি হলে, বাড়ি পুড়িয়ে গেলে, নদী ভাঙনে সর্বশান্ত হলে এবং শেষ বয়সে বিনা চিকিৎসায় মারা গেলে কি পান তাঁরা!

কৃষি ও কৃষকের উন্নয়নের জন্য দেশে কোথায় কি গবেষণা হয়, তাও কৃষক জানেন না। বাংলাদেশের জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউটের এক গবেষণায় (২০১৭) জানা যায় ক্যান্সার রোগীদের মধ্যে প্রায় ৬৪ শতাংশই কৃষক।

তাই শুধু কৃষি নির্ভর কৃষকের গভীর প্রত্যাশা ও বিশ্বাস নতুন সরকার অন্তত বৈশাখী ও বিশ্ব খাদ্য দিবস বছরে এই দুটি ভাতা প্রদানের ব্যবস্থা করবেন। ভাতা দুটি পেলে দুর হবে কৃষকের মনঃকষ্ট, তাঁরা আরো উৎসাহিত হয়ে অধিক ফসল উৎপাদন করবেন। দেশ হবে উন্নত ও উন্নয়নশীল। বিমোচন হবে দারিদ্রতা।

লেখক ঃ মোঃ সেলিম মিয়া, স্বাধীন ভূমি গবেষক ও লেখক, পরিচালক- তথ্য ও গবেষণা কনসোর্টিয়াম অফ স্ট্রাটেজিক সল্যুশন লিঃ, সদস্য-বাংলাদেশ কৃষি ঐক্য ফাউন্ডেশন।