রাজশাহীর তানোরে প্রায় শতাধিক গভীর নলকূপের অপারেটরদের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম দূর্নীতি ও দলবাজি, অতিরিক্ত সেচ হার, জমি লীজের টাকা আত্মসাত সহ বিভিন্ন বিষয়ে দীর্ঘ দিন ধরে অভিযোগ করে আসছেন ভুক্তভোগী কৃষকরা।

অভিযোগের ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার সকাল থেকে উপজেলা প্রশাসনের সভাকক্ষে হয় তদন্ত। তবে তদন্তে কোন ধরনের সমাধান না করে আইওয়াশ করা হয়েছে বলে দাবি অভিযোগ কারীদের। তদন্ত করেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার ইউএনও নাঈমা খাঁন ও বিএমডিএর সহকারী প্রকৌশলী (অতিরিক্ত) জামিনুর রহমান।

তদন্ত শেষে বের হওয়ার পর উপজেলা প্রশাসনের গেটের সামনে ও মিলনায়তনের সামনে অপারেটর ও কৃষক দের মাঝে হট্টগোল সহ এক ধরনের মব সৃষ্টির ঘটনাও ঘটে। তদন্ত শেষে অপারেটরেরা তুষ্ট হলেও অসন্তোষ প্রকাশ করেন কৃষকরা। ফলে এধরনের তদন্তের মাধ্যমে অপারেটর দের অনিয়মকে বৈধতা দেয়া ছাড়া কিছুই না বলে অভিমত কৃষক দের।

জানা গেছে, গত জুলাই গণঅভ্যুত্থান আ”লীগ সরকার পতনের পর থেকে উপজেলার গভীর নলকূপ গুলো দখলে নেয় বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীরা। ৫ আগষ্টের পর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত তারা গভীর নলকূপ ইচ্ছে মত পরিচালনা করেন।

বিএমডিএর কোন লোকজন গভীর নলকূপের আশপাশে যাননি। ডিসেম্বর মাসের শেষের দিকে বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীরা অপারেটর হিসেবে নিয়োগ পায়। নিয়োগের আগে এক গাদা নিয়ম জারি করে বিএমডিএ। এক বছরের জন্য নিয়োগ, প্রতি বছর হবে নিয়োগ, যিনি অপারেটর হিসেবে নিয়োগ পাবে তাকে রাতে গভীর নলকূপে থাকতে হবে।

কৃষকের জমি অপারেটর লীজ দিতে পারবেনা, বহিরাগতরা পাবেনা নিয়োগ, কোন অপারেটরের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তাকে বাতিল করা হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু কাগজে কলমে নীতিমালা থাকলেও বাস্তবে বছর অতিবাহিত হলেও কোন পদক্ষেপ নিতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। এমনকি অপারেটর হিসেবে নিয়োগ পেলেও এখন পর্যন্ত গভীর নলকূপ বুঝে পায়নি অনেকে এমন অভিযোগ তদন্তে করলেও কোন প্রতিকার পায়নি। এসব নিয়ে কোন মাথা ব্যথা নেই বিএমডিএর।

গত ১২ ফেব্রুয়ারী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকে শোষণ কারী দূর্নীতিবাজ অপারেটরদের বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগ আশা শুরু করে। সেচ হার অতিরিক্ত, জমি লীজের কোটি টাকা আত্মসাত, সঠিক ভাবে সেচ না দিয়ে ফসলহানি, তুচ্ছ বিষয়ে অতিরিক্ত টাকা আদায়সহ নানা বিষয়ে অভিযোগ হয় নির্বাহীর দপ্তর ও বিএমডিএ অফিসে।

ফেব্রুয়ারী মাসের শেষের দিকে উপজেলা আইন শৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভায় যোগদেন নব নির্বাচিত এমপি অধ্যাপক মুজিবুর রহমান। তিনি এসব অভিযোগের বিষয় গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলেন। এরই প্রেক্ষিতে ও এমপিকে খুশি করতে ইউএনও ও বিএমডিএর সহকারী প্রকৌশলী তদন্ত করেন।

অভিযোগ কারী ও কৃষক রা জানান, উপজেলা প্রশাসনের সভাকক্ষে হয় তদন্ত। তদন্ত হলেও অভিযোগ কারীদের কথায় শোনা হয় নি। নামমাত্র দুএকজনের কথা শেনা হলেও কোন সমাধান দেয়া হয়নি। উল্টো অপারেটরদের সাথে সমন্বয় করে কৃষক দের কাজ করতে বলা হয়েছে। কোন সেচ হার নির্ধারণ করা হয়নি। শুধু মাত্র এমপির কথা রাখতে নামে তদন্ত করা হয়েছে।

স্পর্শ কাতর অভিযোগ থাকলেও কোন প্রতিকার হয়নি। আবার কামারগাঁ ইউনিয়ন ইউপির ১ নম্বর ওয়ার্ডে ৫ টি গভীর নলকূপে আলুর জমি লীজ দেয়ার নামে কোটি টাকা আত্মসাত করা হয়েছে। এঘটনায় আব্দুস সালাম নামের এক কৃষক বাদী হয়ে অভিযোগ দিলেও তদন্তে ডাকা হয়নি তাকে বলেও জানান আব্দুস সালাম।

তদন্ত শেষে বের হয়ে বাঁধাইড় ইউপির গাল্লা বৈদ্যপুর এলাকার কৃষক ওমর অপারেটরের বিরুদ্ধে অভিযোগ করার কারনে অপারেটর সহ তার লোকজন ওমরকে লাঞ্ছিত করে মব সৃষ্টি করে।

চান্দুড়িয়া ইউপির গাগরন্দ এলাকার কৃষকরা জানান, অপারেটর আল আমিনের বিরুদ্ধে নানা অজুহাতে টাকা আদায়ের বিষয়ে অভিযোগ করা হয়েছিল। আল আমিন বোরো হার নিচ্ছে ১৪০০ টাকা করে, মটর বাবদ আলু চাষীদের কাছ থেকে ৬০০ টাকা, বোরো চাষীদের কাছ থেকে ৬০০ টাকা, প্রতি ঘন্টায় বাড়তি ৩০০ টাকা, খাবার পানি মাথা প্রতি ২০ টাকা করে নেয়। এভাবেই প্রায় গভীর নলকূপে আদায় করা হচ্ছে কাড়িকাড়ি টাকা। এছাড়াও মাদারিপুর বাজারে অবস্থিত গভীর নলকূপের অপারেটর ফজর আলী বোরো চাষের হার নির্ধারণ করেছেন বিঘায় ১৭০০ টাকা করে।

সুত্র জানায়, সেচ হার নেয়ার কোন বিধান নেই অপারেটরদের। কারন সেচ কার্ডের মাধ্যমে সেচ কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। কার্ডের মাধ্যমে সেচে রয়েছে ভর্তুকি। সেই ভর্তুকিও গিলছে অপারেটর আর বিএমডিএ।

আবার মটরসহ কোন খুঁটি নাটি বিষয় মেরামত করা লাগলেই কৃষকের কাছ থেকে আদায় করা হয় বাড়তি টাকা। অথচ একটা গভীর নলকূপে মটর মেরামত তোলা নামানোসহ যাবতীয় খরচ হয় ৮ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকার মত। কিন্তু এসব দোহায়ে পকেট কাটা হয় কৃষকের।

বিএমডিএর সহকারী প্রকৌশলী (অতিরিক্ত) জামিনুর রহমানের কাছে জানতে চাওয়া হয় কতটা গভীর নলকূপের অভিযোগের তদন্ত হল তিনি জানান, ৩০ টির মত। কোন এলাকার বেশি জানতে চাইলে তিনি জানান, কামারগাঁ ইউনিয়ন ইউপি এলাকায় বেশি রয়েছে। তদন্তের নামে নাকি আইওয়াশ করা হয়েছে এবং অভিযোগ কারীদের কথা শোনা হয়নি, জানতে চাইলে তিনি জানান তদন্ত শুরু হয়েছে ধীরে ধীরে সবকিছু নিয়মের মধ্যে আসবে।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার ইউএনও নাঈমা খাঁন, অপারেটর ও কৃষকদের বলেন, এখন আলু আবাদ আছে, আলু উত্তোলনের পর ইরো বোরো রোপন করবে। এজন্য সবাই কে এক হয়ে কাজ করতে হবে। কৃষক ও অপারেটর একে অন্যের পরিপোরক হতে হবে ।

তাহলে ছোট খাটো বিষয়গুলো দূর হয়ে যাবে। তবে এরপরে কোন অপারেটরের বিরুদ্ধে কোন অনিয়ম ও দূর্নীতি সেচ্ছাচারিতার বিষয়ে অভিযোগ পেলে ছাড় দেয়া হবে না।