সিরাজগঞ্জে প্রতিবারের মতো এবারও রোজার শুরু থেকেই ইফতার আয়োজনে ঐতিহ্যবাহী ‘সলপের ঘোল- মাঠা’র কদর পাচ্ছে। রোজার প্রথম দিন থেকেই গ্রাম কিংবা শহরের ফুটপাত থেকে শুরু করে অভিজাত ও প্রসিদ্ধ দই মিষ্টির দোকানগুলোতে প্লাস্টিকের বোতল ও অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়িতে ঘোল সাজিয়ে বসছেন দোকানিরা।
সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় তৈরি সুস্বাদু পানীয় খ্যাতি পেয়েছে ‘সলপের ঘোল’ মাঠা নামে। শুধু চলনবিল ও যমুনা নদীবেষ্টিত এই জনপদে নয়, দূরদূরান্তে ছড়িয়ে আছে সলপের ঘোলের সুনাম। আর এই ঘোল মাঠার নাম সরকারি ভাবে জি.আই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতির দাবি করে আসছেন সিরাজগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স।
সরেজমিনে জানাগেছে,ভোর আরো ফুটতেই স্থানীয় খামারিদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা দুধ নির্দিষ্ট সময় জ্বাল দিয়ে জমিয়ে রাখা হয় সারা-রাত। পরের দিন বিশেষ প্রক্রিয়ায় তৈরী হয় সুস্বাদু একটি পানীয়।
সিরাজগঞ্জের সলপ রেল স্টেশনে তৈরী সুস্বাদু এ পানীয় খ্যাতি পেয়েছে ‘সলপের ঘোষ,মাঠা হিসেবে। সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার সলপের সুস্বাদু পানীয় হিসেবে বাঙালিদের কাছে ঘোল ও মাঠার এখনো ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। তবে রমজান এলে চাহিদা বেড়ে যায় দ্বিগুণ। পাশাপাশি দামও বাড়ে বেশ। এ জনপদে ইফতারের অন্যতম অনুষঙ্গ সলপের ঘোল, সিরাজগঞ্জ ছাড়াও স্বাদ নিচ্ছেন দেশের নানা জায়গার মানুষ। এই পানীয় বিক্রি করে অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী জীবন-জীবিকা চালিয়ে যাচ্ছেন।
স্থানীয়দের সূত্রে প্রকাশ,শতবর্ষী এ ব্যবসার শুরু ১৯২০ সালে। ব্রিটিশ শাসনামলে উল্লাপাড়ার সলপ এলাকায় রেলওয়ে স্টেশন নির্মাণ করা হয়। এর দুই বছর পরে ১৯২২ সালে এ স্টেশনের পাশেই ঘোল ও দধির ব্যবসা শুরু করেন স্থানীয় সাদেক আলী খান।
তার মৃত্যুর পর ব্যবসার হাল ধরেছেন দুই ছেলে আব্দুল খালেক খান ও আব্দুল মালেক খান। সেই থেকে এখানকার তৈরি সুস্বাদু পানীয় শুধু চলনবিল ও যমুনা নদীবেষ্টিত এই জনপদে নয়, দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে আছে সলপের ঘোলের সুনাম।
রোজার প্রথম দিন থেকেই গ্রাম কিংবা শহরের ফুটপাত থেকে শুরু করে অভিজাত ও প্রসিদ্ধ দই মিষ্টির দোকানগুলোতে প্লাস্টিকের বোতল ও হাঁড়িতে ঘোল সাজিয়ে বিক্রি করছেন ছোট-বড় মৌসুমী ব্যবসায়ীরা।
সলপ এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, স্টেশনের পাশে ঘোলের দোকানগুলোতে কেনা-বেচা জমে উঠেছে। দোকানের সামনে অ্যালুমিনিয়ামের পাত্র সাজিয়ে চলছে বিক্রি। দোকানের পেছনে শ্রমিকেরা ঘোল তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। অনেকেই দূর-দূরান্ত থেকে এই ঘোলের জন্য এখানে এসেছেন।
ঘোল তৈরির কারিগররা বলেন, প্রতিদিন সুর্য্য ওঠার আগেই গ্রামের খামারিদের কাছ থেকে গরুর দুধ সংগ্রহ করে আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা জ্বাল দেওয়া হয়। নির্দিষ্ট সময় জ্বাল দেওয়ার পর পাত্রে রেখে সারা রাত রাখা হয় সেই দুধ। সকালে জমে থাকা সেই দুধের সঙ্গে চিনি ও অন্য উপকরণ মিশিয়ে তৈরি করা হয় এ সুস্বাদু পানীয়।
ঘোল বিক্রেতারা বলেন, প্রতিদিন সলপ এলাকায় ১৭০ থেকে ২০০ মণ ঘোল ও মাঠা বিক্রি হয়। বর্তমানে প্রতি লিটার ঘোল ৬০ টাকা ও মাঠা ৮০ টাকায় পাইকারি বিক্রি হচ্ছে। তবে জেলা শহরসহ প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রতি লিটার ঘোল ১০০ টাকা, মাঠা ১২০ থেকে ১৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ঘোল তৈরির উপকরণ দুধ ও চিনির দাম বাড়ার কারণে এ ঘোলের দাম গতবারের চেয়ে এবার বেড়েছে।
সলপ ঘোল ঘর অ্যান্ড সাদেক খান দই ঘরের স্বত্বাধিকারী আব্দুল মালেক খান জানান, তাদের এ ব্যবসার সঙ্গে বহু মানুষের জীবন-জীবিকা জড়িয়ে গেছে। এখান থেকে কাজ শিখে কারিগররা উপজেলাতেই নিজেরাও দোকান তৈরী করেছেন। স্বাদ ও মান অনুযায়ী এ ঘোলের দাম তুলনামূলক সস্তা বলে মনে করেন ক্রেতারা। তাই সুস্বাদু এ পানীয় কিনতে তারা এখানেই আসেন। পরিবহণ যোগে পাঠানো হয় দেশের বিভিন্ন স্থানে।
সোহেল রানা মিলন নামে এব ব্যভসায়ির মতে,রোজার প্রথম থেকে তারা প্রতিদিন ১৫০ থেকে ২০০ লিটার ঘোল ও মাঠা এলাকায় বিক্রির জন্য নিয়ে যাই। এই রজমানে ঘোল ও মাঠার বেশ চাহিদা। গরমে রোজা রেখে এক গ্যাস সলপের ঘোল পান রোজাদারকে তৃপ্তি দেয়।
বিক্রেতারা আরও বলেন, গাজীপুরে সলপের ঐতিহ্যবাহী ঘোলের প্রচুর চাহিদা রয়েছে। অল্প দামে ভালো মানের ঘোল ও মাঠা পেয়ে গ্রাহকরাও খুশি। বিশেষ করে রমজানে চাহিদা আরও বেড়েছে।
স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তি আনছার আলী, আমজাত শেখ ও আব্দুল কাদের জানান, এক সময়ে সলপের তৈরি ঘোল ভারতের কলকাতার মানুষের কাছেও বেশ জনপ্রিয় ছিল। ট্রেনে করে প্রতিদিন ঘোল চলে যেতো কলকাতায়।
সলপের ঘোলের বিষয়ে স্থাণীয় চিকিৎসকদের মতে, ঘোল বা মাঠা অত্যন্ত পুষ্টিগুণ সম্পন্ন একটি পানীয়। এ পানীয়তে ক্যালসিয়াম, আয়রন, ভিটামিন, উপকারী ব্যাকটেরিয়া থাকে, যা শরীরের জন্য ভালো। এটি উচ্চ রক্ত চাপ,কোলেস্টেরল ও ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে, হজমে সহায়তা করে। ক্লান্তি, দুর করে প্রশান্তি আনে, মেজাজ ফুরফুরে রাখে। এ কারণে যুগ যুগ ধরে মানুষ এ পানীয় পান করে আসছেন।
এবিষয়ে সিরাজগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ড্রাষ্টির প্রেসিডেন্ট সাইদুর রহমান বাচ্চু বলেন, শতবছরেরও অধিক সময় ধরে সিরাজগঞ্জের সলপের ঘোল মাঠা নুনামের সাথে দেশের সকল জেলায় বিক্রি হয়ে আসছে। ঘোরের কালার এবং স্বাদ ও মানের কারনে তিনি এটিকে জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার জন্য সরকারের প্রদি জোর দাবি জানান।