এপ্রিলের এই সময়ে কুষ্টিয়ার মিরপুর, ভেড়ামারা ও দৌলতপুর উপজেলার বিদ্যালয় প্রাঙ্গনগুলোতে শিশুদের কলকাকলিতে মুখরিত থাকার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবতা এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন। স্কুলের বারান্দা ও খেলার মাঠ ছেড়ে এই অঞ্চলের শত শত শিশু এখন ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে তামাকের ঝাজালো ধোঁয়া আর আঠালো পাতার স্তূপে।
অধিক লাভের আশায় কৃষকের আবাদ করা ‘বিষবৃক্ষ’ তামাকের প্রক্রিয়াজাতকরণে ব্যবহৃত হচ্ছে ৮ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুরা। ব্রিটিশ আমেরিকান ট্যোব্যাকোসহ (বিএটিবি) বিভিন্ন তামাক কোম্পানীর প্রলোভন আর পরিবারের অসচেতনতায় হুমকির মুখে পড়ছে এই শিশুদের শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ।
সরেজমিনে মিরপুর উপজেলার হাজরাহাটী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৮ম শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. স্বাধীন শেখের সাথে কথা বলে জানা যায়, প্রতিদিন ৬০০ টাকা ও খাবারের বিনিময়ে সে তামাক সংগ্রহের কাজ করছে। ৫ শ্রেণির ছাত্র মাহিন কিংবা ৪ শ্রেণির মোহাম্মদ আলী- সবার চিত্রই এক। পরিবারের আগ্রহেই তারা স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে তামাকের বোঝা টানা, পাতা বাছাই এবং চুল্লি জ্বালানোর কাজে নিয়োজিত হয়েছে শিশুরা।
বাংলাদেশ শ্রম আইন (২০১৮) এবং আইএলও কনভেনশন ১৩৮ অনুযায়ী কারখানায় শিশুশ্রম এবং ঝুঁকিপূর্ণ কাজে ১৮ বছরের কম বয়সীদের নিয়োগ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। অথচ কুষ্টিয়ার প্রতিটি ঘরে ঘরে শিশুদের দিয়ে তামাকের গ্রেডিং করানো হচ্ছে কোনো ধরনের মাস্ক বা দস্তানা ছাড়াই।
আইনের তোয়াক্কা না করে তামাক কোম্পানীগুলোর অতিরিক্ত মুনাফার আশায় শিশুদের ঠেলে দিচ্ছে এক অনিশ্চিত অন্ধকারের দিকে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি ২০২৫-২৬ রবি মৌসুমে কুষ্টিয়ায় তামাকের চাষ আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। গত বছরের তুলনায় আরও ৪৫৪ হেক্টর জমিতে তামাক চাষ বেড়ে এবার মোট ১১,৩৮৫ হেক্টর জমিতে তামাক চাষ করা হয়েছে। লাভজনক বাজারমূল্য এবং কোম্পানিগুলোর লোভনীয় প্রণোদনার মুখে কৃষকরা খাদ্যশস্য বাদ দিয়ে তামাক চাষে ঝুঁকছেন, যা পরোক্ষভাবে শিশুদের এই শ্রমে যুক্ত হতে বাধ্য করছে।
তামাকের এই সান্নিধ্য শিশুদের জন্য কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তা নিয়ে সতর্ক করেছেন কুষ্টিয়া ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. হোসেন ইমাম। তিনি বলেনেছেন,”তামাক চাষে সংশ্লিষ্ট শিশুদের দীর্ঘ মেয়াদে শ্বাসকষ্ট, ফুসফুসের ক্যানসার, লিভার সিরোসিস ও চর্মরোগসহ নানাবিধ মরণব্যাধি হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। এদের দ্রুত এই কাজ থেকে সরিয়ে আনা না হলে আগামী প্রজন্ম এক ভয়াবহ স্বাস্থ্য সংকটে পড়বে।
বিষয়টি নিয়ে কুষ্টিয়া জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালক আব্দুল লতিফ শেখ জানান, তাদের হাতে তামাকের কাজে জড়িত শিশুদের সরাসরি পুনর্বাসনের কোনো সুনির্দিষ্ট প্রোগ্রাম নেই। তারা কেবল সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে উঠান বৈঠক করছেন।
তবে জেলার সচেতন মহলের দাবি, কেবল পরামর্শ দিয়ে এই সংকট সমাধান সম্ভব নয়, প্রয়োজন কঠোর আইনি পদক্ষেপ।
এদিকে, শিশুশ্রমের অভিযোগের বিষয়ে ব্রিটিশ আমেরিকান ট্যোব্যাকোর (বিএটিবি) কুষ্টিয়া অফিসের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তাদের পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
কুষ্টিয়ার এই অবুঝ শিশুরা জানে না তামাকের বিষ তাদের ফুসফুস কতটা ক্ষয় করছে। শিক্ষাবর্ষের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তারা যখন তামাকের পাতা বাছাইয়ে ব্যস্ত, তখন রাষ্ট্র ও সমাজ কি পারবে তাদের আবার ক্লাসরুমে ফিরিয়ে নিতে? এই প্রশ্নই এখন সচেতন মহলের মনে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।