বিদেশি ফল হিসেবে পরিচিত আঙুর এখন দেশেই চাষ করে সফল হয়েছেন পীরগঞ্জের তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা তাওহিদ মিয়া(মেজবা উদ্দিন)। পীরগঞ্জে দৃষ্টিনন্দন এক আঙুর বাগান এখন সবার নজর কাড়ছে। এমন বাগান তৈরি করে এখন আলোচনায় রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার মিলনপুর গ্রামের তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা তাওহিদ মিয়া(মেজবা উদ্দিন)।
স্থানীয়রা জানান, তাদের ধারণা ছিল, বিদেশি ফল আঙুর দেশে চাষ করলে টক হয়। তাওহিদ সেই ধারণা পাল্টে দিয়েছেন। বাঁশ ও প্যারাসুট সুতায় তৈরি মাচাজুড়ে লতানো গাছ। সবুজ পাতার মাঝ দিয়ে উঁকি দিচ্ছে কোথাও লম্বা, কোথাও গোলাকার হালকা বাদামি, হলুদ-সবুজ রঙের থোকা থোকা আঙুর। সড়কের পাশে বাগানটি দেখলে যে কারও চোখ আটকে যাবে। বাঁশের মাচায় লতানো গাছে থোকা থোকা আঙুরÑযা দেখে থমকে দাঁড়াচ্ছেন পথচারীরা।
তাওহিদ মিয়া বলেন-১১ মাস আগে ৮ জাতের আঙুরের চারা সংগ্রহ করে পরীক্ষামূলকভাবে নিজের ২৪ শতক জমিতে চাষ শুরু করেন। প্রতিবেশী ও দর্শনার্থীরা মিষ্টি সেই আঙুর খাওয়ার পর সাড়া পড়ে যায়। বর্তমানে তাঁর বাগানে ৮ জাতের আঙুরের ৩৪০টি গাছ রয়েছে। এর মধ্যে বাইকুনুর, অ্যাকোলো ও ব্ল্যাক ম্যাজিক জাতের ফলন ভালো।
এ বছর সবচেয়ে বেশি ফল ধরেছে রাশিয়ান বাইকুনুর জাতের আঙুরে। এ জাতটি দেশের আবহাওয়ায় চাষের উপযোগী হতে পারে। চলতি মাসেই সব জাতের আঙুর বাজারজাতের উপযোগি হবে। এসব আঙুর দেখতে যেমন সুন্দর, খেতেও মজার। মিষ্টি এবং হালকা টক-মিষ্টি দুই ধরনের আঙুরই রয়েছে।
তাওহিদ মিয়া জানায়, আঙুরের চারা, মাচা, পরিচর্যাসহ সব মিলিয়ে তাঁর খরচ পড়েছে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা। রোপণের এক বছর পরই আঙুর বাজারজাত করা সম্ভব। প্রতিটি গাছ থেকে ফলন মেলে ৮-১০ কেজি। বাজারজাতের করে খরচ মিটিয়ে ৪/৫ লাখ টাকা আয় সম্ভব।
কৃষি বিভাগের তথ্যমতে,বাংলাদেশের আবহাওয়া উপযোগী উন্নতমানের আঙুর চাষে কীটনাশক ও রাসায়নিক সারের প্রয়োজন হয় না। গোবর বা জৈব সার এবং পোকামাকড় ঠেকাতে কীটনাশক ভারমিটেক ব্যবহার করে ভালো ফলন পাওয়া যায়।
কয়েক বছর ধরে আঙুর চাষ করে লাভবান রামনাথপুরের মাসুদ তালুকদার বলেন,বাগানে প্রচুর আঙুর ধরেছে। মিষ্টি আনেক তাই বাজারে চাহিদাও বেশি। আমরা চাষীরা এ ফল চাষ করে দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রফতানী করতে পারবো। এদিকে স্থানীয় বাজারেও পীরগঞ্জের আঙুরের চাহিদা বাড়ছে। বাজারে বিদেশি আঙুরের তুলনায় স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত আঙুর তাজা ও তুলনামূলক সস্তা হওয়ায় ক্রেতারা আগ্রহ দেখাচ্ছেন।
এতে কৃষকরা সরাসরি লাভবান হচ্ছেন। তবে আঙুর চাষে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। বিশেষ করে অতিরিক্ত বৃষ্টি, রোগবালাই এবং বাজারজাতকরণের সমস্যার কারণে অনেক সময় কৃষকরা ঝুঁকিতে পড়েন। এছাড়া প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও মানসম্পন্ন চারা না থাকাও একটি বড় বাধা। এসব সমস্যা সমাধানে সরকারি ও বেসরকারি সহায়তা প্রয়োজন বলে মনে করছেন কৃষকরা।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ সুমন আহমেদ জানান, “আঙুর একটি উচ্চমূল্যের ফল। দেশে আঙুরের বাজার পুরোটাই বলতে গেলে আমদানিনির্ভর। আমরা চাই কৃষকরা যেন নতুন নতুন ফসল চাষে এগিয়ে আসে। তাওহিদের মতো কৃষি উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে অন্য কৃষকরা আঙুর চাষে উৎসাহিত হলে দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি করাও সম্ভব।
পীরগঞ্জে আঙুর চাষের প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে,তাই আমরা কৃষকদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দিয়ে যাচ্ছি।” তিনি আরও জানান, ভবিষ্যতে বাণিজ্যিকভাবে বড় পরিসরে আঙুর চাষ শুরু হলে এটি স্থানীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ইতিমধ্যে উপজেলার ভেন্ডাবাড়ি, খেজমতপুর, রামনাথপুর, মিলনপুরসহ বিভিন্ন স্থানে ডজন খানেক আঙুরের বাগানে আঙুর চাষ হচ্ছে বলে জানা গেছে।