সরকারি চাকরিতে তিন বছর পরপর বদলির নিয়ম থাকলেও কুষ্টিয়া জেলা প্রাণিসম্পদ ও ভেটেরিনারি হাসপাতালে ডা. কিশোর কুমার কুণ্ডু যেন এক ‘অপরিবর্তনীয়’ অধ্যায়। গত ১৩ বছর ধরে একই কর্মস্থলে বহাল তবিয়তে থেকে তিনি গড়ে তুলেছেন এক শক্তিশালী সিন্ডিকেট। যেখানে খামারিদের সেবা নয়, বরং রাজনৈতিক প্রভাব ও ব্যবসায়িক স্বার্থই মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সম্প্রতি কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালের আরএমও ডা. হোসেন ইমাকে মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই আকস্মিক বদলি করা হয়েছে। এই ঘটনা নিয়ে যখন জেলাজুড়ে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বইছে, ঠিক তখনই খামারিদের মনে প্রশ্ন জেগেছে—একজন দক্ষ কর্মকর্তা যদি মেয়াদের আগে বিদায় নেন, তবে ডা. কিশোর কোন জাদুবলে এক যুগেরও বেশি সময় একই চেয়ারে কামড় দিয়ে পড়ে আছেন? প্রশাসনের এই দ্বিমুখী আচরণ কি তবে কোনো অদৃশ্য শক্তির ইশারায়?
সরেজমিনে অনুসন্ধানে দেখা যায়, ডা. কিশোরের অফিস কক্ষ এখন আর খামারিদের আস্থার জায়গা নেই। সেটি পরিণত হয়েছে ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের মিলনমেলায়। অভিযোগ রয়েছে, খামারিদের পপুলার ফার্মাসিউটিক্যালসসহ নির্দিষ্ট কিছু কোম্পানির ওষুধ কিনতে বাধ্য করা হয়।
সরকারি প্যাড বাদ দিয়ে সাদা কাগজে প্রেসক্রিপশন লিখে পছন্দের ফার্মেসি থেকে ওষুধ কেনার নির্দেশ দেন তিনি। এছাড়া খামারিদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসিয়ে রেখে তিনি ব্যস্ত থাকেন রিপ্রেজেন্টেটিভদের সঙ্গে খোশগল্পে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, অফিস চলাকালীন সরকারি হাসপাতালে ডা. কিশোরের দেখা মেলা ভার। তাকে পাওয়া যায় হাসপাতালের গেটের ঠিক বিপরীতে বিএনপি কর্মী নিপলুর ফার্মেসিতে। সেখানে বসেই চলে তার ‘প্রাইভেট প্র্যাকটিস’। আর হাসপাতালে তার অনুপস্থিতিতে গবাদি পশুর জটিল ও স্পর্শকাতর চিকিৎসা দিচ্ছেন উপ-সহকারী কর্মকর্তা, এমনকি অফিসের পিয়নরাও। এর ফলে প্রতিনিয়ত ভুল চিকিৎসার ঝুঁকিতে পড়ছেন জেলার অসহায় খামারিরা।
খামারি ও স্থানীয়দের দাবি, জেলাজুড়ে ভেটেরিনারি ফার্মেসি ও ওষুধ কোম্পানিগুলো থেকে ডা. কিশোর প্রতি মাসে লক্ষাধিক টাকা ‘মাসোহারা’ আদায় করেন। রাজনৈতিক প্রভাব এবং নামধারী কিছু সাংবাদিক সংগঠনের ছত্রছায়ায় তিনি এতটাই বেপরোয়া যে, তার বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুললে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কণ্ঠরোধ করা হয়। সব মিলিয়ে তার মাসিক অবৈধ আয় দুই লক্ষ টাকা ছাড়িয়ে যায় বলে গুঞ্জন রয়েছে।
ডা. কিশোরের এই দুর্নীতির পাহাড় নিয়ে একাধিকবার গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলেও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা আশ্চর্যজনকভাবে নীরব। এ বিষয়ে জেলা প্রাণিসম্পদ অফিসের ট্রেনিং অফিসার ইন্দ্রজিৎ কুমার মণ্ডলের মন্তব্য ছিল রীতিমতো বিস্ময়কর। তিনি প্রতিবেদককে বলেন, আপনারা তার ব্যাপারে কম তো লিখলেন না, কই কেউ তার কিচ্ছুই করতে পারলো না। উনি আমার কথা শোনেন, চাইলে একটা ‘বুঝ-ব্যবস্থা’ (সমঝোতা) করে দিতে পারি।
সহকর্মীর এমন বেফাঁস মন্তব্যই প্রমাণ করে যে, এই দপ্তরে দুর্নীতির শিকড় কত গভীরে এবং কেন ঊর্ধ্বতনরা তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ‘ভয়’ পান।
জেলার সাধারণ খামারি ও সচেতন নাগরিক সমাজের দাবি, অবিলম্বে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে ডা. কিশোরের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের হিসাব নেওয়া হোক এবং তাকে কুষ্টিয়া থেকে সরিয়ে একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক সেবা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হোক। জনগুরুত্বপূর্ণ এই প্রতিষ্ঠানটিকে সিন্ডিকেটের হাত থেকে মুক্ত করা এখন সময়ের দাবি।
এ বিষয়ে ডা. কিশোর কুমার কুণ্ডুর সাথে বারবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তিনি গণমাধ্যমের সামনে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।