এক সময় এখানে ছিল মানুষের উপচে পড়া ভিড়। বাতাসের প্রতিটি কণা যেন বহন করত “সাদা সোনা” খ্যাত কাঁচা চামড়ার তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধ। প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার লেনদেনে মুখর থাকত পুরো এলাকা। অথচ আজ সেখানে নেমে এসেছে শ্মশানের নীরবতা। প্রশ্ন উঠেছে, কী এমন ঘটল? কেন একের পর এক দেউলিয়া হয়ে পড়লেন ব্যবসায়ীরা? আর এই ধসের নেপথ্যের কারিগর কারা?
কুষ্টিয়া শহরের ঐতিহ্যবাহী বাবর আলী গেট একসময় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ চামড়ার আড়ত হিসেবে পরিচিত ছিল। ঈদ মৌসুম এলেই এখানে জমে উঠত বেচাকেনার মহোৎসব। জেলার বিভিন্ন উপজেলা ছাড়াও আশপাশের জেলা থেকে হাজার হাজার চামড়া আসত এই আড়তে।
কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সেই জৌলুস আজ অনেকটাই হারিয়ে গেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, একসময় যেখানে অর্ধশতাধিক আড়ত জমজমাট ব্যবসা চালাত, বর্তমানে সেখানে কোনোমতে টিকে আছে মাত্র চার থেকে পাঁচটি প্রতিষ্ঠান। বাকি অধিকাংশ ব্যবসায়ী দেউলিয়া হয়ে ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছেন।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, ব্যাংক ঋণের সুযোগ না থাকায় তারা মূলধন সংকটে পড়েছেন। সরকারিভাবে ট্যানারি মালিকরা সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা পেলেও তৃণমূল পর্যায়ের আড়তদাররা সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিত। ফলে মৌসুম এলেও চামড়া কিনতে পর্যাপ্ত অর্থ জোগাড় করতে পারেন না তারা।
ব্যবসায়িক রাজু বলেন, “আগে ঈদের সময় কোটি টাকার চামড়া উঠত এখানে। এখন টাকা না থাকায় চামড়া কিনতেই পারি না। ব্যাংকে গেলে জামানত চায়, কিন্তু আমাদের জন্য আলাদা কোনো ব্যবস্থা নেই।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, সরকার চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দিলেও বাস্তবে সেই দাম কার্যকর হয় না। ট্যানারি মালিকদের একচেটিয়া আধিপত্যের কারণে মাঠ পর্যায়ের ব্যবসায়ীরা ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
“সরকার দাম বেঁধে দিলেও ট্যানারিগুলো নানা অজুহাতে কম দামে চামড়া নেয়। বাধ্য হয়ে লোকসানে বিক্রি করতে হয়।
স্থানীয় ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রেতা সংকট এবং দেশের চামড়া শিল্পে দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা এই খাতকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে। পরিবেশগত জটিলতা, ট্যানারিগুলোর উৎপাদন কমে যাওয়া এবং রপ্তানি সংকটও পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করেছে।
ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা কিছুটা লাভের আশায় থাকলেও তাদের কপালে এখন দুশ্চিন্তার ভাঁজ। কারণ পর্যাপ্ত মূলধন, সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও বাজার নিয়ন্ত্রণের অভাবে আগের মতো ব্যবসা করার সাহস পাচ্ছেন না তারা।
কুষ্টিয়া চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মাসুদ বলেন, “ঈদ আসলে আগে ঘুমানোর সময় পেতাম না। এখন সারাদিন বসে থেকেও ক্রেতা পাওয়া যায় না।
দেশে অসংখ্য ট্যানারি নিবন্ধিত থাকলেও কার্যকরভাবে চালু আছে হাতে গোনা কয়েকটি। ফলে কাঁচা চামড়া কিনে সংরক্ষণ কিংবা দ্রুত বিক্রির সুযোগ কমে গেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাবর আলী গেটের মতো ঐতিহ্যবাহী আড়তগুলোতে।
চামড়া ব্যবসায়িক রাজা বলেন, “চামড়ার ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে হলে ট্যানারি মালিকদের সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে। না হলে এই শিল্প পুরোপুরি শেষ হয়ে যাবে।
একসময়কার জমজমাট বাবর আলী গেট এখন যেন হারানো গৌরবের নীরব সাক্ষী। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে কুষ্টিয়ার শত বছরের ঐতিহ্যবাহী এই চামড়ার আড়ত একদিন শুধুই ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই পাবে।
রাষ্ট্র কি ফিরিয়ে দিতে পারবে বাবর আলী গেটের সেই পুরনো জৌলুস? নাকি ধীরে ধীরে ধুলো জমবে “সাদা সোনার” এই আড়তে? সেই উত্তর সময়ই বলে দেবে।