ভারত কর্তৃক একতরফা গঙ্গার পানি প্রত্যাহারের প্রতিবাদে এবং পানির ন্যায্য হিস্যা ও ফারাক্কা বাঁধ বাতিলের দাবিতে ১৯৭৬ সালের এই দিনে মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী ঐতিহাসিক পদযাত্রা বা লং মার্চের নেতৃত্ব দেন।

১৯৭৫ সালে ভারত সরকার গঙ্গার উজানে ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ করে একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহার শুরু করে। এর ফলে বাংলাদেশের পদ্মা নদীসহ অন্যান্য শাখা নদী শুকিয়ে মরুকরণের সৃষ্টি হয় এবং তীব্র পানির সংকট দেখা দেয়। এই ভয়াবহ সংকট নিরসনে মওলানা ভাসানী ১৯৭৬ সালের ১৬ মে রাজশাহীর ঐতিহাসিক মাদ্রাসা ময়দান থেকে ফারাক্কা অভিমুখে লাখ লাখ জনতার পদযাত্রা শুরু করেন।

এই লং মার্চের আন্তর্জাতিক ও রাজনৈতিক চাপের ফলেই পরবর্তীতে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে গঙ্গার পানি বণ্টনের পথ উন্মুক্ত হয় এবং ১৯৭৭ সালে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশবাদী সংগঠন প্রতিবছর ১৬ মে নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে এই দিবসটি পালন করে। আন্তর্জাতিক ফারাক্কা কমিটির (আইএফসি) মতো সংগঠনগুলো এখনও অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ের ক্ষেত্রে এই লং মার্চের চেতনাকে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক মনে করে।

দখল, দূষণ এবং উজানে পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় কুষ্টিয়া অঞ্চলের পদ্মা, গড়াই, মাথাভাঙা, কুমার, কালীগঙ্গা, সাগরখালী ও হিসনাসহ অন্তত ৭টি প্রধান নদ-নদী আজ অস্তিত্ব সংকটে মৃতপ্রায়। ভারতের ফারাক্কা বাঁধের কারণে শুষ্ক মৌসুমে এসব নদীতে পানি থাকে না, যা পরিণত হয়েছে মরা খালে।

কুষ্টিয়ার প্রধান নদী এবং জীবিকার অন্যতম আধার। পানির স্বাভাবিক প্রবাহ না থাকায় শুষ্ক মৌসুমে এটি প্রায় পানিশূন্য হয়ে পড়ে এবং এর তলদেশ মরুভূমির মতো রূপ নেয়।

জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত এই প্রধান ও আন্তর্জাতিক নদীটি ভারতের উজান থেকে পানি প্রত্যাহার এবং চর পড়ে ভরাট হওয়ার কারণে শুকিয়ে মরা খালে পরিণত হয়েছে।

মাথাভাঙা ও হিসনা নদী পদ্মা থেকে উৎপত্তি হওয়া এই দীর্ঘ নদীগুলোর বেশিরভাগ স্থানই পলি জমে ভরাট হয়ে গেছে। স্থানীয় প্রভাবশালীরা নদীর বুকে বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ ও ফসল ফলাচ্ছে।

কুমার নদ গড়াই নদীর শাখা এই নদের বিভিন্ন স্থানে বাঁধ দিয়ে এবং অবৈধ স্থাপনা ও মার্কেট নির্মাণ করে দখল করা হয়েছে। কালীগঙ্গা ও সাগরখালী নদী পলি জমে ও দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় এই শাখা নদীগুলোর প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে তীব্র জলা সংকট দেখা দেয় স্থানীয় জনজীবনে।

নদীগুলোর স্বাভাবিক নাব্যতা ফেরাতে ও অবৈধ দখল উচ্ছেদে সরকারের তরফ থেকে বিভিন্ন সময়ে জলাধার সংরক্ষণ আইনি অভিযান চালানোর কথা বলা হলেও কাঙ্ক্ষিত ফলাফল পাওয়া যায়নি। এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে কুষ্টিয়ার কৃষিনির্ভর অর্থনীতি এবং জীববৈচিত্র্যের ওপর।

নদীপাড়ের কৃষক রহমত আলী (৫৫) বলেন, “একসময় এই নদীগুলোর পানি দিয়ে আমরা বিঘার পর বিঘা জমিতে ফসল ফলাতাম। আর এখন চৈত্র-বৈশাখ মাস আসতে না আসতেই নদী শুকিয়ে ধূলিকণা ও মরুভূমি হয়ে যায়। শ্যালো মেশিন দিয়েও ঠিকমতো পানি তোলা যায় না, খরচ দ্বিগুণ হয়ে গেছে। নদীর তলদেশে এখন ধান চাষ করতে হচ্ছে। পানির অভাবে আমাদের কুষ্টিয়ার সোনালী কৃষি ঐতিহ্য আজ ধ্বংসের মুখে।

জেলে সম্প্রদায়ের কার্তিক হালদার (৪৮) বলেন, “বাপ-দাদার আমল থেকে এই নদীতে মাছ ধরে সংসার চালাতাম। নদীতে এখন হাঁটু পানি, মাছ পাওয়া তো দূরের কথা, নৌকা চালানোর অবস্থাও নেই। আমাদের জালালো সম্প্রদায়ের শত শত মানুষ আজ পেশা বদলে দিনমজুরের কাজ করছে। ফারাক্কা আমাদের পেটে লাথি মেরেছে, আর স্থানীয় প্রভাবশালীরা নদী দখল করে আমাদের বাঁচার শেষ পথটুকুও বন্ধ করে দিচ্ছে।

স্থানীয় সচেতন নাগরিক আশরাফুল ইসলাম বলেন, “ছোটবেলায় দেখেছি পদ্মা-গড়াইয়ের কী যৌবন ছিল! এখন নদীগুলোর দিকে তাকালে বুক ফেটে যায়। মওলানা ভাসানী ৫০ বছর আগে যে আন্দোলন করেছিলেন, আজকেও সেই একই সংকট রয়ে গেছে। প্রতি বছর ১৬ মে এলে শুধু আলোচনা সভা হয়, কিন্তু নদী বাঁচাতে বাস্তবমুখী কোনো খনন কাজ বা দখলমুক্ত করার স্থায়ী উদ্যোগ চোখে পড়ে না।

জাতীয় নদী রক্ষা আন্দোলন কুষ্টিয়া জেলা শাখার সভাপতি বলেন, “ফারাক্কা লং মার্চের ৫০ বছর পেরিয়ে গেলেও আমরা আমাদের ন্যায্য অধিকার পাইনি। ভারতের একতরফা পানি প্রত্যাহারের ফলে কুষ্টিয়ার নদীগুলো আজ লাইফ সাপোর্টে চলে গেছে। নদীগুলোর এই মরণদশার জন্য কেবল উজান থেকে পানি না আসাই দায়ী নয়, বরং আমাদের স্থানীয় উদাসীনতাও সমানভাবে অপরাধী। গড়াই বা মাথাভাঙার মতো নদীগুলোতে পলি জমে মুখ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, আর সেই সুযোগে স্থানীয় প্রভাবশালীরা নদী দখল করে মার্কেট ও ফসলি জমি বানাচ্ছে। সরকারের উচিত অবিলম্বে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পানির হিস্যা নিয়ে জোরালো কূটনৈতিক তৎপরতা চালানো এবং স্থানীয়ভাবে নদী খনন ও অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া। নদী না বাঁচলে কুষ্টিয়ার কৃষি ও জীববৈচিত্র ধ্বংস হয়ে যাবে।

কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক তৌহিদ বিন হাসান বলেন, পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে। এই প্রকল্পটি সম্পন্ন হলে কুষ্টিয়া সহ আরো ৩০টি নদীর নাব্যতা ফিরে আসবে।