আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব যাদের কাঁধে, তাদের ছত্রছায়াতেই কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার খলিশাকুন্ডি ইউনিয়নে গড়ে উঠেছে মাদক, চুরি ও ডাকাতির এক নিরাপদ স্বর্গরাজ্য। খোদ পুলিশের বিরুদ্ধে অপরাধীদের কাছ থেকে নিয়মিত মোটা অঙ্কের ‘মাসোহারা’ বা চাঁদা নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
অভিযোগের তির খলিশাকুন্ডি ইউনিয়নের পিপুলবাড়িয়া পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ (আইসি) উপপরিদর্শক (এসআই) ইলিয়াস, সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) মুশফিকুর রহমান এবং কনস্টেবল রায়হান মৃধার দিকে।
স্থানীয়দের দাবি, এই তিন পুলিশ কর্মকর্তার প্রত্যক্ষ মদদে পিপুলবাড়িয়া ক্যাম্প এলাকা এখন মাদকের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে ভয়ে কেউ কথা বলতে পর্যন্ত পারে না।
সূত্রে জানা যায়, খলিশাকুন্ডি এলাকার চিহ্নিত ও তালিকাভুক্ত অন্তত ২০ জন শীর্ষ মাদক কারবারির কাছ থেকে প্রতি মাসে নিয়মিত মাসোহারা তোলেন ক্যাম্পের এই তিন কর্মকর্তা। স্থানীয় সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, প্রতি মাসে এই মাদক সিন্ডিকেট থেকে প্রায় ২ লাখ টাকা পকেটে পোরেন তারা।
পাইকপাড়ার ক্ষ্যাপা ওরফে মারজেল, ঘাট পাড়ার মিলন, কাটা গাঙ পাড়ার শামীম, দোকানপাড়ার শরীফ ঠাকুর, হাট পাড়ার সুরুজ, দরগাপাড়ার জামাল, খলিসাকুণ্ডের রকি, পাইকপাড়ার খান সাহেব।
এছাড়াও আরও অন্তত এক ডজন মাদক ব্যবসায়ী এই চক্রের সাথে জড়িত, যারা প্রতি মাসের নির্দিষ্ট সময়ে পুলিশের এই কর্মকর্তাদের কাছে ‘খাজনা’ পৌঁছে দেয়। ফলে বুক ফুলিয়ে এলাকায় হেরোইন, ইয়াবা, ফেনসিডিল ও গাঁজার রমরমা ব্যবসা চালাচ্ছে তারা।
শুধু মাদকই নয়, স্থানীয় চোর ও ডাকাত চক্রের সাথেও এই পুলিশ কর্মকর্তাদের দহরম-মহরমের অভিযোগ রয়েছে। মাসোহারার বিনিময়ে অপরাধীদের ছাড় দেওয়ার কারণে এলাকায় আশঙ্কাজনকহারে বেড়েছে চুরি ও ডাকাতি।
পিপুলবাড়িয়া এলাকায় ২টি ৬ লাখ মূল্যের বড় গরু সাম্প্রতিক চুরি হলেও কোন মামলা বা উদ্ধার হয়নি। এ ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে ।
স্থানীয়রা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, গত ২০২৫ সালে খোদ পিপুলবাড়িয়া পুলিশ ক্যাম্পের চৌকির একেবারে সামনে একটি রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্সে দুর্ধর্ষ ডাকাতির ঘটনা ঘটে। রহস্যজনক কারণে পুলিশ ছিল নির্বিকার, যা মূলত এই ত্রয়ীর সাথে অপরাধীদের গোপন আঁতাতেরই প্রমাণ দেয়।
নাম পরিচয় গোপন রাখার শর্তে কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা জানান, এএসআই মুশফিকুজ্জামান ও কনস্টেবল রায়হান মিলে সারাদিন মাদক ব্যবসায়ীদের কাছে গিয়ে টাকা তোলে। আমরা ভয়ে কিছু বলতে পারি না। তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত করলে এবং স্থানীয় এলাকাবাসীর কাছে কথা বললে সকল সত্যতা পাওয়া যাবে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ক্যাম্প আইসি এসআই ইলিয়াস কিছুটা এড়িয়ে যাওয়ার ভঙ্গিতে বলেন,”আপনারা এলাকায় খোঁজখবর নেন, তদন্ত করে দেখেন।”
অন্যদিকে এসআই মুশফিকুজ্জামান খান চৌধুরী
আত্মপক্ষ সমর্থন করে বলেন,”নেগেটিভ, বিষয়গুলো ভালো করে তদন্ত করে দেখুন, (আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ সত্য নয়)।
সার্বিক বিষয়ে দৌলতপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আরিফুর রহমান জানান, “আমার কাছে এখনো এই বিষয়ে কেউ লিখিত বা মৌখিক অভিযোগ করেনি। তবে অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুত আইনগত ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রক্ষক যখন ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, তখন সাধারণ মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকে যায়—পিপুলবাড়িয়ার বর্তমান চিত্র ঠিক তেমনই। মাদক ও অপরাধের এই থাবা থেকে এলাকাকে মুক্ত করতে এবং অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অতি দ্রুত বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য কুষ্টিয়া জেলা পুলিশ সুপারের (এসপি) জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ভুক্তভোগী এলাকাবাসী।