কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার খলিশাকুন্ডি ইউনিয়নের পিপুলবাড়িয়া পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ (আইসি) এসআই ইলিয়াস, এএসআই মুশফিকুজ্জামান খান চৌধুরী এবং কনস্টেবল রায়হান মৃধার বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশের পর এলাকায় তাদের প্রকাশ্য দৌরাত্ম্য কিছুটা কমেছে।

এতে স্থানীয়দের মাঝে সাময়িক স্বস্তি ফিরলেও তাদের বিরুদ্ধে এখনো কোনো দৃশ্যমান বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে জনমনে। রক্ষক যখন ভক্ষকের ভূমিকায়, তখন সাধারণ মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। মাদক, চুরি ও ডাকাতির অভয়ারণ্যে পরিণত হওয়া এই অঞ্চলকে মুক্ত করতে এখন পুলিশের খুলনা বিভাগীয় ডিআইজি এবং কুষ্টিয়া জেলা পুলিশ সুপারের (এসপি) সরাসরি ও কঠোর হস্তক্ষেপ দাবি করছেন এলাকাবাসী।

মাসোহারার বিনিময়ে মাদকের অভয়ারণ্য: অধরাই ২০ শীর্ষ কারবারিঅনুসন্ধানে জানা গেছে, পিপুলবাড়িয়া ক্যাম্প এলাকাটি এখন মাদকের স্বর্গরাজ্য। খলিশাকুন্ডি এলাকার চিহ্নিত ও তালিকাভুক্ত অন্তত ২০ জন শীর্ষ মাদক কারবারির কাছ থেকে প্রতি মাসে নিয়মিত মাসোহারা তোলেন ক্যাম্পের এই তিন কর্মকর্তা।

মাসিক ২ লাখ টাকার সিন্ডিকেট: স্থানীয় সূত্রের দাবি, প্রতি মাসে এই মাদক সিন্ডিকেট থেকে প্রায় ২ লাখ টাকা পকেটে পোরেন তারা।

মুক্ত বাতাসে বিষের ব্যবসা: নির্দিষ্ট সময়ে পুলিশের এই কর্মকর্তাদের কাছে ‘খাজনা’ পৌঁছে দেওয়ার কারণে বুক ফুলিয়ে এলাকায় হেরোইন, ইয়াবা, ফেনসিডিল ও গাঁজার রমরমা ব্যবসা চালাচ্ছে মাদক ব্যবসায়ীরা। এদের বিরুদ্ধে ভয়ে সাধারণ মানুষ মুখ খোলার সাহস পায় না।

ক্যাম্পের সামনেই চুরি-ডাকাতি, সিসিটিভি ফুটেজেও মেলেনি প্রতিকার:শুধু মাদকই নয়, স্থানীয় চোর ও ডাকাত চক্রের সাথেও এই পুলিশ সদস্যদের দহরম-মহরমের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। মাসোহারার বিনিময়ে অপরাধীদের ছাড় দেওয়ার কারণে এলাকায় আশঙ্কাজনকহারে বেড়েছে চুরি ও ডাকাতি।

ক্যাম্পের নাকের ডগায় চুরি: চলতি মাসেই পিপুলবাড়িয়া ক্যাম্পের ঠিক সামনে একটি দোকানে ভয়াবহ চুরির ঘটনা ঘটে। চুরির স্পষ্ট সিসিটিভি ফুটেজ থাকা সত্ত্বেও মাস শেষ হতে চলল, কিন্তু চোর শনাক্ত বা কোনো আইনি ব্যবস্থা নেয়নি ক্যাম্প পুলিশ।

লাখ টাকার গরু চুরি, মামলা নেই: সাম্প্রতিক সময়ে এলাকা থেকে ৬ লাখ টাকা মূল্যের ২টি বড় গরু চুরি হলেও কোনো মামলা বা উদ্ধারের তৎপরতা দেখায়নি পুলিশ।

অ্যাম্বুলেন্সে ডাকাতি ও পুলিশের নীরবতা: বিগত ২০২৫ সালে খোদ পিপুলবাড়িয়া পুলিশ ক্যাম্পের চৌকির একেবারে সামনে একটি রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্সে দুর্ধর্ষ ডাকাতির ঘটনা ঘটে। রহস্যজনক কারণে তখনো পুলিশ ছিল সম্পূর্ণ নির্বিকার, যা মূলত এই ত্রয়ীর সাথে অপরাধীদের গোপন আঁতাতেরই প্রমাণ দেয়।

নাম-পরিচয় গোপন রাখার শর্তে কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন: “এএসআই মুশফিকুজ্জামান ও কনস্টেবল রায়হান মিলে সারাদিন মাদক ব্যবসায়ীদের আস্তানায় গিয়ে টাকা তোলে। আমরা ভয়ে কিছু বলতে পারি না। উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এসে নিরপেক্ষ তদন্ত করলে এবং সাধারণ মানুষের সাথে কথা বললে এদের সব পাপের খতিয়ান বেরিয়ে আসবে।

এর আগে এসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ক্যাম্প আইসি এসআই ইলিয়াস কিছুটা এড়িয়ে যাওয়ার ভঙ্গিতে বলেন, “আপনারা এলাকায় খোঁজখবর নেন, তদন্ত করে দেখেন।” অন্যদিকে, এএসআই মুশফিকুজ্জামান খান চৌধুরী আত্মপক্ষ সমর্থন করে দাবি করেন, “নেগেটিভ, বিষয়গুলো ভালো করে তদন্ত করে দেখুন, (আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ সত্য নয়)।

সার্বিক বিষয়ে দৌলতপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আরিফুর রহমান জানান, “আমার কাছে এখনো এই বিষয়ে কেউ লিখিত বা মৌখিক অভিযোগ করেনি। তবে অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুত আইনগত ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জনগণের প্রশ্ন: অ্যাকশন কবে?
স্থানীয়দের দাবি, থানার ওসির কাছে লিখিত অভিযোগের অপেক্ষা না করে, গণমাধ্যমে প্রকাশিত এই সুনির্দিষ্ট ও চাঞ্চল্যকর তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশের খুলনা বিভাগীয় ডিআইজি এবং কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপারের (এসপি) অবিলম্বে তদন্ত কমিটি গঠন করা উচিত। পিপুলবাড়িয়ার সাধারণ মানুষকে এই ‘ত্রয়ী’র হাত থেকে রক্ষা করতে এবং পুলিশের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার করতে অভিযুক্তদের দ্রুত ক্লোজড (প্রত্যাহার) করে কঠোর বিভাগীয় শাস্তির মুখোমুখি করার জোর দাবি উঠেছে।