খুলনা মহানগর পুলিশের (কেএমপি) গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) পরিদর্শক তৈমুর ইসলামকে অবশেষে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে রংপুর রেঞ্জে সংযুক্ত করা হয়েছে। সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ-এর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত এই কর্মকর্তাকে নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা অভিযোগ ও বিতর্ক চলছিল।

গতকাল সোমবার ০৮ জুন রাতে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে এ সংক্রান্ত আদেশ জারি করা হয়। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, তৈমুর ইসলামের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, ভয়ভীতি প্রদর্শন, অবৈধভাবে অর্থ আদায় এবং বিভিন্ন অপরাধী চক্রের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় ছিল। সম্প্রতি তাঁর বিরুদ্ধে প্রকাশিত একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এসব অভিযোগ নতুন করে সামনে আসে।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ অনুযায়ী, জমি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান দখল সংক্রান্ত বিরোধে প্রভাব খাটিয়ে ব্যক্তিদের তুলে এনে গ্রেপ্তার দেখানো, মামলায় জড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায় এবং প্রভাবশালী মহলের হয়ে কাজ করার মতো ঘটনাগুলোর সঙ্গে তাঁর নাম জড়িয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে তিনি স্থানীয় সন্ত্রাসী চক্রের সঙ্গেও যোগাযোগ বজায় রেখেছিলেন।

শুধু গণমাধ্যম নয়, পুলিশের নিজস্ব তদারকি সংস্থা পুলিশ ইন্টারনাল ওভারসাইট (পিআইও)-এর প্রতিবেদনে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক অনিয়ম ও অসদাচরণের তথ্য উঠে আসে। সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে গত বছর কেএমপির অভ্যন্তরীণ অনুসন্ধান শেষে তাঁকে অন্য ইউনিটে বদলির সুপারিশ করা হয়েছিল।

বদলির আদেশ, কিন্তু ছাড়েননি কেএমপি
তৈমুর ইসলামকে সরানোর উদ্যোগ নতুন নয়। গত বছরের ১৬ অক্টোবর তাঁকে ট্যুরিস্ট পুলিশে বদলির আদেশ দেওয়া হয়। নির্দেশনায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নতুন কর্মস্থলে যোগ না দিলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অবমুক্ত (স্ট্যান্ড রিলিজ) হিসেবে গণ্য হওয়ার কথাও উল্লেখ ছিল।

তবে ওই আদেশ বাতিলের আবেদন করেন তৈমুর। ১৮ নভেম্বর আবেদনটি নামঞ্জুর হওয়ার পরও চার দিন পর তাঁর ট্যুরিস্ট পুলিশে পদায়ন বাতিল করে খুলনা রেঞ্জে বদলির নতুন আদেশ জারি করা হয়। পরবর্তীতে চলতি বছরের ১৫ মার্চ সেই আদেশও বাতিল হয়ে যায়।

পুলিশ সদর দপ্তরের একাধিক নির্দেশনা জারির পরও প্রায় আট মাস ধরে তিনি কেএমপিতেই বহাল থাকেন। এতে পুলিশ প্রশাসনের ভেতরে তাঁর প্রভাব নিয়ে নানা প্রশ্নের জন্ম দেয়।

বেনজীরের রিসোর্ট প্রকল্পেও ছিল আলোচিত ভূমিকা পরিদর্শক তৈমুর ইসলাম এর আগেও আলোচনায় এসেছিলেন সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের মালিকানাধীন ‘সাভানা ইকোরিসোর্ট অ্যান্ড ন্যাচারাল পার্ক’ প্রকল্পকে কেন্দ্র করে।

স্থানীয়দের দাবি, বৈরাগীরটোলা এলাকায় গড়ে ওঠা ওই রিসোর্টের জন্য জমি অধিগ্রহণ কার্যক্রমের তদারকিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন তৈমুর। জমি বিক্রি করা পরিবারগুলোর অনেক সদস্য অভিযোগ করেছিলেন, বিভিন্ন ধরনের ভয়ভীতি ও চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে তাঁদের জমি বিক্রিতে বাধ্য করা হয়েছিল।

২০২৪ সালে জমি বিক্রি করা ২৭টি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, অধিকাংশ পরিবারই দাবি করেছিল যে তারা স্বেচ্ছায় নয়, বরং চাপের মুখে জমি হস্তান্তর করেছে। তাঁদের অভিযোগের কেন্দ্রে ছিলেন পরিদর্শক তৈমুর ইসলাম।

সংশ্লিষ্ট মহলের প্রশ্ন, পুলিশের অভ্যন্তরীণ তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পরও কেন দীর্ঘ সময় ধরে তাঁকে কেএমপি থেকে সরানো সম্ভব হয়নি? একাধিক বদলির আদেশ জারি ও বাতিল হওয়ার পেছনে কী কারণ ছিল, সেটিও এখন আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।

সর্বশেষ রংপুর রেঞ্জে সংযুক্তির আদেশের মাধ্যমে কেএমপিতে তাঁর দীর্ঘ কর্মপর্বের অবসান ঘটলেও, তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এবং দায় নির্ধারণের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।