পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ উপজেলার ৬নং সোনাহার মল্লিকাদহ ইউনিয়নের মহা-বিদ্যালয় মাঠে ঈদ উপলক্ষে আয়োজিত সোনাহার আনন্দ মেলায় সংঘর্ষ ও মারধরের ঘটনা ঘটেছে। গত শুক্রবার (৫ জুন) বিকেলে এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে মেলায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মেলায় মোটরসাইকেল প্রবেশকে কেন্দ্র করে প্রথমে বাগ্বিতণ্ডা শুরু হয়। পরে কমিটির সদস্য মনোয়ার নামের এক ব্যক্তিকে ধাক্কা দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে উভয় পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় আয়োজক কমিটির সদস্যদের বিরুদ্ধে সাধারণ দর্শনার্থীদের মারধরের অভিযোগ উঠেছে।
মেলায় আয়োজক কমিটির মনোয়ারসহ আরো কয়েকজন সোনাহার নুরু বাজার এলাকার লালচান নামে এক যুবকে মারধর করে তার কাছ থেকে একটি মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মেলায় প্রবেশের পর বিভিন্ন খেলায় অংশ নিতে ৫০ টাকা করে টিকিট নেওয়া হয়। এছাড়া এর আগেও একই মেলা থেকে একটি নতুন পালসার ডাবল ডিস্ক মোটরসাইকেল এবং একটি সাইকেল অটো চুরির ঘটনা ঘটেছে।
মেলায় আগত দর্শনার্থীদের অভিযোগ, সেখানে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো কার্যকর ব্যবস্থা ছিল না। ফলে পরিবার-পরিজন নিয়ে মেলায় আসা মানুষ ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
মেলায় দোকান ও ব্যবসা পরিচালনাকারীদের কাছ থেকে সাংবাদিকদের জন্য ৩০ হাজার টাকা এবং থানার জন্য ৫০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগে সোনাহার মহাবিদ্যালয়ের প্রিন্সিপাল শফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে নানা আলোচনা ও অভিযোগ উঠেছে।
২৯ মে মেলা থেকে অটোচালক রবিউল ইসলাম একটি অটো হারিয়ে ফেলেন। তিনি সোনাহার ২ নম্বর ওয়ার্ডের মাঝাডাঙ্গাপাড়া এলাকার আব্দুল হামিদের ছেলে। অটো হারানোর পর তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং পরে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রংপুরে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ পাওয়া যায়।
মেলায় মারামারির ঘটনার ভিডিও প্রকাশের পর ৬ জুন দেবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সবুজ কুমার বসাক আয়োজক কমিটিকে মেলা বন্ধের নির্দেশনা দেন। পরবর্তীতে নির্দেশনার পর মেলাটি বন্ধ করা হয় বলে জানা যায়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সুশীল সমাজের কয়েকজন ব্যক্তি বলেন, এ মেলায় সর্বোচ্চ লুটপাট করেছে মনোয়ার ও শফিকুল, প্রিন্সিপালসহ তহিদুর রহমান মিস্টার। প্রতিদিন মেলা থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়ে সোনাহারের মান-সম্মান নষ্ট করা হয়েছে।
সোনাহারে ঈদ আনন্দ মেলা ও কুটির শিল্প মেলা উপলক্ষে ১৪ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন,গঠিত কমিটির দায়িত্বপ্রাপ্তরা হলেন,আজিজুল ইসলাম (মাস্টার) প্রধান সমন্বয়ক, শফিকুল ইসলাম (প্রিন্সিপাল) যুগ্ম সমন্বয়ক, জাহাঙ্গীর আলম, ভারপ্রাপ্ত সভাপতি, আশিকুর রহমান টুটুল সাধারণ সম্পাদক, লুৎফর রহমান (মেম্বার) সিনিয়র সহ-সভাপতি, আবু তৈয়ব প্রধান সাংগঠনিক সম্পাদক, তহিদুর রহমান মিস্টার সহ-সাধারণ সম্পাদক, সুফিয়ার রহমান সভাপতি, সুবদল, আবুল বাসার পাপ্পু সাধারণ সম্পাদক, যুবদল, সাজেদুল ইসলাম সাজু সাবেক আহ্বায়ক, যুবদল, আসাদ খান সভাপতি, স্বেচ্ছাসেবক দল, বাপ্পারাজ ইসলাম সাধারণ সম্পাদক, স্বেচ্ছাসেবক দল, মাজেদুল ইসলাম সভাপতি, ছাত্রদল, মনোয়ার হোসেন সাধারণ সম্পাদক, ছাত্রদল।
এ বিষয়ে জানতে শফিকুল ইসলাম (প্রিন্সিপাল) যুগ্ম সমন্বয়কের ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরে একাধিকবার কল করা হলেও ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।
মেলার বিষয়ে জানতে চাইলে আশিকুর রহমান টুটুল বলেন, প্রাথমিকভাবে আমরা একটি সাধারণ মেলার আয়োজন করতে চেয়েছিলাম। তখন গঠিত কমিটিতে ১৪ জনের নাম অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে পরবর্তীতে মেলা কীভাবে পরিচালিত হয়েছে, মেলার আয়ের উৎস কী ছিল এবং আয়ের অর্থ কোথায় ব্যয় করা হয়েছে-এসব বিষয়ে আমাকে কোনো তথ্য জানানো হয়নি। ফলে মেলার কার্যক্রম সম্পর্কে আমি পরে আর অবগত ছিলাম না। তবে মেলায় অটোরিকশা ও মোটরসাইকেল চুরিসহ বিভিন্ন চুরির ঘটনার অভিযোগ পাওয়া গিয়েছিল। এছাড়া মারামারির ঘটনাও আমি ফেসবুকের মাধ্যমে দেখেছি। ইতোমধ্যে মেলাটি বন্ধ হয়ে গেছে। এ বিষয়ে এর বেশি বিস্তারিত আমার জানা নেই, তাই আর কিছু বলতে পারব না।
এ বিষয়ে মনোয়ার হোসেন সাধারণ সম্পাদক, ছাত্রদল বলেন, মারামারির ঘটনার দিন এক মোটরসাইকেল চালককে মেলার ভেতরে মোটরসাইকেল প্রবেশে নিষেধ করা হয়। কিন্তু তিনি জোরপূর্বক মোটরসাইকেল নিয়ে মেলায় প্রবেশ করেন এবং মেলার শৃঙ্খলা নষ্ট করার চেষ্টা করেন। এমনকি তাকে বুঝিয়ে বলার পরও তিনি উপস্থিত লোকজনকে ধাক্কাধাক্কি করে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করে তোলেন।
তিনি আরও বলেন, ভিডিওতে আমাকে আগে ধাক্কা দেওয়ার দৃশ্য হয়তো প্রচার হয়নি। তবে যে অংশটি প্রচার করা হয়েছে, সেটি ঘটনার শেষ মুহূর্তে ধারণ করা হয়েছে। কে বা কারা ওই ভিডিও ধারণ ও প্রচার করে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করেছে।মেলার আয়-ব্যয়ের হিসাব সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা অনেকেই এখানে পরিশ্রম করেছি, কিন্তু আমাদের সেই পরিশ্রমের পারিশ্রমিকও পাইনি। বরং নিজেদের পকেট থেকে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে। এসব বিষয়ে আয়োজক কমিটির সিনিয়র সদস্যরা ভালো বলতে পারবেন। তিনি আরও জানান, বর্তমানে মেলাটি বন্ধ রয়েছে।
মেলায় আয়োজক কমিটির তহিদুর রহমান মিস্টার সহ-সাধারণ সম্পাদকের মুঠোফোনে কল দেওয়া হলে তিনি ফোনটি রিসিভ করেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান যে তিনি মিটিংয়ে ব্যস্ত আছেন এবং এরপর তিনি কলটি কেটে দেন। পরে তাঁর সঙ্গে আর কোনো যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
মেলার অনুমতি বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সবুজ কুমার বসাকের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ মেলা কীভাবে অনুমতি পেয়েছে তা তিনি জানেন না এবং এ বিষয়ে তাঁর কাছ থেকে কোনো অনুমতি নেওয়া হয়নি। তবে মেলায় বিশৃঙ্খলার বিষয়ে তথ্য পাওয়ার পর ইতিমধ্যে মেলাটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। মেলার বিষয়ে আরও কোনো তথ্য থাকলে জানাতে অনুরোধ করেন তিনি।
এ বিষয়ে দেবীগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সেলিম মালিকের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, মেলার অনুমোদন নাকি জেলা প্রশাসক মহোদয় তাদের দিয়েছেন। আমাদের কাছে একটি তদন্ত চাওয়া হয়েছিল, আমরা তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছি। তবে ডিসির কোনো কাগজ তাদের কাছে এসেছে কি না-সে বিষয়ে আমরা কিছু বলতে পারি না। এ বিষয়ে বিস্তারিত মেলার আয়োজক কমিটির সদস্যরাই বলতে পারবেন।
মেলায় বিশৃঙ্খলা ও গণ্ডগোলের বিষয়ে জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোসা: শুকরিয়া পারভীন কে জানালে তিনি বলেন, মেলার অনুমোদন কে দিয়েছে-সে বিষয়টি তিনি খতিয়ে দেখছেন।