স্মার্টফোনের স্পর্শে যখন মুহূর্তেই পৌঁছে যাচ্ছে দেশ-বিদেশের সব খবর, তখনও সুর্য উঠার আগেই পত্রিকার ব্যাগ তুলে নেন হকার ফকরু। শহরের অলিগলি, দোকানপাট, সরকারি-বেসরকারি অফিস, স্কুল-কলেজ আর বাসাবাড়িতে হেঁটে হেঁটেই পৌঁছে দেন সংবাদপত্র। ৩৫ বছর ধরে একই ছন্দে চলা এই মানুষটির সম্পুর্ন নাম.আব্দুল গফফার ফখরুদ্দীন। কিন্তু তিনি সৈয়দপুর শহরে ‘ফখরু’ নামেই পরিচিত।
জানা যায়, নীলফামারীর সৈয়দপুর পৌরসভাধীন মুন্সিপাড়া এলাকার বাসিন্দা মরহুম আব্দুল সাত্তারের ছেলে ফকরু। জীবনের যৌবনকাল থেকেই পত্রিকা বিলির পেশায় যুক্ত হন তিনি।
ফকরু বলেন, “আমি যখন কাজ শুরু করি তখন পত্রিকার সংখ্যা ছিল কম, হকারও ছিল হাতে গোনা কয়েকজন। প্রতিদিন ভোরে পত্রিকা সংগ্রহ করে বেরিয়ে পড়তাম। রোদ-বৃষ্টি, ঝড় কিংবা শীত কোনো কিছুই আমাকে থামাতে পারেনি। মানুষের হাতে সময়মতো খবর পৌঁছে দেওয়াটাই ছিল আমার দায়িত্ব।
একসময় সৈয়দপুর শহরের সকাল শুরু হতো পত্রিকার হকারদের হাঁকডাকে। জাতীয় ও স্থানীয় বিভিন্ন পত্রিকা নিয়ে ছুটে বেড়াতাম। শহরের বহু পরিবারে সকালের চায়ের সঙ্গে খবরের কাগজ পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব ছিল আমার।
বর্তমানে তিনি বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি অফিস, স্কুল-কলেজ, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং বাসাবাড়িতে পত্রিকা সরবরাহ করেন। প্রতিদিন প্রায় ৩০০ কপি জাতীয় ও স্থানীয় বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকা বিক্রি করেন তিনি। তবে প্রযুক্তির বিকাশ আর ইন্টারনেটভিত্তিক সংবাদমাধ্যমের প্রসারের কারণে আগের তুলনায় ছাপা পত্রিকার বিক্রি অনেক কমে গেছে।
১৮ জুন দুপুরে হকার ফকরু বলেন, তার স্ত্রী একজন গৃহিণী। পত্রিকা বিক্রির আয়ে তিন সন্তানকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করেছেন। ইতোমধ্যে দুই মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন এবং এক ছেলে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন।
জীবনের দীর্ঘ সংগ্রামের কথা বলতে গিয়ে তিনি কান্নাজড়িত কন্ঠে বলেন, পত্রিকা বিক্রির টাকাতেই সংসার চালিয়েছি, সন্তানদের লেখাপড়া করিয়েছি। আগে মানুষ কাগজের জন্য অপেক্ষা করত, এখন মোবাইলেই খবর পড়ে। তাই আয় অনেক কমে গেছে। বয়সও হয়েছে, শরীর আর আগের মতো চলে না। পায়ে হেঁটে কাগজ বিক্রি করা এখন খুব কষ্টের। তারপরও পেটের দায়ে আর এই পেশার প্রতি ভালোবাসায় হকারি করে যাচ্ছি। জীবনের বাকি সময়টাও এ পেশাতেই কাটিয়ে দিতে চাই। কিন্তু দুঃখ হলো, সরকার দেশের অনেককেই স্বাবলম্বী করে দিয়েছেন কিন্তু সংবাদ পত্রের হকারদের কেউই খবর রাখেন না।
সৈয়দপুরের প্রবীন সাংবাদিক এম আর আলম ঝন্টু বলেন, সংবাদপত্র মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কারিগর হলো ফকরু। তিনি শুধু একজন হকার নন, সৈয়দপুরের সংবাদপত্র সংস্কৃতির জীবন্ত ইতিহাস। সময়ের পরিবর্তনে বদলে গেছে মানুষের অভ্যাস। কাগজের পাতা ছেড়ে খবর চলে এসেছে মুঠোফোনের পর্দায়। তবুও প্রতিদিন সূর্য ওঠার সাথে সাথে সংবাদ পত্র নিয়ে পথে নামেন ফখরুদ্দীন। বিগত ৩৫ বছরের সংবাদ পত্র নিয়ে পাঠকের হাতে হাতে পৌঁছে দেয়া এই মানুষটার জন্য কিছু একটা করা দরকার বলে জানান তিনি।