পবিত্র আশুরা উপলক্ষে নাটোরের লালপুর উপজেলার বিলমাড়ায় শুরু হয়েছে দুই দিনব্যাপী ঐতিহ্যবাহী আশুরা মেলা। শুক্রবার (২৬ জুন) বিকেলে বিলমাড়া ডিগ্রি কলেজ মাঠে বিলমাড়া যুব সমাজের উদ্যোগে এ মেলার উদ্বোধন করা হয়। মেলার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল গ্রামীণ বাংলার ঐতিহ্যবাহী লাঠিখেলা। বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা লাঠিয়ালদের শৈল্পিক কসরত, সাহসিকতা ও মনোমুগ্ধকর পরিবেশনা দেখতে বিকেল থেকেই মাঠজুড়ে ভিড় করেন হাজারো দর্শনার্থী। নারী, পুরুষ ও শিশুদের পদচারণায় পুরো মেলা প্রাঙ্গণ পরিণত হয় এক প্রাণবন্ত মিলনমেলায়।
শত বছরের গ্রামীণ ঐতিহ্যকে ধারণ করে প্রতি বছর আশুরা উপলক্ষে বিলমাড়ায় এ মেলার আয়োজন করা হয়। সময়ের পরিবর্তনে গ্রামীণ সংস্কৃতির অনেক আয়োজন হারিয়ে গেলেও বিলমাড়ার এই মেলা এখনো সেই ঐতিহ্য বহন করে চলেছে। স্থানীয়দের পাশাপাশি দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ পরিবার-পরিজন নিয়ে মেলায় অংশ নেন। গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য বাউল সংগীত ও মাদারের গান পরিবেশন করা, লাঠিখেলার পাশাপাশি,সাপ খেলা , নাগরদোলা, শিশুদের বিনোদনের বিভিন্ন রাইড, খেলনা, মাটির তৈজসপত্র, বাঁশ-বেতের সামগ্রী, দেশীয় মিষ্টান্ন, ঝালমুড়ি, ফুচকা, চটপটি, আইসক্রিমসহ নানা ধরনের দোকানে ছিল উপচেপড়া ভিড়।
মেলার মূল আকর্ষণ লাঠিখেলায় অংশ নেওয়া বিভিন্ন দলের লাঠিয়ালরা ঢাক-ঢোলের তালে তালে অসাধারণ কৌশল প্রদর্শন করেন। প্রতিপক্ষের আক্রমণ প্রতিহত করা, দ্রুতগতির লাঠি চালনা, আত্মরক্ষার নানা কৌশল এবং দলীয় পরিবেশনা দর্শকদের মুগ্ধ করে। খেলা চলাকালে করতালি আর উচ্ছ্বাসে মুখর হয়ে ওঠে পুরো মাঠ। অনেকেই মোবাইল ফোনে সেই মুহূর্ত ধারণ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।
আয়োজকদের দাবি, নতুন প্রজন্মের কাছে গ্রামীণ ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে তুলে ধরার পাশাপাশি সামাজিক সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ববোধ জোরদার করতেই এ আয়োজন। ধর্মীয় আবহের পাশাপাশি এটি স্থানীয় মানুষের জন্য আনন্দ-বিনোদনেরও অন্যতম বড় উৎসব।
লালপুর পেস ক্লাবের সভাপতি মো. সালাহ্ উদ্দিন বলেন, “বিলমাড়ার আশুরা মেলা দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য। প্রতিবছর হাজারো মানুষের উপস্থিতিতে এ মেলা প্রাণ ফিরে পায়। আমাদের উদ্দেশ্য শুধু একটি মেলা আয়োজন নয়, বরং গ্রামীণ ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে নতুন প্রজন্মের কাছে পরিচয় করিয়ে দেওয়া। লাঠিখেলা আমাদের লোকজ সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই ঐতিহ্য যেন হারিয়ে না যায়, সেজন্য আমরা নিয়মিত এ ধরনের আয়োজন করে আসছি।
বিলমাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও লালপুর থানা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক অধ্যাপক ছিদ্দিক আলী মিষ্টু বলেন, “আশুরা মুসলিম উম্মাহর জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি দিন। এই দিনকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে বিলমাড়ায় যে মেলার আয়োজন হয়ে আসছে, তা এখন একটি সামাজিক ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। এ ধরনের আয়োজন মানুষের মধ্যে সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি ও পারস্পরিক সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করে। আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণে এমন উদ্যোগ অব্যাহত থাকা প্রয়োজন।
মেলায় ঘুরতে আসা মহারাজপুর গ্রামের আমজাদ হোসেন (৬৫) বলেন, “ছোটবেলা থেকে এই মেলা দেখে আসছি। আগে যেমন আনন্দ ছিল, এখনও সেই আমেজ আছে। বিশেষ করে লাঠিখেলা দেখতে খুব ভালো লাগে। নতুন প্রজন্মও এসব দেখছে, এটিই সবচেয়ে বড় বিষয়।
রোজিনা খাতুন (৪৮) বলেন, “পরিবারের সবাইকে নিয়ে মেলায় এসেছি। অনেকদিন পর এমন প্রাণবন্ত পরিবেশে ঘুরতে পেরে খুব ভালো লাগছে। বাচ্চারাও অনেক আনন্দ করছে।
শিশু সারা (৮) বলে, “আমি নাগরদোলায় চড়েছি, খেলনা কিনেছি। লাঠিখেলা দেখে খুব ভালো লেগেছে। আবার আসতে চাই।
জোহান বিশ্বাস (১০) বলে, “লাঠিয়ালদের খেলা খুব সুন্দর লেগেছে। এত দ্রুত লাঠি চালাতে দেখে আমি অবাক হয়েছি। আগামী বছরও আসব।
লালপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শরিফুল ইসলাম পলাশ বলেন, “মেলায় আগত দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পর্যাপ্ত সংখ্যক পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি সাদা পোশাকে পুলিশ ও স্বেচ্ছাসেবকরা সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছেন। যানজট নিরসন ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এখন পর্যন্ত কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি।
লালপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোঃ বরকত উল্লাহ বলেন, “গ্রামীণ ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষায় এ ধরনের আয়োজন অত্যন্ত ইতিবাচক। তবে আয়োজকদের অবশ্যই নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যবিধি ও সরকারি নির্দেশনা মেনে অনুষ্ঠান পরিচালনা করতে হবে। উপজেলা প্রশাসন সার্বক্ষণিক বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছে এবং দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদান করছে।
স্থানীয়দের মতে, আশুরা উপলক্ষে বিলমাড়ার এই ঐতিহ্যবাহী মেলা শুধু একটি বিনোদন আয়োজন নয়; এটি গ্রামীণ সংস্কৃতি, লোকজ ঐতিহ্য ও সামাজিক বন্ধনের এক অনন্য প্রতীক। প্রতি বছরের মতো এবারও হাজারো মানুষের উপস্থিতিতে মুখর হয়ে উঠেছে বিলমাড়া ডিগ্রি কলেজ মাঠ। দুই দিনব্যাপী এ মেলা ঘিরে পুরো এলাকায় বইছে উৎসবের আমেজ, যা স্থানীয় অর্থনীতি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্যও নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে।