জুলাই নিয়ে চট্টগ্রামের একদল তরুণের উদ্যোগে নির্মিত হয়েছে পূর্ণদৈর্ঘ্য তথ্যচিত্র জুলাই ডায়েরিজ। আজ ৯ই জুলাই রোজ বৃহস্পতিবার গণঅর্থায়নে নির্মিত এই ছবির ট্রেলার প্রকাশিত হয়। পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্রটির প্রদর্শনী এই জুলাইয়েই হবে বলে জানা যায়।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া কিছু তরুণের উদ্যোগে নির্মিত হলেও দেশের বিভিন্ন প্রান্তের আরো অনেক তরুণ তরুণী ক্যামেরার সামনে পেছনে ভূমিকা রেখেছেন। ‘বোধ সংযোগ’ নামক সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্মের অধীনে নির্মিত ছবিটির নির্বাহী প্রযোজক ছিলেন সাইদুল ইসলাম ও পরিচালক ছিলেন লিখন দত্ত।

কোনো একক প্রযোজনার বাইরে গিয়ে গণঅর্থায়নে এই ছবি তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ প্রসঙ্গে লিখন দত্ত বলেন, “ছবির অর্থায়নের সঙ্গে নির্মাণে হস্তক্ষেপেরও একটা বিষয় চলে আসে। যেহেতু এটি রাজনৈতিক ছবি এবং আমরা নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা দলের বাইরে গিয়ে জনতার বয়ান তুলে ধরতে চেয়েছি, তাই গণঅর্থায়নের পথ বেছে নিই।

জুলাই মাসের ২০ তারিখ নাগাদ ছবিটি প্রদর্শনী করার পরিকল্পনা রয়েছে সংশ্লিষ্টদের। ছবি প্রদর্শনীর পরিকল্পনা নিয়ে সাইদুল ইসলাম জানান, “এই ছবির অর্থায়ন কোনো একক ব্যক্তির পয়সায় হয়নি। প্রদর্শনীতেও সেই ধারা অক্ষুণ্ণ রাখতে চাই। আমরা আগ্রহীদের যোগাযোগ করতে বলেছি। চাই জুলাই জুড়ে সারাদেশে এই ছবি দেখানো হোক। ট্রেলার এর লিংক- https://www.facebook.com/reel/1334789905426551

নির্মাণের পেছনের গল্প(জুলাই ডায়েরিজ ফেসবুক পেজের পোস্ট)

১<
এইটা চট্টগ্রামের কিছু তরুণদের জুলাই সিনেমা নির্মাণের গল্প।

জুলাইয়ের অংশীদার অনেকেই। আপাতদৃষ্টিতে ঐক্য সত্ত্বেও সবার গল্প যে ধীরে ধীরে ভিন্নতা পাবে সেটা অভ্যুত্থানের পর নিশ্চিত ছিলাম।

জাতীয়তাবাদী দল, বৈষম্যবিরোধী নেতারা কিংবা ইসলামি দলগুলো যেমন জুলাইয়ের অংশীদার, তেমনই অংশীদার তারাও যারা এখন আর জুলাই নিয়ে কথা বলে না।

আমরা গণমানুষের জুলাই নিয়ে একটা কাজ করতে চেয়েছি। সিদ্ধান্ত ছিল কোনো একক ব্যক্তি বা দলের কাছ থেকে পয়সা নেব না। আর্থিক সহায়তা করলে বয়ানে হস্তক্ষেপের প্রশ্ন আসে, আমরা চাইনি সেটা হোক।

গতবছরের জানুয়ারি থেকে রিসার্চ শুরু করলাম। অর্থায়নের জন্য অনলাইনে প্রচারণা চালিয়েছি। একটি ম্যাগাজিন বের করেছি (বোধ সংযোগ)। বিক্রি করে পয়সা তোলার যতটা না ইচ্ছা ছিল, তারচেয়ে বেশি উদ্দেশ্য ছিল কেউ আর্থিক সহায়তা করলে তাকে এককপি উপহার দিব।

ছবি শ্যুট করেছি ক্লাস, পরীক্ষার ফাঁকে ফাঁকে। এই বছর কুরবানির সময় থেকে একটানা এডিট করে কাজ শেষ করেছি।

২<
তলস্তয়ের একটা কথা আছে, ইতিহাসের ভাষ্য তৈরি করতে প্রথমেই প্রয়োজন রাজা, মন্ত্রী, সেনাপতি এদের সরিয়ে সেইসব সাধারণ, ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ঘটনায় মনোনিবেশ করতে যেগুলো সাধারণ মানুষকে তাড়িত করেছিল।

জুলাই ডায়েরিজকে কেন আমরা বলছি ‘জনতার জুলাই’ এর গল্প, সেইটা বুঝতে উপরোক্ত উদ্ধৃতিটা জরুরি।

আচ্ছা, জুলাই কী মেটিক্যুলাস প্ল্যানের অংশ? এর পেছনে যে মার্কিন অর্থায়ন ও গোয়েন্দা সংস্থা কাজ করেনি আমরা কিভাবে নিশ্চিত হতে পারি? জুলাই নিয়ে আশাবাদী হবার সুযোগ কই? অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী জনতার অধিকাংশ কী ডানপন্থী ছিল? তাহলে এর অর্থ কী দাঁড়ায়? শেখ হাসিনাকে হটিয়ে আমরা কী পেলাম?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর একেকজনের কাছে একেকরকম। এই ছবি নিজের জায়গা থেকে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছে। রাজনৈতিক হিসেব নিকেশগুলো করার চেষ্টা করেছে আপামর জনতার জায়গা থেকে।

অর্থাৎ, জুলাইকে ষড়যন্ত্র হিসেবে নাকচ করে দেওয়া সুযোগ থাকছে না।

তবে এই ছবি একাই গোটা অভ্যুত্থানকে ডিফেন্ড করবে এমনটাও নয়। অভ্যুত্থান ছিল স্বতঃস্ফূর্ত জনবিস্ফোরণ, যার ফলে হাসিনাশাহি ও তার রাজনীতি চিরতরে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেছে বাংলাদেশ থেকে। কিন্তু অভ্যুত্থানের অর্জনকে টেকসই করতে প্রয়োজন শিল্প-সাহিত্যে তাকে ধরে রাখা।

প্রচুর গল্প, উপন্যাস, সিনেমা ও সাংস্কৃতিক কাজ হওয়া চাই। এই ছবি সেই বড় দেয়ালে একটা ইটের গাঁথুনি মাত্র।

জুলাইয়ের পর জুলাইয়ের নামে ভাঙচুর হয়েছে, কিছু মহল চতুরভাবে তাদের স্বার্থসিদ্ধি করে নিয়েছে। কিন্তু ভাঙচুর আর কোলাহলের রাজনীতি দিয়ে অভ্যুত্থানের অর্জন টেকানো যাবে বলে মনে করি না।

৩<
তাই এই যাত্রায় আমাদের অংশীজন হোন। এই ছবি আমরা নিয়ে যেতে চাই মাঠে-ঘাটে-মফস্বলে, অভ্যুত্থানকারী সে সকল সাধারণ নাগরিকের কাছে।

আমরা প্রদর্শনী করতে চাই স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে।

ছবিটি নিয়ে যেতে শ্রমিকদের কাছে। মেহনতি আপামর জনতার কাছে।

অডিটোরিয়ামের আর্টফিল্ম হওয়া থেকে এই ছবিকে রক্ষা করুন।

‘জুলাই ডায়েরিজ’ নির্মাণ করা হয়েছে একক অর্থায়নের বাইরে গিয়ে। প্রদর্শনীতেও সেই ধারা অক্ষুণ্ণ রাখতে চাই।

বাংলাদেশ বা দেশের বাইরে চলচ্চিত্র সংসদ, কালচারাল ক্লাব কিংবা ব্যক্তি উদ্যোগেও যারা প্রদর্শনী করতে চান, আমাদের জানান। আপনাদের নিজ নিজ সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক আয়োজনের অংশ হিসেবেও এই ছবি দেখাতে পারেন।

আমরা চাই যত বেশি সম্ভব উন্মুক্ত প্রদর্শনী করতে। আমাদের এই আহবান ছড়িয়ে দিন।

জুলাইকে, তার হাজার হাজার শহিদ ও আহতদের ত্যাগকে, এই জুলাইয়ের রাজনৈতিক শিক্ষাকে আমরা বিলুপ্ত হতে না দিই আমাদের সামগ্রিক স্মৃতি থেকে।