পাঁচ বছর আগেও অন্যের বাড়িতে বাঁশের তৈরী নকশি সিলিং বানিয়ে সংসার চলত হাজিমুল ইসলামের। সীমিত আয়ের সংসার আর অভাব অনটনে থেকেও স্বপ্ন দেখেছিলেন কিছু একটা করার। সেই স্বপ্ন বর্তমানে বাস্তবে রূপ নিয়েছে।
গতকাল ১৫ জুলাই দুপুরে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায় তার সাফল্যের দৃশ্য।
দেখা যায়, নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলার উত্তর সোনখুলি এলাকার উদ্যোক্তা হাজীমুল ইসলামের হাতে তৈরি পরিবেশবান্ধব বাঁশের হস্তশিল্প যাচ্ছে দেশ পেরিয়ে বিদেশেও। ইউরোপ, আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক বাজারে যাচ্ছে তাঁর নিজ হাতের তৈরী বাঁশের নকশি পণ্য। বর্তমানে তার প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন প্রায় ২০ জন অভিজ্ঞ নারী-পুরুষের শিল্পী।
বাঁশের তৈরী ওই কুটির শিল্প এখন শুধু একটি সফল ব্যবসাই নয়, বরং গ্রামীণ অর্থনীতির সম্ভাবনাময় নতুন দিগন্ত। বিশ্বজুড়ে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই পণ্যের চাহিদা বাড়তে থাকায় সৈয়দপুরের এই ক্ষুদ্র শিল্পও ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করছেন হাফিমুল।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মাত্র ৫ বছর আগে সামান্য পুঁজি নিয়ে বাঁশের মগ তৈরির মাধ্যমে যাত্রা শুরু করেন হাজীমুল। ইউটিউব দেখে নিজেই পণ্য তৈরির কৌশল রপ্ত করেন তিনি। প্রথমদিকে স্থানীয় বাজারে বিক্রি হলেও পণ্যের মান, নান্দনিক ডিজাইন এবং অনলাইন বিপণনের কারণে দ্রুত পরিচিতি বাড়তে থাকে ওইসব পণ্যের চাহিদা। বর্তমানে সৈয়দপুর ও ঢাকার রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তার তৈরি বিভিন্ন পণ্য বিদেশে যাচ্ছে।
হাজিমুলের কারখানায় তৈরি হচ্ছে বাঁশের ঝুড়ি, লন্ড্রি বাস্কেট, ফলের ঝুড়ি, ট্রে, ফুলের টব, ল্যাম্পশেড, হোম ডেকোর সামগ্রী, শোপিসসহ নানা ধরনের নান্দনিক হস্তশিল্প। দক্ষ কারিগরদের হাতে তৈরি এসব পণ্য বিদেশি ক্রেতাদের কাছেও ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে।
উদ্যোক্তা হাজীমুল ইসলাম জানান, শুরুর দিকে অনেক কষ্ট ও সংগ্রাম করতে হয়েছে তাঁর। পুঁজি তেমন একটা ছিল না, বাজারও ছিল সীমিত। কিন্তু তারপরও মানসম্মত পণ্য তৈরির চেষ্টা অব্যাহত রেখেছি। এখন দেশের পাশাপাশি বিদেশ থেকেও অর্ডার আসছে। সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ ও সরকারি সহায়তা পেলে উৎপাদন কয়েক গুণ বাড়ানো সম্ভব বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, আগে অন্যের বাড়িতে নকশি সিলিং তৈরির কাজ করে সংসার চালাতাম। পরে ইউটিউব দেখে বাঁশের মগ তৈরি শুরু করি। সেখান থেকেই পথচলা। এখন আমার তৈরি পণ্য রাঙামাটি, খাগড়াছড়িসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যাচ্ছে। বায়ারের মাধ্যমে ইউরোপের বাজারেও রপ্তানি হচ্ছে। এখানে কাজ করে মাসে প্রায় ৪০ হাজার টাকা আয় করতে পারি। শুধু আমার নয়, এখানে কাজ করে অনেক পরিবারের জীবিকাও চলছে। সরকারি প্রশিক্ষণ ও সুদমুক্ত ঋণের ব্যবস্থা হলে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান দুটোই বাড়বে বলে জানান তিনি।
কারখানার কর্মী আঁকলিমা, মমতা ও সাদিয়া জানান , আগে আমাদের স্থায়ী কোন আয় ছিল না। গত ৪ বছর থেকে এখানে কাজ করে সংসারের খরচ চালাতে পারছি। নিজের আয় দিয়ে সন্তানদের লেখাপড়ার খরচও চালাতে পারছি। আব্দুল করিম নামের অপর এক কর্মী বলেন, প্রতিটি পণ্যই যত্ন সহকারে তৈরি করতে হয়। আমাদের হাতে তৈরি বাঁশের পণ্য বিদেশে যাচ্ছে এটা আমাদের জন্য গর্বের বিষয়।
সৈয়দপুর বিসিক নগরীর সভাপতি আমিনুল ইসলাম বলেন, প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা উচিত। একই সাথে দেশ বিদেশে বাংলাদেশের মুখ উজ্জ্বলকারি উদ্যোক্তা হাজিমুলকে বিনাসুদে ব্যাংক থেকে টাকা দেওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি।
এবিষয়ে সৈয়দপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারাহ্ ফাতিহা তাকলিমা বলেন, হাজিমুলের হাতের তৈরি বাঁশের পণ্যের কথা শুনেছি। ২/১ দিনের মধ্যে তাঁর তৈরীকৃত পণ্যের খোঁজ খবর নিয়ে কিভাবে তার বাশের তৈরী পণ্যে উৎপাদন ও বাজার সম্প্রসারণ করা যায় সেজন্য সরকারের পক্ষ থেকে সহায়তার ব্যবস্হা করা হবে বলে জানান তিনি।