জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর পার হলেও দৃশ্যমান বিচার না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শহীদ পরিবারের সদস্য ও আহতরা। গণহত্যার দ্রুত বিচার, অপরাধীদের শাস্তি এবং শহীদ ও আহত পরিবারগুলোকে পুন:র্বাসনের দাবি জানিয়েছে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো। দেশের বিভিন্ন আদালতে বেশ কিছু মামলার বিচারকাজ ও তদন্ত চলমান থাকলেও শহীদ পরিবারগুলো দৃশ্যমান ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের পরিবারগুলো।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান উপলক্ষে বুধবার (৫ আগস্ট) ভোলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে জেলা প্রশাসন আয়োজিত আলোচনাসভা এবং শহীদ পরিবার ও আহত জুলাইযোদ্ধাদের সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়। সেখানে ক্ষোভ প্রকাশ করেন পরিবারগুলোর সদস্যরা। তারা দ্রুত গণহত্যার বিচার ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের পাশাপাশি শহীদ পরিবার ও আহতদের পুনর্বাসনের দাবি জানান।
ভোলার লালমোহনের শহীদ হাবিবুল্লাহর মেয়ে ফাতেমা বেগম বলেন, আজকের দিনটি সবার জন্য স্মরণীয় হলেও আমাদের জন্য দুঃখ ও বেদনার। ঈদসহ বিভিন্ন উৎসবের দিনে আমরা আমাদের স্বজনদের খুবই কষ্টের সঙ্গে স্মরণ করি। আমার বাবা একজন সাধারণ মাইক্রোবাসচালক ছিলেন।
ফাতেমার ভাষ্য, এই আন্দোলনে বেশির ভাগ সাধারণ মানুষ জীবন দিয়েছে। কিন্তু আজ আমরা সাধারণ বলে আমাদের সেভাবে মূল্য দেওয়া হয় না। একজন শহীদের সন্তান হিসেবে আমি গর্ববোধ করি। কিন্তু আমরা দেখি আমাদের অনেকভাবে অপমান করা হয়।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে ফাতেমা বেগম আরো বলেন, আজ আমরা দেখি আমাদের জুলাই শহীদদের নিয়ে কটাক্ষ করা হয়। অনেকে খারাপ মন্তব্য করে এবং জুলাই অস্বীকার করে। যারা এগুলো করেন তাদের বলব একটিবার আমাদের জায়গায় দাঁড়িয়ে দেখেন স্বজন হারানো বেদনা কতটা কষ্টের। সরকারের কাছে আমার একটাই দাবি প্রতিটি হত্যার দ্রুত বিচার বাস্তবায়ন করা হোক। একইসঙ্গে শহীদ পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি আহত অসহায় পরিবারের পুর্নবাসনের ব্যবস্থা করতে সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি।
বোরহানউদ্দিন উপজেলার শহীদ মো. সোহেল রানার স্ত্রী মোছা. সেলিনা খাতুন বলেন, আমার স্বামী ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ঢাকায় পুলিশের গুলিতে নিহত হন। তিনি জুলাই অভ্যুত্থানে সক্রিয় অংশ নেন। তিনি বলেন, প্রতিদিনের মতো ৫ আগস্ট আন্দোলনে বের হওয়ার সময় আমাকে বলেছিল আমি যাচ্ছি। যদি আমার কিছু হয়ে যায়, তাহলে আমার সন্তানকে দেখে রাইখো। আজ এই দিনে আমাদের দাবি জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করতে হবে, যাতে আর কোনো মায়ের কোল খালি না হয়।
হাসনাইনের সঙ্গে আমার দুই বছরের সংসার ছিল। তিনি যখন শহীদ হন, আমার ছোট মেয়ে রাইসার বয়স দুই বছর। এখন তার বয়স প্রায় চার। সে এখন সকাল-সন্ধ্যা বাবাকে খোঁজে। বাবা বাবা করে ডাকে, কিন্তু বাবা আসে না। কথাগুলো বলছিলেন জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ হাসনাইনের স্ত্রী রুমা বেগম। ২৪ সালের ১৯ জুলাই রাতে ঢাকার মোহাম্মদপুর সাতমসজিদ রোডে গুলিতে নিহত হন হাসনাইন। তার গ্রামের বাড়ি ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার রসুলপুর ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ডে।
স্বামী হত্যার বিচার দাবি করে রুমা বেগম বলেন, হাসনাইন ঢাকার রায়ের বাজার আকাশ ডিজিটাল কেবলে চাকরি করতেন। তিনি কোনো রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। তিনি বলেন, রাইসাকে নিয়ে আমার এখন অনিশ্চয়তার জীবন। কোথায় যাব, কী করব; বাচ্চাটির ভবিষ্যৎ কী হবে, তা ভেবে পাচ্ছি না। বর্তমানে আমি ভোলা সদর উপজেলার ইলিশা ইউনিয়নের জংশন এলাকায় আমার বাবার বাড়িতে থাকি। অন্তবর্তীকালীন সরকারের আমলে কিছু সহযোগিতা পেয়েছি। তা দিয়ে তো আর আমার জীবন ও সন্তানের খরচ চলে না। রুমা আরো বলেন, সরকার যদি আমার মেয়ের শিক্ষার ব্যবস্থার পাশাপাশি আমাকে যদি একটি চাকরি দেয়, তাহলে সন্তানকে নিয়ে কোনো রকম চলতে পারতাম।
আরো জানা গেছে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে দ্বীপ জেলা ভোলার ৪৭ জন শহীদ হন। এদের মধ্যে ৪৬ জনই ঢাকায় বসবাস করতেন। ২০২৪ সলের ১৬ জুলাই থেকে ৫ আগস্টের মধ্যে নিহত হন তারা। শহীদের মধ্যে রয়েছেন ছাত্র, দোকান কর্মচারী, ট্রাকের চালক ও হেলপার, রাজমিস্ত্রি, পোশাককর্মী, ফুটপাতের দোকানদার, সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক, মসজিদের ইমাম, রিকশাচালক ও শ্রমিক। শহীদ হওয়ার দুই বছর পার হলেও পরিবারগুলোতে এখনো থামছে না স্বজনহারাদের কান্না। অনেক পরিবার একামাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে অসহায় জীবনযাপন করছে। এ ছাড়া জুলাই আন্দোলনে আহত হয় জেলার দুই শতাধিক মানুষ।
সরকারি গেজেট অনুযায়ী ভোলা জেলায় জুলাই শহীদের সংখ্যা ৪৭ জন। তারা সদর উপজেলার ১২ জন হলেন ইলেক্ট্রিক মিস্ত্রি মো. শামিম হাওলাদার (৩৮), স্কুল শিক্ষার্থী মিরাজ ফরাজী (১৮), রিকশাচালক মো. ইমন (২২), আসবাব ব্যবসায়ী মো. দেলোয়ার (৩৬), মুদি দোকানদার মো. মহিউদ্দিন (২৬), বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী জুলফিকার আহমেদ শাকিল (২৩), নিরাপত্তাকর্মী আলাউদ্দিন মল্লিক (৫৭), শ্রমিক মো. রনি (২৩), ছাতা মেরামতকারী মো. জসিম উদ্দিন (৪৪), প্রাইভেট কারের চালক মো. বাবুল (৪০), শ্রমিক জহিরুল ইসলাম শুভ এবং দোকান কর্মচারী মো. হাছান (১৮)।
দৌলতখান উপজেলার ২ জন হলেন- রাজমিস্ত্রি মো. রিয়াজ (২৬) ও গাড়ী চালক মো. শহিন (২৪)। বোরাহানউদ্দিন উপজেলার ৯ জন হলেন বিকাশকর্মী মো. নহিদুল ইসলাম (২১), ট্রাক শ্রমিক মো. সুজন (২২), রাজমিস্ত্রি মো. ইয়াছিন (২৩), রিকশাচালক মো. জামাল উদ্দিন (৩৫), কলেজ শিক্ষার্থী দীপ্ত দে (২২), গৃহকর্মী লিজা আক্তার (২৩), দোকান কর্মচারী মো. নয়ন (৩৪) এবং পোশাককর্মী মো. জাকির হোসেন (২৬) ও মো. সোহেল রানা (২২)। আর তজুমদ্দিন উপজেলায় একজন হলেন ব্যবসায়ী মো. মনির হোসেন (৩৪)।
লালমোহন উপজেলার ১১ জন হলেন হোটেল কর্মচারী মো. আরিফ (১৭), লন্ড্রি দোকানি মো. মোছলেহ উদ্দিন (৩৫), রিকশাচালক মো. আক্তার হোসেন (৩৫), মসজিদের ইমাম মুফতি শিহাবউদ্দিন (৩০), মিষ্টির দোকানের কর্মচারী মো. শকিল (২০), মাইক্রোবাস চালক মো. হাবিবুল্লাহ (৪০), হোটেল কর্মচারী মো. সাইদুল (১৪), কোম্পানির বিক্রয়কর্মী মো. ওমর ফারুক (১৭), সিএসজিচালিত অটোরিকশার চালক মো. সবুজ (২১), ট্রাকের হেলপার মো. আক্তার হোসেন (২৭) এবং সবজি বিক্রেতা মো. হাসান (৩০)।
চরফ্যাশন উপজেলার ১২ জন হলেন ফুটপাতের দোকানি মো. সিয়াম (১৫), বেসরকারি চাকরিজীবী মো. রাকিব মোল্লা (২৫), কোম্পানির বিক্রয়কর্মী মো. সোহাগ (১৭), রাজমিস্ত্রি মো. বাহাদুর হোসেন মনির (১৮), পোশাককর্মী মো. ফজলু (২৮), রাজমিস্ত্রি মো. ফজলে রাব্বি (২০), ইন্টারনেটকর্মী মো. হাসনাইন (২৫), কলেজছাত্র মো. মমিন (১৯), ট্রাকচালক মো. হোসেন (২৫), দোকানকর্মচারী মো. হাবিবুর রহমান (২৯), মুদি দোকানের কর্মচারী মো. ওমর ফারুক (১৬) এবং দর্জি মো. তারেক (১৮)।
ভোলার জেলা প্রশাসক ডা. শামীম রহমান বলেন, বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী এবারের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবসের প্রতিপদ্য নির্ধারণ করেছেন ‘জুলাই চেতনায় গড়বো দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’। তিনি বলেন, সরকার জুলাই আন্দোলনে শহীদ পরিবার ও আহত যোদ্ধাদের জন্য আর্থিক সহায়তা, সঞ্চয়পত্র, মাসিকভাতা, এককালীন অনুদান ও শিক্ষাসহায়তা কার্যক্রম রেখেছেন। এর বাইরে জেলা পরিষদের অর্থায়নে শহীদদের কবর বাঁধাই করে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া জুলাই শহীদ ও আহত যোদ্ধাদের প্রতি বর্তমান সরকারের নজর রয়েছে। দাবি বাস্তবায়নে এই সরকার আন্তরিক। একই সঙ্গে জেলা প্রশাসনও সব সময় তাদের পাশে রয়েছে বলেও জানান তিনি।