রাজধানী ঢাকার চারপাশের নদীগুলোতে পরিবেশবান্ধব ও সাশ্রয়ী ওয়াটার বাস চলাচলের উদ্যোগ নিয়েছে বর্তমান সরকার। অথচ সেই সরকারি পরিকল্পনার পথেই বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ডিএনসিসির আফতাবনগর-বনশ্রী সংযোগকারী নির্মাণাধীন নড়াই সেতু। সেতুর চলাচলের রাস্তার ওপরের অংশ থেকে খিলানের (আর্চ) উচ্চতা ১১ মিটারের কম থাকায় নড়াই নদীতে ওয়াটার বাস কিংবা নদীখননকারী স্কাভেটর চলাচল করতে পারবে না।

এমন প্রেক্ষাপটে নড়াই সেতুর উচ্চতা বাড়িয়ে রামপুরা ব্রিজ থেকে বালু নদী পর্যন্ত ওয়াটার বাস সার্ভিস চালু করার দাবি এবং উধাও হয়ে যাওয়া নড়াই নদীর সাইনর্বোড পুনঃস্থাপনের জোর দাবিতে এক মানবন্ধন কর্মসূচির আয়োজন করেছে ‘নোঙর বাংলাদেশ’। মানববন্ধনে সংগঠনের নেতৃবৃন্দ ও সর্বস্তরের পরিবেশকর্মীরা অংশ নিয়ে নড়াই নদী রক্ষার স্বার্থে ৩ দফা দাবি তুলে ধরেন।

মানববন্ধনে সভাপতির বক্তব্যে নোঙর বাংলাদেশের সভাপতি সুমন শামস বলেন, “নদী একটি জীবন্ত সত্তা—উচ্চ আদালতের এমন স্পষ্ট রায় থাকা সত্ত্বেও তা উপেক্ষা করে নড়াই নদীকে খাল উল্লেখ করে নদীর গলায় ফাঁস লাগানো হচ্ছে। যেখানে সরকার ঢাকার নদীপথকে গণপরিবহনের আওতায় আনতে ওয়াটার বাস চালুর পরিকল্পনা করছে ঠিক তখন দেখা যাচ্ছে নদীর পানি থেকে সর্বচ্চ ১১ মিটার উচ্চতার কম রয়েছে। বর্ষাকালে নড়াই সেতুর নিচ দিয়ে ওয়াটার বাস তো দূরের কথা, নদী সুরক্ষায় পণ্যবাহী বড় নৌকা, স্কাভেটর বা ড্রেজারও প্রবেশ করতে পারবে না।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, নদীটির সীমানা ও পরিচয় মুছে ফেলার অংশ হিসেবেই ২০২৩ সালের ১৪ অক্টোবর নড়াই নদী রক্ষায় সচেতনতা বাড়াতে মানববন্ধন এবং নৌ-র‌্যালি করে ছিলেন নদী কর্মী ও পরিবেশবিদরা। তখন রামপুরা ব্রিজের পাশে ‘নড়াই নদী’ নামফলকটি স্থাপন করে নোঙর বাংলাদেশ। গত ২৬ জুন সাইনবোর্ডটি উধাও হয়ে যায়।

নড়াই নদীর অস্তিত্ব মুছে ফেলা এবং নদী দখলের হীন উদ্দেশ্যে ভূমি খেকো স্বার্থান্বেষী মহল সুপরিকল্পিতভাবে সাইনবোর্ডটি সরিয়ে নদী হত্যার পরিকল্পনা করেছে। এ ঘটনায় গত ১৩ জুলাই, সোমবার রাতে পরিবেশ ও নদী রক্ষায় কাজ করা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন নোঙর বাংলাদেশ-এর প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি সুমন শামস রামপুরা থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন। গ্রহণের পর রামপুরা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) জাহাঙ্গীর হোসেন বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্তের আশ্বাস দিয়ে ছিলেন।

মানববন্ধনে নোঙর বাংলাদেশ ও পরিবেশকর্মীদের পক্ষ থেকে ৩টি সুনির্দিষ্ট দাবি পেশ করা হয়:

১. বর্ষায় নৌপথ সচল রাখতে অবিলম্বে নড়াই সেতুর উচ্চতা বাড়িয়ে হাতির ঝিল/রামপুরা ব্রিজ থেকে বালু নদী পর্যন্ত ওয়াটার বাস, নদী খননের স্কাভেটর ও অন্যান্য নৌযান চলাচল ব্যবস্থা চালু করতে হবে।

২. উধাও হয়ে যাওয়া ‘নড়াই নদী’ নামফলক অবিলম্বে পূর্বের স্থানে পুনঃস্থাপন এবং নড়াই নদীর দূষণ বন্ধ করে উভয় পাশের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করতে হবে।

৩. বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা ও বালু নদীর ওপর মাস্টারপ্ল্যানের আওতায় চিহ্নিত কম উচ্চতার ১৩টি সেতু ভাঙা এবং উচ্চতা বাড়িয়ে পুনর্নির্মাণ করতে হবে (যার মধ্যে এলজিইডি-র ৬টি, সেতু বিভাগের ৬টি এবং রেলওয়ের ১টি)।

মানববন্ধনে পরিবেশবাদীরা সতর্ক করে বলেন, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের তথ্যমতে নড়াই নদী কোনো খাল নয়, একটি জীবন্ত সত্তা এবং হাতিরঝিল ও বালু নদীর সংযোগকারী ৮ কিলোমিটারের একটি ঐতিহাসিক নদী। অনতিবিলম্বে সেতুর নকশা সংশোধন করে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও নৌ-চলাচলের পথ সুগম করা না হলে রামপুরা-আফতাবনগর এলাকা স্থায়ী জলাবদ্ধতার শিকার হবে।

এ সময় বক্তব্য রাখেন নদী গবেষক আলিউদ্দিন আহম্মেদ. নোঙর বাংলাদেশ এর সাংগঠনিক সম্পাদক ফজলে রাব্বি সানি, বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা জামিলুর রহমান নয়ন, আগামীর বাংলাদেশ এর সভাপতি আলমগীর পারভেজ, নদী কর্মী ও সমাজ সেবক মো. আজিজ, তরিকত ফেডারেশনের সমাজকল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক সেলিম ভূঁইয়া, পরিবেশ কর্মী মোহাম্মদ আলী মিন্টু, পরিবেশ সংগ্রামী যোদ্ধা জলিল উল হক ডেবিট এবং মোঃ ফারুক হোসেন।