চার বোনের মধ্যে সবার ছোট। বাবা কৃষক, মা গৃহিণী। প্রত্যন্ত এলাকার একটি সাধারণ পরিবারের সন্তান হয়েও খেলাধুলার প্রতি অদম্য আগ্রহ তাকে পৌঁছে দিয়েছে জাতীয় পর্যায়ের ফুটবলের মঞ্চে। মাঠে তার পরিচয় দুই নম্বর জার্সির ডিফেন্ডার হিসেবে। আর সেই মিম আক্তার সুমিই এবার প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে ক্রেস্ট ও মেডেল গ্রহণ করে গর্বিত করেছে বগুড়ার নন্দীগ্রাম উপজেলাকে।
মিম আক্তার সুমি নন্দীগ্রাম উপজেলার বুড়ইল ইউনিয়নের ধুন্দার দারোগাপাড়া গ্রামের কৃষক মামুনুর রশিদ ও গৃহিণী আকলিমা বিবির মেয়ে। ২০১২ সালের ২৪ জুলাই জন্ম নেওয়া সুমি ধুন্দার উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী। চার বোনের মধ্যে সে সবার ছোট। বড় তিন বোনেরই বিয়ে হয়েছে। পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য সীমিত হলেও মেয়ের খেলাধুলার প্রতি আগ্রহে কখনো বাধা দেননি বাবা-মা।
যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অধীন ক্রীড়া পরিদপ্তরের আয়োজনে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ অনূর্ধ্ব-১৪ বালিকা ফুটবল প্রতিযোগিতায় নিবন্ধনের মাধ্যমে সুমির নতুন পথচলা শুরু হয়। প্রথমে নন্দীগ্রাম উপজেলা দলের হয়ে উপজেলা পর্যায়ে মাঠে নামে সে। উপজেলা পর্যায়ের খেলায় দুপচাঁচিয়া উপজেলার বিপক্ষে নন্দীগ্রাম দল ১-০ গোলে পরাজিত হয়ে রানারআপ হয়। তবে দলের হয়ে সুমির পারফরম্যান্স তাকে পরবর্তী ধাপের জন্য এগিয়ে দেয়।
এরপর বগুড়া জেলা দল গঠন করা হলে সেখানে জায়গা করে নেয় সুমি। জেলা পর্যায়ে বগুড়া জেলার হয়ে রাজশাহী জেলার বিপক্ষে মাঠে নামে সে। নির্ধারিত সময়ে ম্যাচের ফল নিষ্পত্তি না হওয়ায় টাইব্রেকারে জয় পায় বগুড়া জেলা দল। সেই জয়ের মধ্য দিয়ে সুমির সামনে খুলে যায় আরও বড় মঞ্চে খেলার সুযোগ।
জাতীয় পর্যায়ে সুমি রাজশাহী অঞ্চলের হয়ে অংশগ্রহণের সুযোগ পায়। তার দল জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় ফাইনালে ওঠে। ঢাকার আর্মি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হয় চূড়ান্ত প্রতিযোগিতা। ফাইনালে রাজশাহী অঞ্চলের মুখোমুখি হয় রংপুর অঞ্চল। প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এ ম্যাচে রংপুর অঞ্চল জয়ী এবং রাজশাহী অঞ্চল রানারআপ হয়। চূড়ান্ত প্রতিযোগিতা শেষে পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে ক্রেস্ট ও মেডেল গ্রহণ করে মিম আক্তার সুমি।
সুমি বলে, আমার বাবা কৃষক। বাবা-মায়ের উৎসাহ ও অনুপ্রেরণায় খেলাধুলা করি। নতুন কুঁড়িতে অংশ নেওয়ার আগে স্কুলের বিভিন্ন খেলায় অংশ নিয়েছি। তখন প্রতিবেশীদের কেউ কেউ আমাকে অন্য চোখে দেখতেন। কিন্তু কারও কথায় তোয়াক্কা না করে আমি খেলা চালিয়ে গেছি। এখন তারাই আমাকে বাহবা দিচ্ছেন। সে আরও বলে, আমি জীবনে বড় খেলোয়াড় হতে চাই। কখনো ভাবিনি দেশের প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে পুরস্কার গ্রহণ করতে পারব। এই মুহূর্তটি আমার জন্য অনেক গর্বের। আমার এই সাফল্যের কৃতিত্ব সবচেয়ে বেশি আমার বাবা ও মায়ের।
সুমির বাবা মামুনুর রশিদ বলেন, আমি কৃষিকাজ করি। আমাদের সামর্থ্য খুব বেশি নয়। ছোটবেলা থেকেই সুমির খেলাধুলার প্রতি অনেক আগ্রহ। মেয়ের খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ দেখে তাকে কখনো বাধা দিইনি। আজ সে জাতীয় পর্যায়ে খেলেছে এবং প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে পুরস্কার নিয়েছে, এর চেয়ে আনন্দের আর কী হতে পারে।
সুমির এক প্রতিবেশী বলেন, আগে অনেকেই মেয়েটিকে খেলাধুলা করতে দেখে নানা কথা বলতেন। কিন্তু সুমি কারও কথায় কান দেয়নি। নিজের মতো করে খেলা চালিয়ে গেছে। এখন জাতীয় পর্যায়ে খেলে সে আমাদের এলাকার সম্মান বাড়িয়েছে। আমরা সবাই তার জন্য গর্বিত।
ধুন্দার উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বলেন, সুমি আমাদের বিদ্যালয়ের মেধাবী ও ক্রীড়াপ্রেমী শিক্ষার্থী। পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলায়ও তার আগ্রহ রয়েছে। জাতীয় পর্যায়ে তার অংশগ্রহণ আমাদের বিদ্যালয়ের জন্য গর্বের। আমরা চাই, সে ভবিষ্যতে আরও ভালো খেলুক এবং দেশের নারী ফুটবলে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করুক।
নন্দীগ্রাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শারমিন আরা বলেন, উপজেলার একটি প্রত্যন্ত এলাকার কৃষক পরিবারের মেয়ে জাতীয় পর্যায়ে ফুটবল খেলে সাফল্য অর্জন করেছে, এটি অত্যন্ত আনন্দ ও গর্বের বিষয়। সুমির এই সাফল্য উপজেলার অন্য কিশোরীদের খেলাধুলায় এগিয়ে আসতে উৎসাহিত করবে। তার প্রতিভা বিকাশে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও উৎসাহ অব্যাহত রাখা হবে।
বগুড়া জেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক আলহাজ্ব মোশারফ হোসেন এমপি বলেন, আমার উপজেলার মেয়ে মিম আক্তার সুমি জাতীয় পর্যায়ের ফুটবল প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে যে সাফল্য অর্জন করেছে, তা আমাদের জন্য অত্যন্ত গর্বের বিষয়। তার এই অর্জন নন্দীগ্রামের ক্রীড়াঙ্গনের জন্য একটি অনুপ্রেরণার দৃষ্টান্ত। আমি সুমির উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করছি। সুমি এখন শুধু পরিবারের নয়, পুরো উপজেলার গর্ব।