জামালপুরের মাদারগঞ্জে সাত বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় গভীর শোক ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন (এমজেএফ)। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, শিশুটিকে যৌন নির্যাতনের পর হত্যা করা হয় এবং পরে একটি বাড়ির মেঝের নিচ থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এই নৃশংস ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে শিশুটির পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছে এমজেএফ।

জামালপুরের ঘটনাটিকে বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে নারী ও শিশুকে ধর্ষণ, যৌন নির্যাতন, হয়রানি ও হত্যার যেসব ঘটনা সামনে এসেছে, তা উদ্বেগজনক একটি ধারাবাহিকতার ইঙ্গিত দেয়। বারবার একই প্রশ্ন সামনে আসছে: ঘর, স্কুল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কমিউনিটিতে নারী ও শিশুরা কতটা নিরাপদ, এবং অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে জবাবদিহির আওতায় আনা হচ্ছে কি না।

সাম্প্রতিক তথ্যও পরিস্থিতির গুরুতর চিত্র তুলে ধরে। হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, শুধু ২০২৬ সালের আগস্ট মাসে অন্তত ২৪৯ নারী ও শিশু সহিংসতার শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৭৯ জন ধর্ষণের শিকার, যাঁদের ৪৬ জনই শিশু। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত অন্তত ৪০০ নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন এবং ধর্ষণের পর ৩৭ জনকে হত্যা করা হয়েছে। এসব তথ্য নথিভুক্ত ও প্রকাশিত ঘটনার ভিত্তিতে তৈরি, তাই সহিংসতার প্রকৃত মাত্রা এর চেয়েও বেশি হতে পারে।

এমন ঘটনা কয়েক দিনের সংবাদ হয়ে জনমনোযোগ থেকে হারিয়ে গেলে অস্বাভাবিক নৃশংসতাকেও স্বাভাবিক বলে মেনে নেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। এমজেএফ মনে করে, নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতাকে কোনোভাবেই স্বাভাবিক বা অনিবার্য হিসেবে মেনে নেওয়া যায় না।

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম বলেন, নারী ও শিশুকে বারবার ধর্ষণ, নির্যাতন ও হত্যা করা গভীরভাবে উদ্বেগজনক এবং কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। একটি শিশু ঘরে, স্কুলে যাওয়ার পথে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এবং নিজের কমিউনিটিতে নিরাপদ থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। এসব ঘটনা যেন কয়েক দিনের জন্য সংবাদ শিরোনাম হয়ে পরে জনমনোযোগ থেকে হারিয়ে না যায়।

প্রতিটি ঘটনার দ্রুত তদন্ত করতে হবে, দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে এবং সুরক্ষা ও প্রতিরোধব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে হবে। মা-বাবা ও অভিভাবকদেরও শিশুদের নিরাপত্তার বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে, তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে এবং ভয়, মানসিক অস্থিরতা বা ঝুঁকির কোনো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত সাড়া দিতে হবে। শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা পরিবার, প্রতিষ্ঠান, কমিউনিটি ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত দায়িত্ব।

এমজেএফ ধারাবাহিকভাবে বলে আসছে, নারী ও শিশুর সুরক্ষা কেবল অপরাধ ঘটে যাওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর নির্ভর করতে পারে না। চলতি বছরের শুরুতে এমজেএফসহ বিভিন্ন অধিকারভিত্তিক সংগঠন নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতাকে জাতীয় জরুরি পরিস্থিতির মতো গুরুত্ব দিয়ে মোকাবিলা এবং ধর্ষণ, যৌন সহিংসতা, নির্যাতন ও হত্যার বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার নীতি গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছিল। মাদ্রাসা ও অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কার্যকর যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি গঠনসহ শক্তিশালী প্রতিরোধব্যবস্থার দাবিও জানিয়েছে এমজেএফ।

এমজেএফ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি প্রতিটি ঘটনায় দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত, ন্যায়সংগত ও সময়োপযোগী বিচার এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানাচ্ছে। সহিংসতার শিকার ব্যক্তি ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে চিকিৎসা, মনোসামাজিক সহায়তা, আইনি সহায়তা ও প্রয়োজনীয় সুরক্ষা দিতে হবে। একই সঙ্গে তাঁদের গোপনীয়তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে। শিশুদের দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোতে কার্যকর সুরক্ষাব্যবস্থা এবং নিরাপদ অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা থাকতে হবে।

জামালপুরের ঘটনাটি যেন কয়েক দিনের মধ্যে জনমনোযোগ থেকে হারিয়ে যাওয়া আরেকটি মর্মান্তিক ঘটনা হয়ে না দাঁড়ায়। নারী ও শিশুর অধিকার, মর্যাদা ও নিরাপত্তা বাস্তবে নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান ও সমাজের ধারাবাহিক ও কার্যকর পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছে।