বাংলাদেশের জলবায়ু নীতি ও কপ-৩১-এর জাতীয় অবস্থানপত্রে যুব প্রতিনিধি ও তরুণ শ্রমিকদের উদ্বেগ, অভিজ্ঞতা ও দাবি প্রতিফলিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে। তাঁদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন, অটোমেশন ও সবুজ রূপান্তর ইতিমধ্যেই কর্মসংস্থান, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা, দক্ষতা ও জীবিকার ওপর প্রভাব ফেলছে।
কপ-৩১-এর জন্য শ্রমিক অবস্থানপত্র প্রণয়নবিষয়ক এক পরামর্শ কর্মশালায় তারা এ আহ্বান জানান। কর্মশালায় যুব সংগঠন ও তরুণ শ্রমিকদের অভিজ্ঞতা ও মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। তাদের চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করা এবং শ্রমিকবান্ধব ন্যায্য রূপান্তরের জন্য সুপারিশ তৈরির লক্ষ্যে এ পরামর্শ কর্মশালার আয়োজন করা হয়। কপ-৩১ কে সামনে রেখে শ্রমিক অবস্থানপত্র ও শ্রমিক সনদ তৈরির চলমান প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন (এমজেএফ), বাংলাদেশ লেবার ফাউন্ডেশন (বিএলএফ) ও ন্যাশনাল অ্যালায়েন্স ফর জাস্ট ট্রানজিশন বাংলাদেশ (এনএজেটিবি) এ কর্মশালার আয়োজন করে। এতে সহায়তা করে অক্সফাম বাংলাদেশ।
উদ্বোধনী বক্তব্যে বিএলএফের প্রোগ্রাম অফিসার জুবায়ের আলম বলেন, তৃণমূল শ্রমিকদের ঝুঁকি ও দাবিগুলো বাংলাদেশের জাতীয় জলবায়ু অবস্থানে তুলে ধরাই এ পরামর্শ কর্মশালার লক্ষ্য। তিনি বলেন, ন্যায্য রূপান্তর প্রক্রিয়ায় তরুণদের কণ্ঠ অপরিহার্য। নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের দিকে অগ্রসর হওয়ার ক্ষেত্রে শ্রমিকের কর্মসংস্থান, জীবিকা ও সামাজিক সুরক্ষার বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে।
মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের ফ্যাশন ফরওয়ার্ড প্রকল্পের প্রকল্প সমন্বয়কারী পাবলো নেরুদা বলেন, যথাযথ দক্ষতা, বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত না হলে অটোমেশন ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তন শ্রমিকদের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তিনি বলেন, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নীতি আলোচনায় শ্রমিকদের মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা প্রতিফলিত হওয়া জরুরি।
দলীয় আলোচনায় যুব প্রতিনিধি ও তরুণ শ্রমিকেরা তাঁদের দাবিগুলো চারটি মূল বিষয়ের অধীনে তুলে ধরেন: জলবায়ু সুশাসন, শোভন কাজ ও সামাজিক সুরক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও পেশাগত স্বাস্থ্য-নিরাপত্তা, এবং জলবায়ু অর্থায়ন। জলবায়ু সুশাসনের ক্ষেত্রে অংশগ্রহণকারীরা জলবায়ু বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে যুব ও শ্রমিকদের অর্থবহ প্রতিনিধিত্ব, শ্রমিকদের জন্য নির্দিষ্ট জলবায়ু অর্থায়ন বরাদ্দ এবং শ্রমিকদের দক্ষতা, কর্মসংস্থানের অবস্থা ও রূপান্তরজনিত চাকরি হারানোর তথ্য সংরক্ষণের জন্য একটি জাতীয় ডেটাবেইস তৈরির দাবি জানান।
অংশগ্রহণকারীরা এমন একটি শ্রমিকবান্ধব ন্যায্য রূপান্তরের আহ্বান জানান, যেখানে শোভন কাজ, সামাজিক সুরক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, পেশাগত নিরাপত্তা এবং নির্দিষ্ট জলবায়ু অর্থায়ন নিশ্চিত থাকবে। তাঁরা তীব্র তাপপ্রবাহের সময় বেতনসহ বিরতি, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, নিরাপদ পানীয় জল, ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম, শিশুসেবা সুবিধা, তরুণ, নারী ও চুক্তিভিত্তিক শ্রমিকদের জন্য শক্তিশালী সুরক্ষা, সহজলভ্য পুনঃদক্ষতা ও দক্ষতা উন্নয়ন, প্রশিক্ষণকালীন আয় সুরক্ষা, স্বীকৃত সবুজ দক্ষতা সনদ এবং স্পষ্ট কর্মজীবনের পথনির্দেশনার দাবি জানান। যুব অংশগ্রহণকারীরা তাপঝুঁকি মূল্যায়ন, কর্মক্ষেত্রের তাপমাত্রা নির্দেশিকা, কর্মঘণ্টা সমন্বয়, শক্তিশালী নিরাপত্তাব্যবস্থা, সবুজ প্রযুক্তি, বিকল্প কর্মসংস্থান ও জরুরি সহায়তার জন্য নির্দিষ্ট অর্থায়নের সুপারিশ করেন। একই সঙ্গে শ্রমিক ও ট্রেড ইউনিয়নের অংশগ্রহণে স্বচ্ছভাবে পর্যবেক্ষণযোগ্য, জেন্ডার ও স্বাস্থ্য-সংবেদনশীল জলবায়ু অর্থায়নের ওপরও তাঁরা গুরুত্ব দেন।
তারা বলেন, নীতি আলোচনার সঙ্গে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার ব্যবধান কমানো জরুরি। এ জন্য উন্নত তথ্যভিত্তিক ব্যবস্থা, তরুণ শ্রমিকদের সঙ্গে শক্তিশালী সম্পৃক্ততা, সহজ ভাষার উপকরণ, ছোট ভিডিও, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক কনটেন্ট এবং কর্মক্ষেত্র পর্যায়ে ন্যায্য রূপান্তর বিষয়ে সচেতনতা কার্যক্রম বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।
এই পরামর্শ কর্মশালার সুপারিশগুলো কপ-৩১ এর জন্য শ্রমিক অবস্থানপত্র ও শ্রমিক সনদ তৈরিতে সহায়তা করবে, যাতে বাংলাদেশের জলবায়ু নীতি আলোচনায় যুব সংগঠন ও তরুণ শ্রমিকদের দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়। কর্মশালায় পুনর্ব্যক্ত করা হয়, ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্রকে প্রভাবিত করবে এমন নীতি, দক্ষতা, কর্মসংস্থান কৌশল ও জলবায়ু কার্যক্রম প্রণয়নে তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।