পদস্খলিত হলেই পড়ে যেতে হয় নদীতে সংস্কারের উদ্যোগ নেই নদী বেষ্টিত খুলনার দিঘলিয়ার সরলপ্রাণ মানুষের শহরে যাতায়াতের অন্যতম পথ দৌলতপুর খেয়াঘাট। প্রতিনিয়ত এ খেয়াঘাট দিয়ে হাজার হাজার মানুষ নৌকায় করে পারাপার হয়ে থাকে।
স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, রোগী কিংবা ব্যবসায়ী সহ দিঘলিয়ার মানুষের শহরে প্রবেশের সহজ পথ বলা হয়ে থাকে দৌলতপুরের এই খেয়াঘাটকে।
তবে ব্যস্ততম এ খেয়াঘাটটি দীর্ঘদিন ধরে বেহাল অবস্থায় পড়ে রয়েছে। এতে নৌকা পারাপারে প্রতিনিয়ত বিপাকে পড়তে হচ্ছে সাধারণ মানুষ, বৃদ্ধ, শিশু-কিশোর, গুরুতর অসুস্থ রোগী, মোটরসাইকেলসহ সকল শ্রেণীপেশার মানুষদের।
প্রতিনিয়তই খেয়াঘাটের ভঙ্গুর সিঁড়ি দিয়ে নৌকায় উঠতে গিয়ে পদস্খলিত হয়ে নদীতে পড়ে দুর্ঘটনা কবলিত হচ্ছে অনেকেই। বিশাল জনগোষ্ঠীর দিঘলিয়ার অন্যান্য খেয়া ঘাটের তুলনায় দৌলতপুর-দেয়াড়ার মধ্যবর্তী এ খেয়াঘাটি থেকে ভ্যান পারাপার একেবারেই অনুপযোগী।
ঘাটের দৌলতপুর বাজারের অংশে বেহাল সিঁড়ি আর ঘাট থেকে ওঠার রাস্তাটা এতটাই যে সরু, মোটরসাইকেল আরোহীরা দূরের কয়েক কিলোমিটার সড়ক অতিক্রম করে অন্য ঘাট ব্যবহার করে শহরে যাতায়াত করলেও কখনোই দৌলতপুর দেয়াড়ার এই খেয়াঘাট টি ব্যবহার করে তাদের পক্ষে যাতায়াত করা সম্ভব হয় না।
আজ রোববার সকালে সরেজমিনে দেখা যায়, খেয়াঘাটটির দুই প্রান্তের জেটি (ঢালাই রাস্তা) অনেক ঢালু এবং সরু। জেটিতে কোনো প্রকার সিঁড়ি নেই । খাচ কাটার স্থলে পুরোপুরি সমতল।
যে কারণে পিছলে পড়ার ভয়ে পারাপারের যাত্রীরা একজন আরেকজনকে ধরে ধরে নৌকায় উঠতে হচ্ছে। সরেজমিনে আরও দেখা যায়, খেয়াঘাটের দৌলতপুর প্রান্তে ঘাটের সাথেই অবস্থিত দুইতলা ভবনও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। যেকোনো সময়ে ধসে যাওয়ার শঙ্কাও রয়েছে।
এসময়ে দৌলতপুর খেয়াঘাটের মাঝি সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মোঃ রানা বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই এই খেয়াঘাটটি বেহাল অবস্থায় পড়ে আছে। এ খেয়াঘাট থেকে প্রতিদিন অন্তত ১০ হাজারেরও বেশি যাত্রী পারাপার হয়ে থাকে।
এটি ব্যস্ততম খেয়াঘাট হলেও দীর্ঘদিনধরে কোনো প্রকার সংস্কারের দেখা মেলেনি। খেয়াঘাটের জেটি মাটির সাথে মিশে যাওয়ায় নদীতে ভাঁটি হলে যাত্রীসহ মঝিদেরকেও চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। ভাঁটিতে খেয়াঘাটের জেটি থেকে নৌকার অবস্থান অনেক উঁচু হয়ে যায়।
তখন যাত্রীদেরকে হাত ধরে নৌকায় ওঠাতে হয়। শুধু তাই নয় অনেক অসুস্থ ব্যক্তিকে কোলে করে নৌকায় উঠাতে হয়। মাঝে মধ্যে উপায় না পেয়ে খেয়াঘাটের সকল মাঝিরা মিলে নিজস্ব অর্থায়নে খেয়াঘাটের জেটির দু’পাশে জমে থাকা পলিমাটি কেটে অপসারণ করে খেয়াঘাটে ঠিক ভাবে নৌকা ভেড়ানো এবং যাত্রীদের স্বাভাবিক পারাপারের ব্যবস্থা করা হয়।
তবে এভাবে কতদিন সম্ভব বলে সংশয় প্রকাশ করেন তাঁরা। মাঝিরা জানান দৌলতপুর খেয়াঘাটি যাদের আওতায় টেন্ডার দেওয়া হয়েছে তাদের দ্বারা অতিদ্রুত সংস্কার করা হোক। দীর্ঘদিন দৌলতপুর খেয়াঘাটের নৌকা চালক মোঃ জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, দিঘলিয়ার অন্যান্য খেয়াঘাটের তুলনায় এই খেয়াঘাটের জেটিটি অনেক বড়, প্রায় ৪০ ফুট দীর্ঘ।
তবে এই ৪০ফুট জেটিতে (ঢালাই রাস্তা) নেই কোনো পিলার । নদীর পাড়ের মাটির সাথে কোনোরকমে মিশে আছে। যাত্রীরা এই ঢালু, সরু খেয়াঘাট দিয়ে ঠিকভাবে ওঠা নামা করতেই পারে না। পারাপারের সময় একটু বয়স্ক লোক হলেই তাকে কখনও হাত ধরে, কখনও কোলে করে নিয়ে নৌকায় ওঠাতে হয়।
আমরা প্রতিবছরই শুনতে পাই সরকারিভাবে টেন্ডারের মাধ্যমে খেয়াঘাটের ইজারা দেওয়া হয়। টেন্ডার দেওয়ার পর তাঁরা ঘাটের সিঁড়ি ঠিক করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও ৭/৮ বছর ধরে কোনো প্রকার সংস্কারের দেখা মেলেনি।
দৌলতপুর খেয়াঘাটের টোল আদায়কারী আব্দুল আওয়াল বলেন, দীর্ঘদিন ধরে খেয়াঘাটটি শোচনীয় অবস্থায় রয়েছে। আমরা বার বার বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) নিকট খেয়াঘাটটি সংস্কারের কথা বললেও তারা এবিষয়ে কোনো কর্ণপাত করছে না।
এতে করে প্রতিনিয়ত যাত্রীদের সাথে আমাদের কথা-কাটাকাটি সহ বিভিন্ন ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে। পূর্বের তুলনায় যাত্রী পারাপারের সংখ্যাও অনেক কমেছে। খেয়াঘাটের এমন দুর্বিষহ অবস্থা দেখে অনেকেই কষ্ট হলেও সময় বেশি লাগলেও এখন অন্য ঘাট দিয়ে যাতায়াত করছে। আমাদের উপার্জনও পূর্বের তুলনায় কমে গিয়েছে। এমন অবস্থা চলতে থাকলে আমাদের ইজারার মাধ্যমে টেন্ডারের টাকা উত্তোলন করাই কঠিন হয়ে পড়বে।
সূত্রে জানা গেছে, দৌলতপুর খেয়াঘাটটি বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) অধীনে পরিচালিত হচ্ছে। প্রতিবছরই সরকারি মূল্যে টেন্ডারের মাধ্যমে খেয়াঘাটে ইজারাদার নিয়োগ করা হচ্ছে।
কিন্তু কেন, কি কারণে দীর্ঘদিন ধরে খেয়াঘাটের এই বেহাল অবস্থার কোনো প্রকার সংস্কার হচ্ছে না সে বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) খুলনার উপ পরিচালক মোহাম্মদ মাসুদ পারভেজ এ প্রতিবেদককে বলেন।
দৌলতপুর খেয়াঘাটটি সংস্কারের জন্য ইতোমধ্যেই দপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলীর নিকট চাহিদা দিয়েছি এখনও কেন কার্যক্রম শুরু হয়নি বা কেমন পর্যায়ের রয়েছে সেটি নির্বাহী প্রকৌশলীর থেকে জেনে নিতে হবে।
সূত্রে আরও জানা গেছে, সম্প্রতি দিঘলিয়া উপজেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা মাহমুদা খানম ঘাট পাড়াপারের সময় নদীতে পড়ে যায়। উপজেলার সেনহাটি ষ্টার ২নং গেটের বাসিন্দা আবেদা বেগম (৬০) কিছুদিন আগে খেয়াঘাট থেকে নৌকায় ওঠার সময় নদীতে পড়ে গিয়ে হাত পা ভেঙে যায় এবং তার চিকিৎসা বাবদ আনুমানিক ২৫ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে।
তাদের স্বল্প আয়ের সংসারে হঠাৎ এই দূর্ঘটনার স্বীকারে খুবই কঠিনতম অবস্থায় দিন পার করতে হয়েছে। যাত্রীরা এমন দুর্ভোগ, বিড়ম্বনা আর ঝুঁকি নিয়ে খেয়াঘাট পারাপার করলেও কবে নাগাদ এ থেকে মুক্তি মিলবে সেটি এখন সকলের প্রশ্ন? বড় কোনো দুর্ঘটনা অথবা প্রাণহানির পরেই কি কর্তৃপক্ষের টনক নড়বে?