জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের ন্যায্য ক্ষতিপূরণ, জীবিকার সুরক্ষা এবং আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনায় তাঁদের কার্যকর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে কপ-৩১ (COP31) উপলক্ষে ‘শ্রম অধিকার নিশ্চিতের দাবি’ উপস্থাপন করা হয়েছে। বুধবার (১৪ অক্টোবর) ঢাকায় ন্যাশনাল অ্যালায়েন্স ফর জাস্ট ট্রানজিশন বাংলাদেশ (এনএজেটিবি), মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন (এমজেএফ) এবং বাংলাদেশ লেবার ফাউন্ডেশনের (বিএলএফ) উদ্যোগে এই দাবিগুলো তুলে ধরা হয়। এতে আটটি আলোচ্য ক্ষেত্রের আওতায় ২৩টি দাবি জানানো হয়েছে।

তীব্র তাপপ্রবাহ, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুতি এবং শিল্প খাতে কার্বন নিঃসরণ কমানোর উদ্যোগে শ্রমিকদের জীবন ও জীবিকার ওপর যে প্রভাব পড়ছে, বিশেষ করে অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকেরা যেসব ঝুঁকির মুখে পড়ছেন, তা তুলে ধরা হয়েছে। অনুষ্ঠানে বক্তারা কপ-৩১ সম্মেলনে বাংলাদেশের সরকারি প্রতিনিধিদলে শ্রমিক, বিশেষ করে নারী শ্রমিকের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।

অনুষ্ঠানের শুরুতে যৌথ উদ্বোধনী বক্তব্যে এনএজেটিবির নির্বাহী সমন্বয়কারী এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ বলেন, দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখছেন শ্রমিকেরা। অথচ জলবায়ু সংকট তৈরিতে তাদের দায় সামান্য হলেও এর ক্ষতিকর প্রভাব সবচেয়ে বেশি বহন করতে হচ্ছে। জলবায়ু অর্থায়নের নামে ঋণ কিংবা দাননির্ভর সহায়তার পরিবর্তে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির ভিত্তিতে ন্যায্য ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানান তিনি। একই সঙ্গে শ্রমিকদের জীবন ও জীবিকাসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন।

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম বলেন, বাংলাদেশের মোট কর্মজীবী মানুষের প্রায় ৮৪ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত। তীব্র তাপপ্রবাহ, কর্মসংস্থান হারানো এবং জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতির কারণে এসব শ্রমিক সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তাঁদের আয় ও চাকরির নিরাপত্তা, মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ এবং শোভন কাজের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি পরিবারের অবৈতনিক সেবাকাজের বাড়তি চাপ এবং প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত নারী শ্রমিকদের জন্য বিশেষ সুরক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি কপ-৩১ সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলে অন্তত একজন নারী শ্রমিককে অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানান।

এনএজেটিবির সদস্যসচিব এবং বাংলাদেশ লেবার ফাউন্ডেশনের (বিএলএফ) নির্বাহী পরিচালক এ কে এম আশরাফ উদ্দিন বলেন, পরিবেশবান্ধব অর্থনীতিতে উত্তরণের প্রক্রিয়ায় শ্রমিকেরা মজুরি, কর্মসংস্থান কিংবা সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ হারালে সেই পরিবর্তন টেকসই হবে না। তিনি শ্রমিকদের দাবিগুলো কপ-৩১ এর আলোচনায় তুলে ধরতে সরকার, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের প্রতি আহ্বান জানান।

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক মীর মোহাম্মদ আলী। তিনি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে শ্রমিকদের কর্মসংস্থান ও জীবিকার ওপর ক্রমবর্ধমান প্রভাব তুলে ধরেন। বিশ্বব্যাংকের তথ্য উল্লেখ করে তিনি জানান, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে তাপজনিত অসুস্থতার কারণে প্রায় ২৫ কোটি কর্মদিবস নষ্ট হয়েছে। ৪৩টি প্রতিষ্ঠানের অবদানে আটটি পরামর্শ সভার মাধ্যমে তৈরি শ্রমিক সনদে সামাজিক সুরক্ষা, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা, নীতিনির্ধারণে শ্রমিকদের অংশগ্রহণ এবং অর্থায়নসহ পুনর্দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচির দাবি তুলে ধরা হয়েছে।

এনএজেটিবির প্রধান সমন্বয়কারী আনোয়ার হোসেন জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলা এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর শ্রমিকদের সুরক্ষায় সম্মিলিত উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম অনুষ্ঠানে উত্থাপিত দাবিসমূহকে সময়োপযোগী ও পূর্ণাঙ্গ বলে উল্লেখ করেন। তিনি আশ্বাস দেন, প্রাসঙ্গিক দাবিগুলো জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের জলবায়ু নীতিমালার পাশাপাশি কপ-৩১ এর জন্য বাংলাদেশের অবস্থানপত্রে অন্তর্ভুক্ত করতে মন্ত্রণালয় সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে। প্রতিমন্ত্রী আরও জানান, আগামী তিন মাসের মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ থেকে চার হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর মধ্যে ঢাকা জেলার জন্য রয়েছে ২৯৬ মেগাওয়াট। নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

অনুষ্ঠানে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনামের সঞ্চালনায় একটি প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে অংশ নেন অক্সফাম ইন বাংলাদেশের ক্লাইমেট জাস্টিস অ্যান্ড ন্যাচারাল রিসোর্স রাইটস বিভাগের প্রধান ড. মোহাম্মদ ইমরান হাসান; শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মো. শামছুল ইসলাম; শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক মীর মোহাম্মদ আলী এবং সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্টের সভাপতি এবং এনএজেটিবির সমন্বয়কারী রাজেকুজ্জামান রতন।

এনএজেটিবির সমন্বয়কারী ও শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদের প্রতিনিধি শাকিল আখতার চৌধুরী কপ-৩১ সামনে রেখে শ্রমিকদের অধিকার ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট আটটি আলোচ্য ক্ষেত্রের আওতায় সনদের ২৩টি দাবি তুলে ধরেন।

অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) বাংলাদেশ কার্যালয়ের কান্ট্রি ডিরেক্টর ম্যাক্স টুনন; বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) জাস্ট ট্রানজিশনবিষয়ক স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান আমের সেলিম এবং বাংলাদেশ লেবার ফাউন্ডেশনের প্রোগ্রাম অফিসার জুবায়ের আলম।

কপ-৩১ সামনে রেখে বাংলাদেশ শ্রমিক সনদে এমন একটি ন্যায্য রূপান্তর প্রক্রিয়ার দাবি জানানো হয়েছে, যেখানে শ্রমিকেরা শুধু জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠী হিসেবেই বিবেচিত হবেন না; বরং তাঁদের কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ জীবিকার বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের অংশীদার হবেন।