দেশের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার মুখস্থবিদ্যা ও পরীক্ষাকেন্দ্রিক মানসিকতা থেকে শিক্ষার্থীদের বের করে এনে আনন্দময়, জীবনমুখী ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার সুযোগ তৈরি করতে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে যুক্ত হচ্ছে চারটি নতুন পাঠ্যবই।
শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ, নৈতিক মূল্যবোধ, সৃজনশীল চিন্তাশক্তি এবং বাস্তবমুখী কর্মদক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বইগুলো প্রণয়ন করেছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। বইগুলো হলো, চতুর্থ শ্রেণির ‘খেলাধুলা’ ও ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ এবং ষষ্ঠ শ্রেণির ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ ও ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, শিক্ষাব্যবস্থাকে আনন্দময়, বাস্তবমুখী ও নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন করে তুলতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, গবেষণা ও নির্দেশনার আলোকে নতুন চারটি পাঠ্যবই শিক্ষাক্রমে অন্তর্ভুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন বলেন, রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতের অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার আলোকে বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন। এরই অংশ হিসেবে তিনি শিক্ষা খাতের প্রয়োজনীয় সংস্কারে মনোনিবেশ করেন। শিক্ষাব্যবস্থাকে আনন্দময়, বাস্তবমুখী ও নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন করে তুলতে তিনি দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। তাঁর চিন্তাভাবনা, অভিজ্ঞতা ও গবেষণার প্রতিফলন হিসেবেই পাঠ্যক্রমে নতুন বইগুলো যুক্ত করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে গত ১৫ বছর কাজ করে তিনি বুঝেছেন, প্রধানমন্ত্রী চান শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ, সামাজিক শিষ্টাচার, পারিবারিক সংস্কৃতি ও সুনাগরিকের গুণাবলি গড়ে উঠুক। পাশাপাশি শিক্ষা যেন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও ভূমিকা রাখে।
মাহ্দী আমিন বলেন, নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় এ কার্যক্রম এগিয়ে নিতে এনসিটিবিকে সম্পৃক্ত করা হয়। এ লক্ষ্যে এনসিটিবি একটি দল গঠন করে। প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা-সংক্রান্ত নীতিমালা প্রণয়নে সহযোগিতাকারীদের পাশাপাশি বিভিন্ন পর্যায়ে শিক্ষা কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত বরেণ্য শিক্ষাবিদদের নিয়ে ধারাবাহিক পরামর্শ ও বৈঠকের মাধ্যমে রূপকল্প বাস্তবায়নের কাজ চলছে।
এনসিটিবি সংশ্লিষ্টরা জানান, সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী আনন্দ, খেলাধুলা, সংস্কৃতি ও হাতে-কলমে কারিগরি দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই নতুন পাঠ্যবইগুলো প্রণয়ন করা হয়েছে। আগামী ২৫ অক্টোবর জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটির (এনসিসি) সভায় বইগুলোর চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়ার কথা রয়েছে। অনুমোদন পেলে চারটি বইয়ের প্রায় দেড় কোটি কপি মুদ্রণ করা হবে।
এ বিষয়ে এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা বলেন, নতুন চারটি পাঠ্যপুস্তকের পাণ্ডুলিপি প্রণয়ন ও যাচাইয়ের কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। ২৫ অক্টোবর এনসিসির সভায় অনুমোদনের পরই বইগুলোর বিষয়বস্তু মুদ্রণের জন্য প্রেসে পাঠানো হবে।
এনসিটিবি জানায়, গত ১২ জুলাই আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে চার মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের কর্মশালায় বইগুলোর রূপরেখা উপস্থাপন করা হয়। পরে বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষাবিদদের সমন্বয়ে চূড়ান্ত পাণ্ডুলিপি তৈরি করা হয়।
এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) অধ্যাপক মোহাম্মাদ আবু নাসের টুকু জানান, নতুন চারটি বই মুদ্রণের প্রস্তুতি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এনসিসির অনুমোদনের পর আগামী ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে প্রায় দেড় কোটি কপি বই মুদ্রণ শেষ করার আশা করছেন তাঁরা।
চতুর্থ শ্রেণিতে ‘খেলাধুলা’
শিক্ষার্থীদের বয়স ও মানসিক বিকাশ বিবেচনায় চতুর্থ শ্রেণির ‘খেলাধুলা’ বইটি প্রণয়ন করা হয়েছে। ১৪টি অধ্যায়ে সাজানো বইটির মূল উদ্দেশ্য, শৈশব থেকেই শিশুদের সুস্থ জীবনযাপন ও ক্রীড়াচর্চায় আগ্রহী করে তোলা।
বইটিতে ফুটবল, ক্রিকেট, কাবাডি, ব্যাডমিন্টন, সাঁতার, অ্যাথলেটিকস ও দাবাসহ বিভিন্ন খেলার মৌলিক নিয়ম সহজভাবে তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি ও আত্মরক্ষার কৌশল শেখাতে কারাতে, জুডো ও তায়কোয়ান্দোর মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এ ছাড়া খেলার মাঠে বা দৌড়ানোর সময় কেটে যাওয়া, মচকানো, নাক দিয়ে রক্ত পড়া কিংবা হিট স্ট্রোকের মতো পরিস্থিতিতে করণীয় বাস্তবসম্মত ছবির মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে। জরুরি প্রয়োজনে প্রাথমিক চিকিৎসাসামগ্রীর ব্যবহার ও আঘাত প্রতিরোধের কৌশলও হাতে-কলমে শেখার সুযোগ থাকবে। খেলাধুলার পাশাপাশি পুষ্টি, সামাজিক দক্ষতা ও দেশপ্রেমের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বইটির প্রথম অধ্যায়ে ‘স্বপ্ন যখন আকাশছোঁয়া’ শিরোনামে একটি অনুপ্রেরণামূলক গল্প রাখা হয়েছে। এতে প্রত্যন্ত গ্রামের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক আয়মান স্যার ও তাঁর সহকর্মী সাদিয়া আপার উদ্যোগে মেয়েদের ফুটবল দল গঠনের গল্প তুলে ধরা হয়েছে।
সামাজিক বাধা ও কুসংস্কার পেরিয়ে মেহজাবিনসহ কয়েকজন শিক্ষার্থীর ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায় অতিক্রম করে জাতীয় পর্যায়ে বিজয়ী হওয়ার কাহিনির মাধ্যমে দেখানো হয়েছে, খেলাধুলা কীভাবে শারীরিক সুস্থতার পাশাপাশি পেশা হিসেবে আর্থসামাজিক পরিবর্তন ও জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে।
এনসিটিবি চেয়ারম্যান বলেন, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা যেন একমুখী ও ক্লান্তিকর না হয়ে ওঠে, সেদিকে বিশেষ নজর রেখে প্রথমবারের মতো ‘খেলাধুলা’ বইটি প্রণয়ন করা হয়েছে।
‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ বইয়ে ইতিহাস ও ঐতিহ্য
দেশের সমৃদ্ধ ইতিহাস, ঐতিহ্য ও লোকজ সংস্কৃতির সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পরিচয় করিয়ে দিতে ১১টি অধ্যায়ে সাজানো হয়েছে চতুর্থ শ্রেণির ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ বইটি। এতে ভাষা, পোশাক, শিল্পকলা, খাদ্যসংস্কৃতি, সামাজিক রীতিনীতি ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী জীবনধারা বর্ণিল চিত্রের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে।
বইটিতে বাংলা বর্ণমালার চর্চা, বিদ্যালয়ের উৎসব, জাতীয় পতাকা উত্তোলন এবং পিঠাপুলির ঐতিহ্যের পাশাপাশি বাবা-মায়ের যৌথ সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও গৃহস্থালির কাজে পারস্পরিক সহযোগিতার বিষয়ও স্থান পেয়েছে।
এ ছাড়া একটি বিশেষ অধ্যায়ে শিশু-কিশোরদের জনপ্রিয় প্রতিভা অন্বেষণমূলক আয়োজন ‘নতুন কুঁড়ি’র ইতিহাস, ১৯৭৬ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উদ্যোগ এবং বিজয়ীদের দুর্লভ ছবি যুক্ত করা হয়েছে।
ষষ্ঠ শ্রেণিতে ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’
পড়াশোনাকে ভীতিমুক্ত ও আনন্দদায়ক করার লক্ষ্য নিয়ে ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য ছয়টি অধ্যায়ে প্রণয়ন করা হয়েছে ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ বইটি। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় এটি নতুন ধরনের শিখনপদ্ধতি হিসেবে যুক্ত হতে যাচ্ছে।
প্রচলিত পরীক্ষাকেন্দ্রিক ব্যবস্থার পরিবর্তে আনন্দময় অভিজ্ঞতা, পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া ও সহশিক্ষামূলক কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে কীভাবে জ্ঞান অর্জন করা যায়, তা বইটিতে তুলে ধরা হয়েছে। এতে শিক্ষার্থীদের পাঠ্যভারও অনেকাংশে কমবে বলে আশা করছে এনসিটিবি।
বইটির মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা নিজেদের স্বাস্থ্য, চারপাশের পরিবেশ ও দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয় থেকে আনন্দের সঙ্গে শিখনফল অর্জন করতে পারবে।
এনসিটিবির কর্মকর্তারা জানান, এই বই শিক্ষার্থীদের বোঝাবে, শেখা মানেই শুধু মুখস্থ করা বা পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া নয়। নিজের জীবন, স্বাস্থ্য, পরিবেশ, নিরাপত্তা, সৃজনশীলতা, পারস্পরিক সম্পর্ক ও দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েও জ্ঞান অর্জন সম্ভব।
‘আমার কারিগরি শিক্ষা’ বইয়ে হাতে-কলমে শেখার সুযোগ
একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে শেখার অভ্যাস ও সমস্যা সমাধানের মানসিকতা গড়ে তুলতে ষষ্ঠ শ্রেণির ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’ বইটি আটটি অধ্যায়ে প্রণয়ন করা হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের শুধু ‘আমি কী জানি’ এমন তাত্ত্বিক জ্ঞানে সীমাবদ্ধ না রেখে ‘আমি কী করতে পারি’ সে বিষয়ে দক্ষ ও স্বাবলম্বী করে তোলাই বইটির মূল লক্ষ্য।
কারিগরি শিক্ষার পরিচিতি, চারপাশের প্রযুক্তি ও নতুন বিশ্ব, ছোট উদ্যোগের বড় সম্ভাবনা, যারা গড়ে তারাই বদলায়, সবুজ প্রযুক্তি ও টেকসই জীবনযাপনসহ বাস্তব জীবনের বিভিন্ন বিষয় এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি দৈনন্দিন জীবনের কারিগরি সমস্যা চিহ্নিত করা এবং প্রযুক্তির সহায়তায় সেগুলোর মৌলিক সমাধান খুঁজে বের করার ভিত্তি তৈরি করা হবে। চারটি বইয়েই শব্দকোষের মতো বিশেষ অধ্যায় রাখা হয়েছে।
পরবর্তী সময়ে সব শ্রেণিতে সম্প্রসারণ
উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন জানান, চতুর্থ শ্রেণি থেকে শুরু হওয়া খেলাধুলা ও সংস্কৃতিবিষয়ক পাঠ্যক্রম আগামী শিক্ষাবর্ষে চালু করে পরবর্তী সময়ে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। অন্যদিকে ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ ও কারিগরি শিক্ষা ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠ্যক্রমে যুক্ত করা হবে।
এনসিটিবির সদস্য (শিক্ষাক্রম) অধ্যাপক ড. এ কে এম শওকত আলী খান বলেন, নতুন চারটি পাঠ্যপুস্তক চালুর ফলে শিক্ষার্থীরা পুঁথিগত বিদ্যার বাইরে গিয়ে আনন্দময় পরিবেশে বাস্তবমুখী ও দক্ষতাভিত্তিক জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পাবে।