সিলেট–গোবিন্দগঞ্জ–সুনামগঞ্জ আঞ্চলিক সড়কের উন্নয়নকাজে ধীরগতি ও দীর্ঘসূত্রতায় চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন সুনামগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলার মানুষ। প্রায় ২২ কোটি টাকা ব্যয়ে সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ চলমান থাকলেও বলাউরা থেকে চানপুর পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে সড়ক খুঁড়ে ফেলে রাখায় প্রতিদিন যানজট, ধুলাবালু ও ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন যাত্রী, চালক ও স্থানীয় বাসিন্দারা। এদিকে কাজের দায়িত্বে থাকা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স সালেহ অ্যান্ড ব্রাদার্সের বিরুদ্ধে কাজের অগ্রগতি ও বাস্তবায়ন নিয়ে নানা অভিযোগ উঠেছে।

স্থানীয়দের দাবি, কোনো কোনো দিন যানজটে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা পর্যন্ত আটকে থাকতে হয়। সড়কের খোঁড়াখুঁড়ি, ধুলাবালু ও অসমাপ্ত সংস্কারকাজে ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক চলাচল। তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি পলাতক কি না, তা নিশ্চিত হওয়ার মতো তথ্য পাওয়া যায়নি।

এসব ঘটনার সত‌্যতা নি‌শ্চিত ক‌রে ক‌লেন ১৫ দিনের মধ্যে কাজ শেষের তাগিদ সড়কের কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী সাদ্দাম হোসেন। তি‌নি বলেন, সিলেট–গোবিন্দগঞ্জ–সুনামগঞ্জ সড়কের প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে। সড়কের খোঁড়া অংশের কাজ ১৫ দিনের মধ্যে শেষ করতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে তাগিদ দেওয়া হচ্ছে। কাজের গতি বাড়াতে নির্মাণশ্রমিকের সংখ্যাও বাড়ানো হচ্ছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে সড়কে যানজট কমে আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগীরা। তাঁদের অভিযোগ, সড়ক খুঁড়ে রাখলেও পর্যাপ্ত পানি ছিটানো হচ্ছে না। ফলে শুষ্ক আবহাওয়ায় ধুলাবালুতে আশপাশের পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। বৃষ্টিতে কাদা ও চলাচলের পথ সংকুচিত হয়ে পড়ায় দুর্ভোগ আরও বাড়ছে।

সিলেট–গোবিন্দগঞ্জ–সুনামগঞ্জ সড়কটি এ অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা ও দৈনন্দিন যোগাযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ। তাই কাজের ধীরগতির প্রভাব পড়ছে বিস্তৃত জনপদে। দ্রুত কাজ শেষ করা, ধুলা নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপদ যান চলাচল নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

পুরোনো সংস্কার প্রকল্পেও অনিয়মের অভিযোগ
একই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সিলেট–সুনামগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কের ২৩ থেকে ৪৬ কিলোমিটার অংশের সংস্কার প্রকল্পেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ২০২৪–২০২৫ অর্থবছরে সড়ক শক্তিশালীকরণ ও মেরামতকাজে প্রায় ৫ কোটি ৮৫ লাখ টাকার অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, প্রায় ২ হাজার ৫৫০ মিটার সড়কের নির্দিষ্ট কয়েকটি অংশে মাটির কাজ, বেস টাইপ-১, প্রাইম কোট ও ওয়্যারিং কোর্সসহ বিভিন্ন সংস্কারকাজ করার কথা ছিল। গোবিন্দগঞ্জ–ছাতক সড়কের তকিপুর এবং সিলেট–সুনামগঞ্জ মহাসড়কের জাউয়াবাজার, লক্ষ্মণসোম, খারাই ও জানধরটুপিসহ কয়েকটি স্থানে কাজের পরিমাণ ও বাস্তব অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা।

তাঁদের দাবি, প্রকল্পের কাগজপত্রে দেখানো কাজের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার অসঙ্গতি রয়েছে। এ ছাড়া নির্মাণ সামগ্রীর মান নিয়ন্ত্রণ, বিটুমিনাস মিশ্রণ তৈরিতে ব্যবহৃত প্ল্যান্ট এবং ল্যাব পরীক্ষার কার্যক্রম নিয়েও অভিযোগ উঠেছে।
কর্মকর্তার বদলি ঘিরেও প্রশ্ন প্রকল্পের অনিয়ম ও বিল নিয়ে আপত্তির পর তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. হাফিজুর রহমানকে সিলেট থেকে দিনাজপুর সওজ সার্কেল অফিসে বদলি করা হয়েছিল বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন। তাঁদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১৯ মে এ-সংক্রান্ত আদেশ জারি হয়।

কাজ মান নি‌য়ে প্রতিবাদ করায় মো. হাফিজুর রহমান অভিযোগের বিষয়ে সত‌্যতা নি‌শ্টিত ক‌রে বলেন, অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার কারণে তাঁকে বদলি করা হয়েছে বলে তিনি মনে করেন। তবে বদলির প্রকৃত কারণ জানতে সরকারি আদেশ ও প্রশাসনিক নথি যাচাই করা প্রয়োজন। শুধু বদলির ঘটনাকে অনিয়মের প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।

অভিযোগের বিষয়ে সিলেট সড়ক জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) আবু সাইদ মো. নাজমুল হুদা এবং সুনামগঞ্জ সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী ড. মোহাম্মদ আহাদ উল্ল্যাহর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁদের মোবাইল রি‌সিভ না করা বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে, ছাতক সড়ক উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. শাহদাৎ হোসেন বলেন, “সংস্কারকাজ কোথায় হচ্ছে, তা আমি জানি না।” তাঁর এই বক্তব্যের পর প্রকল্পের মাঠপর্যায়ের তদারকি ও দায়িত্ব বণ্টন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা।

নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি ভুক্তভোগী ও অভিযোগকারীরা নতুন উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ দ্রুত শেষ করার পাশাপাশি পুরোনো সংস্কার প্রকল্পের অভিযোগ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, কার্যাদেশ, চুক্তিপত্র, প্রাক্কলন, চেইনেজভিত্তিক পরিমাপ বই, বিল-ভাউচার, ল্যাব রিপোর্ট এবং অর্থ ছাড়ের নথি যাচাই করা হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে।

তাঁরা আরও দাবি জানিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট সড়কের কাজ সরেজমিনে পরিদর্শন করে প্রকৃত কাজের পরিমাণ নির্ধারণ, নির্মাণের মান পরীক্ষা এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হোক।

জনগণের অর্থে বাস্তবায়িত সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্দেশ্য মানুষের যাতায়াত সহজ করা। অথচ অসমাপ্ত কাজের কারণে জনদুর্ভোগ বাড়লে প্রকল্পের তদারকি ও বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। তাই সিলেট–গোবিন্দগঞ্জ–সুনামগঞ্জ সড়কের কাজ দ্রুত শেষ করা এবং পুরোনো প্রকল্পের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে জনসমক্ষে প্রকৃত তথ্য তুলে ধরার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।