নাটোরের গুরুদাসপুর পৌর ছাত্রদলের সদস্যসচিব শাকিল ইসলাম হত্যার ঘটনায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে তাঁর মৃত্যুর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া নিরাপত্তাহীনতার বার্তা এবং থানায় করা সাধারণ ডায়েরি (জিডি)। হত্যার হুমকি পাওয়ার পরও ছেলেকে বাঁচাতে পারেনি পুলিশ—এমন অভিযোগ করেছেন নিহত শাকিলের বাবা রবিউল করিম। তিনি এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন।

এদিকে এ ঘটনায় সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগে নাটোর-৪ (গুরুদাসপুর-বড়াইগ্রাম) আসনের সংসদ সদস্য আবদুল আজিজের বড় ছেলে ও গুরুদাসপুর উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক নূরুজ্জামান মিন্টুকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) বিকেলে নাটোরের গুরুদাসপুর আমলি আদালত তাঁর তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন।

ছয় মাস আগে ফেসবুকে শঙ্কার কথা
নিরাপত্তাহীনতার কথা জানিয়ে গত ২০ এপ্রিল ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়েছিলেন শাকিল ইসলাম (৩২)। সেখানে তিনি নিজের জীবন নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেন এবং তাঁকে হত্যার জন্য বিভিন্ন ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন।

পোস্টে শাকিল লেখেন, তাঁকে হত্যার জন্য একটি পক্ষ বিভিন্ন চক্র ও গ্রুপের সঙ্গে যোগাযোগ করছে এবং এ কাজে অর্থ দেওয়ার কথাও বলা হচ্ছে। এ বিষয়ে তিনি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) সঙ্গে কথা বলে সাধারণ ডায়েরি করেছেন বলেও উল্লেখ করেন। তাঁর আশঙ্কা, কোনো অঘটন ঘটলে ওই জিডির ভিত্তিতে যেন মামলা করা হয়।

শাকিলের ওই পোস্টের বিষয়ে নাটোর জেলা গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক মো. নজরুল ইসলাম বিস্তারিত কিছু জানাননি। তবে সব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

‘ছেলেকে বাঁচাতে পারেনি পুলিশ’
নিহত শাকিলের বাবা রবিউল করিম বলেন, ‘হত্যার হুমকি পাওয়ার পর আমার ছেলে থানায় জিডি করেছিল। অথচ শাকিলকে বাঁচাতে পারেনি পুলিশ। আবার খুন হওয়ার পরও অপরাধী ধরতে পুলিশের নিষ্ক্রিয় ভূমিকা ছিল। আমি ছেলে হত্যার দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই। এই হত্যার ঘটনায় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা জড়িত আছে।

শাকিলের মৃত্যুর পরও আসামি শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তাঁর বাবা। পরিবারের অভিযোগ, ঘটনার পর অপরাধীদের গ্রেপ্তারে যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্‌ঘাটনের দাবি উঠেছে।

মিন্টুর তিন দিনের রিমান্ড
শাকিল হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার নূরুজ্জামান মিন্টুকে মঙ্গলবার আদালতে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা। শুনানি শেষে আদালত তাঁর তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

আদালত পুলিশের পরিদর্শক আসমাউল হক বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, আসামিকে অধিকতর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালত তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। পরে তাঁকে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হেফাজতে নেওয়া হয়।

নাটোর জজ আদালতের আইনজীবী মুক্তার হোসেন সাংবাদিকদের জানান, আদালতে মিন্টুর পক্ষে কোনো আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন না। তবে মিন্টু নিজেই শুনানিতে অংশ নেওয়ার অনুমতি চান। অনুমতি পেয়ে তিনি হত্যাকাণ্ডে জড়িত নন বলে দাবি করেন। তাঁর অভিযোগ, পুলিশ যথাযথ যাচাই ছাড়াই তাঁকে গ্রেপ্তার করেছে। তিনি সঠিক তদন্তের দাবি জানান।

অন্যদিকে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা আদালতে বলেন, হত্যাকাণ্ডটি চাঞ্চল্যকর। ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদ্‌ঘাটন এবং আসামির সংশ্লিষ্টতা যাচাইয়ের জন্য তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন। শুনানি শেষে আদালত তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

এর আগে সোমবার (২৬ অক্টোবর) রাত ১০টার দিকে গুরুদাসপুর বাজারসংলগ্ন একটি ভাড়া বাড়ি থেকে মিন্টুকে আটক করে পুলিশ। পরে তাঁকে হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। পুলিশ জানিয়েছে, জিজ্ঞাসাবাদের পর তাঁকে আদালতে পাঠানো হয়েছিল এবং রিমান্ড মঞ্জুরের পর আবার ডিবি হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।

১২ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর মৃত্যু
নিহত শাকিল ইসলাম গুরুদাসপুর পৌরসভার খামারনাচকৈড় খোয়ারপাড়া এলাকার রবিউল করিমের ছেলে। তিনি গুরুদাসপুর পৌর ছাত্রদলের সদস্যসচিব ছিলেন।

গত ১৪ অক্টোবর রাত সাড়ে ১০টার দিকে স্থানীয় চাঁচকৈড় বাজার থেকে ফেরার পথে দুর্বৃত্তদের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে গুরুতর আহত হন শাকিল। স্থানীয়রা তাঁকে উদ্ধার করে গুরুদাসপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। পরে তাঁকে রাজশাহী হয়ে ঢাকার বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।

সেখানে ১২ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর সোমবার (২৬ অক্টোবর) রাত সাড়ে ৮টার দিকে তাঁর মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় ১৯ অক্টোবর গুরুদাসপুর থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা করেন তাঁর বাবা রবিউল করিম। ওই মামলাতেই নূরুজ্জামান মিন্টুকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।

দুই পক্ষের বিরোধের বিষয়টিও তদন্তে
স্থানীয় ছাত্রদল ও যুবদলের একাধিক নেতার ভাষ্য অনুযায়ী, সংসদ সদস্য আবদুল আজিজের দুই ছেলে নূরুজ্জামান মিন্টু ও মাহমুদুজ্জামান সোহাগের পৃথক অনুসারী গোষ্ঠী রয়েছে। তাঁদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছে বলে দাবি করেছেন স্থানীয় নেতারা। নিহত শাকিল সংসদ সদস্যের ছোট ছেলে মাহমুদুজ্জামান সোহাগের অনুসারী ছিলেন বলেও তাঁরা জানিয়েছেন।

তবে এই বিরোধের সঙ্গে শাকিল হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা তদন্তে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এ বিষয়ে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘সবকিছু মাথায় রেখে তদন্ত চলছে। তদন্তে যাদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যাবে, তাদের গ্রেপ্তার করা হবে।

ছেলের জড়িত থাকার প্রমাণ মিললে বিচারের আশ্বাস এমপির
শাকিলের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ঢাকার হাসপাতালে সংসদ সদস্য আবদুল আজিজকে অবরুদ্ধ করেন কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। এ সময় তাঁরা মিন্টুকে গ্রেপ্তার এবং শাকিলের পরিবারকে ২০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানান।

মঙ্গলবার সকালে শাকিলের পরিবারকে সমবেদনা জানাতে যান সংসদ সদস্য আবদুল আজিজ। এ সময় তিনি বলেন, অপ্রত্যাশিত এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তাঁর সন্তান জড়িত থাকলে তাঁকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে।
শাকিল হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদ্‌ঘাটন, জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত এবং পরিবারের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার বিষয়টি এখন তদন্তের ওপর নির্ভর করছে। হত্যার আগে শাকিলের দেওয়া নিরাপত্তাশঙ্কার বার্তা ও থানায় করা জিডির বিষয়টি তদন্তে কীভাবে বিবেচনা করা হয়, সেদিকেও নজর রয়েছে স্থানীয়দের।