খুলনায় প্রায় ২৩ ঘণ্টার ব্যবধানে তিনটি গুলির ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে বটিয়াঘাটা উপজেলায় দু’টি এবং নগরীতে একটি ঘটনা ঘটে। এ তিন ঘটনায় তিনজন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। তাদের মধ্যে একজন সাবেক ছাত্রদল নেতা ও অপর জন যুবদল নেতা।
অন্যদিকে, নগরীতে এক সিগারেট কোম্পানির কর্মীকে গুলি করে তার ল্যাপটপের ব্যাগ ছিনিয়ে নিয়েছে দুর্বৃত্তরা। ঘটনা তিনটি সোমবার রাত থেকে মঙ্গলবার সন্ধ্যার মধ্যে পৃথক সময়ে ঘটেছে।
গুলিবিদ্ধ সোহেল ও বাদলের রাজনৈতিক পরিচয় নিশ্চিত করেন খুলনা জেলা যুবদলের সভাপতি নাদিমুজ্জামান জনি। এদিকে গুলিবিদ্ধ নেতাদেরকে দেখতে খুমেক হাসপাতালে যান খুলনা-১ আসনের সংসদ সদস্য আমীর এজাজ খান।
সর্বশেষ গতকাল মঙ্গলবার ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যা ৬টার দিকে বটিয়াঘাটা উপজেলার জলমা ইউনিয়নের চক্রাখালী বাজার সংলগ্ন বাদশার দোকানের সামনে গুলিবিদ্ধ হন অহিদুল ইসলাম বাদল (৩৫)। মোটরসাইকেলে আসা দুর্বৃত্তরা তাকে গুলি করে পালিয়ে যায়।
পরে স্থানীয় লোকজন তাকে উদ্ধার করে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। বাদল বটিয়াঘাটা উপজেলার তেঁতুলতলা গ্রামের আলতাফ হাওলাদারের ছেলে। খুলনার পুলিশ সুপার সরকার ওমর ফারুক এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
বটিয়াঘাটা উপজেলা যুবদল সদস্য বাদল সংগঠনের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠান শেষে খুলনা শহর থেকে বাড়ি ফেরার পথে চক্রাখালী স্কুলের কাছে বাজার এলাকায় গুলিবিদ্ধ হন বলে জানান তিনি।
বটিয়াঘাটা উপজেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক ফারুক খন্দকার বলেন, একটি গুলি বুকে ও অন্যটি পিঠে বিদ্ধ হয়েছে। বর্তমানে তিনি চিকিৎসাধীন।
এ বিষয়ে বটিয়াঘাটা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) হলেন মোঃ মেহেদী হাসান বলেন, আমরা ঘটনাস্থলে এসেছি। তবে এ ঘটনায় কাউকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি। অভিযান চলছে।
খুলনা জেলা পুলিশের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গুলিবিদ্ধ বাদল বটিয়াঘাটা উপজেলার তেঁতুলতলা গ্রামের বাসিন্দা। তিনি জলমা ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সাবেক সভাপতি এবং ইউনিয়ন বিএনপি’র সভাপতি পদপ্রার্থী। তাকে গুলির খবর পেয়ে বটিয়াঘাটা থানা-পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে।
হামলায় জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেফতারে অভিযান চলছে বলে জানান জেলা এসপি সরকার ওমর ফারুক। তার ওপর হামলার কারণ সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি বলে জানান তিনি।
এর আগে সোমবার ২৬ অক্টোবর রাত সাড়ে ১২টার দিকে বটিয়াঘাটা উপজেলার বড় কড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে সোহেল শেখ (৩৬) নামে সাবেক এক ছাত্রদল নেতাকে গুলি করে দুর্বৃত্তরা। তিনি উপজেলার ৭ নম্বর আমিরপুর ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ও বর্তমানে যুবদলের কর্মী। তিনি বড় কড়িয়া এলাকার গনি শেখের ছেলে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ঘটনার সময় সোহেল মোটরসাইকেলে বসে ছিলেন। এ সময় দু’টি মোটরসাইকেলে আসা দুর্বৃত্তদের মধ্যে দু’জন তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। এতে তার ডান হাত ও পেটের ডান পাশে গুলি লাগে। পরে স্থানীয় লোকজন তাঁকে উদ্ধার করে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান।
উন্নত চিকিৎসার জন্য পরে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। বর্তমানে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।
খুলনা জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও মিডিয়ার ফোকালপারসন আবির সিদ্দিক শুভ্র জানান, সংবাদ পেয়ে বটিয়াঘাটা থানা পুলিশের একটি দল দ্রুত ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে।
ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেফতারের লক্ষ্যে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এ ঘটনায় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। পাশাপাশি, ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন এবং জড়িতদের শনাক্তে গোয়েন্দা নজরদারি অব্যাহত রয়েছে।
খুলনা নগরীতে যুবক গুলিবিদ্ধ : নগরীর নিরালা ১৭ নম্বর রোডে সালমান (২৩) নামের এক যুবককে গুলি করে টাকার ব্যাগ ছিনিয়ে নিয়ে গেছে দুর্বৃত্তরা। মঙ্গলবার বেলা ১১টা ১০ মিনিটের দিকে এ ঘটনা ঘটে। আহত সালমান ১৬ নম্বর রোডের বাসিন্দা জাহাঙ্গীরের ছেলে। তিনি পেশায় ক্যামেল সিগারেট কোম্পানির একজন কর্মচারী।
১৭ নম্বর রোডে কোম্পানির অফিসের সামনে কাজ করার সময় দু’টি মোটরসাইকেলে আসা চার দুর্বৃত্ত তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। এতে তার পেটের ডান পাশে গুলি লাগে। এদিকে তার কাছে থাকা টাকার ব্যাগটি ছিনিয়ে নিয়ে দুর্বৃত্তরা দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।
পরে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন। তিনটি ঘটনার খবর পেয়ে সংশ্লিষ্ট থানা-পুলিশের সদস্যরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। সোহেলকে গুলির ঘটনায় ঘটনাস্থল থেকে পিস্তলের একটি গুলির খোসা উদ্ধার করা হয়েছে।
সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোঃ লোকমান হোসেন রিপন বলেন, কি কারণে তাকে গুলি করা হয়েছে তা নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব হচ্ছে না। ঘটনাস্থলের আশপাশের সিসি ফুটেজ সংগ্রহ করা হচ্ছে।
এর আগে ২৪ অক্টোবর খুলনায় একই দিনে গুলি, হামলা ও ভাঙচুরের তিনটি পৃথক ঘটনা ঘটে। ওই দিন সকালে তেরখাদা উপজেলায় যুবদলের সাবেক নেতা রামিম বিশ্বাস (৩২) গুলিবিদ্ধ হন।
মোটরসাইকেলে এসে দুর্বৃত্তরা তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। ওই দিন সন্ধ্যায় নগরের দক্ষিণ টুটপাড়া গাছতলা এলাকায় নিজের দোকানে বসে থাকা অবস্থায় গুলিবিদ্ধ হন কলেজ শিক্ষক ধনঞ্জয় কুণ্ডু ওরফে আকাশ কুণ্ডু (৪৫)। ওই ঘটনার পেছনে চাঁদাবাজির কারণ রয়েছে বলে দাবি করেছে পুলিশ।
রাতে নগরের বাবু খান রোডে সন্ধানী ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক কমপ্লেক্সে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করে মুখোশধারী একদল দুর্বৃত্ত। যাওয়ার সময় তারা একটি ফাঁকা গুলি ছোড়ে।
১০ মাসে ৭১ খুন : পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ২৩ অক্টোবর পর্যন্ত প্রায় ১০ মাসে খুলনায় গুলি, কুপিয়ে বা অন্য উপায়ে ৭১ জনকে হত্যা করা হয়েছে। এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে ৬৯টি। একই ঘটনায় একাধিক ব্যক্তি নিহত হওয়ায় মামলা ও নিহত ব্যক্তির সংখ্যায় পার্থক্য রয়েছে।
পুলিশের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বেশির ভাগ হত্যাকাণ্ডের পেছনে অস্ত্র ও মাদক কারবার, চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ, পূর্বশত্র“তা ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর বিরোধ কাজ করেছে।
এদিকে ছাত্রদল ও যুবদলের দুই নেতা গলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন বটিয়াঘাটা উপজেলা বিএনপি’র নেতৃবৃন্দ।
বটিয়াঘাটা উপজেলা বিএনপি’র আহবায়ক এজাজুর রহমান শামীম ও সদস্য সচিব ফারুক হোসেন খন্দকারের স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে এ নিন্দা ও প্রতিবাদ জানানো হয়।
বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ বলেন, গুলিবর্ষণের ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে হামলার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত ও গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনার জন্য সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি দাবি জানান তাঁরা।