ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নির্বাচনে আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলো রেকর্ডসংখ্যক আসন পেতে পারে বলে বুথফেরত জরিপ ও আংশিক ফলাফলে আভাস পাওয়া গেছে। এতে সরকার গঠনের সমীকরণে দলগুলোর গুরুত্ব বেড়েছে। তবে আরব দলগুলোর এই নির্বাচনী অগ্রগতি শেষ পর্যন্ত সরকার গঠনে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মঙ্গলবারের নির্বাচনের বুথফেরত জরিপ ও আংশিক ফলাফল অনুযায়ী, আরব নেতৃত্বাধীন জয়েন্ট লিস্ট ও রা’আম দল দুটি ইসরায়েলের ১২০ আসনের পার্লামেন্ট নেসেটে সম্মিলিতভাবে ১৭টি আসন পেতে পারে। এটি দল দুটির জন্য রেকর্ড হতে পারে।
আংশিক ফলাফলে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জোট ৫৪টি এবং গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট ৪৯টি আসন পেয়েছে। ফলে কোনো পক্ষই এখন পর্যন্ত সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১ আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি।
হিসাব অনুযায়ী, বিরোধী জোট আরব দলগুলোর সমর্থন পেলে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় আসনের চেয়ে বেশি আসন পেতে পারে। দ্য টাইমস অব ইসরায়েলের বরাত দিয়ে আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এমন জোটের আসনসংখ্যা ৬৬ হতে পারে। এতে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরানোর সুযোগ তৈরি হবে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক বাস্তবতায় এমন জোট গঠন সহজ নয়। ইসরায়েলের অধিকাংশ ইহুদি নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক দল আরব দলগুলোর সঙ্গে সরকার গঠনে অনীহা প্রকাশ করেছে।
ইসরায়েলের সাবেক রাষ্ট্রদূত ড্যানিয়েল শেক দেশটির রাজনীতিতে আরব ভোটের পুনরুত্থানকে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, নির্বাচনে আরব ভোটের এই উত্থান স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে যে দেশটির মোট ভোটারের এত বড় একটি অংশকে রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
তবে ইসরায়েলি স্টাডিজবিষয়ক প্যালেস্টিনিয়ান ফোরামের মহাপরিচালক হোনাইদা ঘানাম মনে করেন, আরব দলগুলোর নির্বাচনী সাফল্যকে বাস্তব রাজনৈতিক ক্ষমতায় রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে কাঠামোগত বাধা রয়েছে। তার মতে, আরব নাগরিকদের রাজনৈতিক অংশীদার হিসেবে গ্রহণ না করার প্রবণতাই এই বাধার অন্যতম কারণ।
নেতানিয়াহু ও বিরোধী নেতা আইজেনকট দুজনই আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠনের বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছেন। তাদের যুক্তি, এসব দলের সঙ্গে তাদের রাজনৈতিক মূল্যবোধের মিল নেই।
ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক বিশ্লেষক আহমেদ নাজ্জারের মতে, বিরোধী জোটের আরব দলগুলোর সঙ্গে কাজ করতে অনীহা মূলত আদর্শিক। নির্বাচনী হিসাব অনুযায়ী আরব দলগুলোর সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ হলেও আইজেনকট এ বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন।
কৌশলগত গবেষণাপ্রতিষ্ঠান প্যালথিংকের পরিচালক ওমর শাবান মনে করেন, আরব দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতা হলে ফিলিস্তিনি ও ইহুদি নাগরিকদের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
শাবান বলেন, রা’আমের নেতা মানসুর আব্বাস ইতিমধ্যে আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন সরকারে যোগ দেওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছেন। তবে এ ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিষয়গুলো আরব দলটির হাতে রাখার শর্ত রয়েছে।
তার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, রা’আমের নির্বাচনী তালিকায় ইহুদি আইনপ্রণেতা ইয়োভ সেগালোভিটজকে দ্বিতীয় অবস্থানে রাখার সিদ্ধান্তও দলটির রাজনৈতিক সহযোগিতার আগ্রহের ইঙ্গিত দেয়।
অন্যদিকে, জয়েন্ট লিস্টের নেতা ইউসেফ জাবারিন বুধবার বলেছেন, নেতানিয়াহুর কট্টর ডানপন্থি জোটকে ক্ষমতা থেকে সরাতে তার দল দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জয়েন্ট লিস্টের আরেক নেতা আহমেদ তিবিও নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করতে বিরোধী জোটকে সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়েছেন। তবে দলটি আনুষ্ঠানিকভাবে সরকারে যোগ দেবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
নাজ্জারের মতে, এ ধরনের সমঝোতায় রাজি করাতে আইজেনকটকে সম্ভাব্য সহযোগী দলগুলোর নেতা, বিশেষ করে নাফতালি বেনেট ও আভিগদর লিবারম্যানের সমর্থন আদায় করতে হবে। কারণ, ইসরায়েলের রাজনীতিতে ফিলিস্তিনি নাগরিকদের ভোটাধিকার স্বীকার করা হলেও তাদের প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোকে সরকার পরিচালনার বৈধ অংশীদার হিসেবে গ্রহণ না করার দীর্ঘদিনের প্রবণতা রয়েছে।
প্যালেস্টিনিয়ান ফোরামের মহাপরিচালক ঘানাম সম্ভাব্য চারটি পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করেছেন। এগুলো হলো নতুন করে নির্বাচন, আরব দলগুলোর বাইরে থেকে সমর্থনে বিরোধীদের সংখ্যালঘু সরকার গঠন, বিরোধী জোটের কোনো অংশের নেতানিয়াহুর শিবিরে যোগ দেওয়া অথবা জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠন।
তবে ঘানামের মতে, নির্বাচনী হিসাবের পাশাপাশি নেতানিয়াহুর শিবিরের সাংগঠনিক দৃঢ়তা ও ঐক্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
নেতানিয়াহু মঙ্গলবার বলেছেন, আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর সঙ্গে জোট করে সরকার গঠন করা হবে ‘লজ্জাজনক ও অসম্মানজনক’। তার দাবি, ইসরায়েলের নিরাপত্তা বিপন্ন করতে পারে, এমন দলগুলোর সমর্থনের ওপর নির্ভরশীল সরকার গঠন করা উচিত নয়।
টুগেদার জোটের নেতা নাফতালি বেনেটও সরকারে শুধু জায়নবাদী দলগুলোকে রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। ফলে আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠনের সম্ভাবনা আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
তবে আইজেনকটের বিরোধী জোটের অংশ মধ্য-বামপন্থি ডেমোক্র্যাটস পার্টির নেতা ইয়ার গোলান তার মিত্রদের আরব দলগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা করতে অনীহা ত্যাগ করার আহ্বান জানিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি লেখেন, ইহুদি ও আরব ভোটের মধ্যে নেতানিয়াহুর বর্ণবাদী বিভাজন আর মেনে নেওয়া উচিত নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, আরব দলগুলোর সঙ্গে কাজ করতে ইহুদি নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলগুলোর অনীহা ইসরায়েলের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় বিদ্যমান বৈষম্যকে সামনে এনেছে।
নাজ্জারের মতে, বিরোধী নেতারা নেতানিয়াহু ও কট্টর ডানপন্থিদের গণতন্ত্রের জন্য হুমকি হিসেবে বর্ণনা করলেও ফিলিস্তিনি নাগরিকদের সঙ্গে ক্ষমতা ভাগাভাগি করতে তাদের অনেকেই আগ্রহী নন।
তিনি বলেন, কোনো দেশের এক-পঞ্চমাংশের বেশি নাগরিককে ভোট দেওয়ার অধিকার দেওয়া হলেও তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে অযোগ্য বিবেচনা করা হলে সেই দেশের গণতান্ত্রিক দাবির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।