রাজশাহীর তানোরে অবশেষে রহমতের কাঙ্খিত বৃষ্টির দেখা মিলেছে। বৃষ্টির পানির সাথে সাথে রোপা আমন চাষীদের মনে স্বস্তি বিরাজ করছে। কারগ গত প্রায় ২৫ থেকে ৩০ দিন ধরে ধানী জমিতে পানি ছিল না। অনেকে গভীর অগভীরসহ নানা ভাবে রোপা আমন ধানে সেচ নিয়ে ধান খেত টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করেছেন। আবার অনেকে জমিতে সেচ পানির নালা বা ড্রেন না থাকার কারনে সেচ নিতে পারছিল না। একারনে অনেকের জমি শুকিয়ে চৌচির হয়ে পড়েছে। আকাশ পানে চেয়ে ছিল কখন বৃষ্টির পানি হবে এবং ফসলী জমির ধান রক্ষা পাবে।

কৃষক তোফাজ্জুল জানান, এবারে চাপড়া মাঠে তিন বিঘা জমিতে রোপা আমন ধান চাষ করা হয়েছে। বিগত এক মাস ধরে জমিতে পানি ছিলনা। তিন বিঘা জমিতে দুবার সেচ দেয়া হয়েছে। ঘনটা চুক্তিতে তিন বিঘা জমিতে দুবারে ১৫০০ টাকার সেচ নিতে হয়েছে। বৃষ্টি না হলে আর একবার সেচ নেয়া লাগত। কিন্তু বৃহস্পতিবারের বিকেলের বৃষ্টি হওয়ায় আর সেচ লাগবে না। বৃষ্টির পানিতেই ধান কাটা হয়ে যাবে।

আরেক কৃষক আনোয়ার জানান, সাড়ে তিন বিঘা জমিতে রোপা আমনের চাষ করা হয়েছে। এর মধ্যে এক বিঘা জমিতে দুবার সেচ দেয়া হয়েছে। বাকি আড়াই বিঘাতে একবার করে সেচ দেয়া হয়েছে। বৃষ্টি না হলে পুনরায় সেচ দিতে হত। ঘন্টা চুক্তিতে ১২০০ টাকা খরচ হয়েছে। বৃষ্টি না হলে আরো এক হাজার টাকা খরচ হত।

সুকুমার নামের আরেক কৃষক জানান সেচ মটর বিকল হওয়ার কারনে সেচ দেয়া যায়নি। এজন্য জমি ফেটে গেছে। বৃষ্টির পানি না হলে ধান চিটাই পরিনত হত। বৃষ্টি হওয়ার কারনে আর কোন সমস্যা হবে না। সময়মত কাটা মাড়ায় করা যাবে, ফলন পাওয়া যাবে।

জিয়া নামের আরেক কৃষক জানান, আড়াই বিঘা জমিতে রোপা আমন ধানের চাষাবাদ করা হয়েছে। গত ২৫ দিন ধরে বৃষ্টির পানি না পাওয়ার কারনে ঘন্টা চুক্তিতে একবার সেচ দেয়া হয়েছে। গত কয়েকদিন ধরে সেচ নেয়ার জন্য চেষ্টা চলছিল। কিন্তু বৃহস্পতিবারে শেষ বিকেলে ভারী মাঝারি বৃষ্টি হয়। বৃষ্টির পানি হওয়ার কারনে আর সেচ দিতে হবে না। বৃষ্টির পানি পাওয়ার কারনে প্রায় কৃষকের সেচের টাকা বেচেছে। বৃষ্টি না হলে প্রায় কৃষককে সেচের জন্য বাড়তি টাকা গুনতে হত।

কৃষকরা জানান, গত প্রায় এক মাস ধরে জমিতে পানি ছিল না। পুকুর খাল থেকে শেলো মেশিনের মাধ্যমে সেচ দিয়ে ধান বাচিয়ে রাখা হয়েছে। গভীর অগভীর নলকূপ থেকেও সেচ নেয়া হয়েছে। দীর্ঘ দিন গভীর অগভীর নলকূপ বন্ধ থাকার কারনে চালু করা মাত্রই অনেক সেচ মটর নষ্ট হয়ে গেছে। একারনে অনেকে সেচ নিতে পারেনি। যার কারনে অনেক কৃষকের জমি ফেটে চৌচির হয়ে পড়েছিল।

সেচের জন্য বাড়তি খরচ গুনতে হচ্ছিল। আবার সিরিয়াল পাওয়া যাচ্ছিল না। সেচের প্রয়োজন হলেই গভীর নলকূপের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তির দাম্ভিকতা বেড়ে যায়। তাদের কথার ভাজ উলট পালট হয়ে যায়। দিনের দিন ধরনা দেয়ার পর মিলে সেচ। ধানের দাম তেমন নেই। হয়তো উৎপাদন খরচ উঠবেনা। আবার মরার উপর খাড়ের ঘা হয়ে পড়েছিল সেচের পানি। কৃষকের ঘরে বা পকেটে টাকা নেই। সামান্য সেচ নিতে ঋন মহাজন করতে হয়েছে।

কারন সময় মত সার পাওয়া যায়নি। বাড়তি দামে কিনতে হয়েছে। দিনের দিন কীটনাশকের দামও বাড়তি। যার কারনে উৎপাদন খরচও বেশি হচ্ছে। কিন্তু ন্যায্য মূল্য পাওয়া যাচ্ছেনা। অথচ পা ফাটা কৃষকের জন্যই দেশ খাদ্যেস্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। কৃষকের রক্ত ঘামের উপর টিকে আছে দেশের মুল চাবিকাঠি। কিন্তু সেই কৃষকের ঘরে ঘরে দুর্ভিক্ষ চলছে। ধান আলুর কাঙ্খিত দাম থাকলে কৃষকের নাজুক অবস্থা হত না। বিকেল চার টার দিকে গুঁড়ি গুড়ি বৃষ্টি শুরু হয়। কিছুক্ষণ পর মাঝারি ভারি বর্ষন হয়েছে। ধানের জমিতে আর পানি লাগবেনা। চাষীদের পানির হাহাকার দূর হয়েছে।

গত কয়েকদিন আগে কথা হয় স্বশিক্ষিত কৃষি বিজ্ঞাানী নুর মোহাম্মদের সাথে তিনি জানিয়েছিলেন, রোপা আমনের জমিতে পানির হাহাকার চলছে। সেচ দিতে মরিয়া হয়ে পড়েছে কৃষকরা। যারা সেচ দিতে পারবে তারা কাঙ্খিত ফলন পাবে। আর যারা সেচ দিতে পারবে না তাদের ফলন কম হবে। একটা বৃষ্টি হলে এই হাহাকার থাকবে না।

বৃষ্টির সময় তার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, রহমতের বৃষ্টির পানি পেয়ে চাষিদের মনে স্বস্তি বিরাজ করছে। কারন আর অল্প সময়ের মধ্যে ধান কাটা শুরু হবে। বৃষ্টি হওয়ার কারনে কাঙ্খিত ফলন পাবে কমবে না।

উপজেলা কৃষি অফিসার সাইফুল্লাহ আহমেদ জানান, এবারে উপজেলায় ২২ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে রোপা আমন ধানের চাষাবাদ হয়েছে। রোপন থেকে শুরু করে সবকিছুই বৃষ্টির পানিতে হয়েছে। এজন্য চাষীদের খরচও কম হয়েছে। তবে শেষ সময়ে পানির হাহাকার শুরু হয়েছিল। প্রায় কৃষকরা নানা ভাবে সেচ দিয়েছে।

এসেচ দিতে বাড়তি খরচ হয়েছে চাষীদের। আরো সেচের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু বৃহস্পতিবারে আসর থেকে মাগরিব পর্যন্ত কাঙ্খিত বৃষ্টি হয়েছে। আর সেচের দরকার নেই। কাঙ্খিত ফলন পাবে চাষীরা। কারন এবারে ধানী জমিতে রোগবালা তেমন ছিলনা। সার্বক্ষণিক মাঠ কর্মীরা কাজ করেছে।

প্রতিবেদন লিখা পর্যন্ত দু এক ফোটা করে বৃষ্টি পড়ছে। তবে রাতভর ভারি বর্ষন হলে অনেকের ধান মাটিতে নুয়ে পড়বে বলে ধারনা চাষীদের।